অলিম্পিকে হিজাব

রাচেল শাবি : অলিম্পিক গেমস মানেই রেকর্ডের ছড়াছড়ি। চার বছর পর পর হওয়া প্রতিটি আসরেই নতুনত্ব থাকে। কিন্তু তার পরও কোনো কোনো গেমস বিশেষ কারণে ইতিহাসে বিশেষ স্থান পায়। এবারের আসরটি কেন ইতিহাস হয়ে থাকবে? প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আমেরিকার কোনো নগরীতে হলো বলে? মাইকেল ফেলপস দুই হাজার বছরের রেকর্ড গুঁড়িয়ে দেয়ার কারণে? ২৩টি স্বর্ণপদক জিতে তিনি সর্বকালের ক্রীড়া ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। নাকি উসাইন বোল্টের জন্য? তিনি ইতিহাসের প্রথম মানব হিসেবে টানা তিনবার অলিম্পিক গেমসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ জয় করেছেন।
নাকি প্রথমবারের মতো কোনো দেশহীন ক্রীড়াবিদের প্রথম স্বর্ণ জয়ের ঘটনাটি, যা জিতেছেন কুয়েতের ফেহাইদ আল-দিহানি? রিও অলিম্পিকে তিনি প্রথম উদ্বাস্তু অলিম্পিক দলের সদস্য হিসেবে স্বর্ণ পদক গলায় ঝুলিয়েছেন।
এবার কিন্তু সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী ক্রীড়াবিদ অংশ নিচ্ছেন। মোট ক্রীড়াবিদের ৪৭.৭ ভাগই নারী। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সোচ্চার বিশ্বে এটা ছোট কোনো ঘটনা নয়।
না। এগুলোর কোনোটির জন্য নয়, বরং এবারের অলিম্পিক আসরে সত্যিকার ইতিহাস গড়েছে হিজাব। এবারই প্রথম অলিম্পিকের কোনো আসরে হিজাব এমন জোরালোভাবে আত্মপ্রকাশ করল।
এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র থেকে হিজাব পরা কোনো নারী অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়। তিনি হলেন ইবতিহাজ মোহাম্মদ। ফেনসিং বা তরবারি চালানোর প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নেন। এই তরবারিবিদ নারী বিরামহীন শিরোনাম হয়েছেন।
এ অবস্থায় আসতে তাকে কিন্তু মারাত্মক সব প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। ‘হিজাব ও তরবারি’ জাতীয় শিরোনামগুলো তাকে লক্ষ্যচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি নতুন একটি ধারার সূচনা করলেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আগামীতে অন্যান্য বিভাগেও এমন ক্রীড়াবিদ দেখা যেতে পারে।
এবারে গেমসে হিজাব নিয়ে দ্বিতীয় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। সেটি ছিল মিসর ও জার্মানির নারী ভলিবল দলের মধ্যকার ম্যাচটি। জার্মান নারীরা বিকিনি পরেই অংশ নেয়। আর মিসরীয় নারীরা হিজাব পরে নামে। এই ম্যাচে ফলাফল তেমন বিবেচ্য ছিল না। শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকা জার্মানিকে মিসর রুখে দেবে, তেমনটা প্রত্যাশিতও ছিল না। কিন্তু তারা সূচনা করলেন নতুন দিগন্তের। তবে এই খেলাটিকে প্রচার করা হয় ‘বিকিনি বনাম বোরকা’ হিসেবে। এ দিয়ে তারা কী বোঝাতে চেয়েছেন? ‘বিকিনি’ মানে কি আধুনিকতার প্রতিনিধিত্ব? আর তারা কি বোরকা পরে খেলেছিল? বোরকা বলতে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে যে পশ্চাৎপদতা বোঝায়, তারা কিন্তু তারা পরেননি। হিজাব পরে তারা যথেষ্ট স্মার্ট ছিলেন। মিডিয়ার একটি বড় অংশ এটাকে ‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’ হিসেবেই চিত্রিত করতে চেয়েছে। এর জবাব দিয়েছেন লিবিয়ান-আমেরিকান এক লেখক। হেন্দ আমরি টুইট করেছেন এভাবে : এই ছবিটির ক্যাপশন বিকিনি বনাম হিজাব হওয়া উচিত হয়নি; বরং হওয়া উচিত ছিল ‘ক্রীড়াবিদ বনাম ক্রীড়াবিদ।’
হিজাব পরা নিয়ে এবারের অলিম্পিক আসরে যে হইচই হচ্ছে, সেটাকে বলতে পারি ‘হিজাবি অলিম্পিকস’। অলিম্পিক আসরে হিজাবের আত্মপ্রকাশের সুযোগ ঘটে ২০১২ সালে। তখনই অলিম্পিকের নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। হিজাব পরেও নারী ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়। এর প্রতিফলন ঘটল এবার রিও গেমসে।
আপনি ভালোভাবেই কল্পনা করতে পারেন, পাশ্চাত্যে হিজাব পরিধানকারীদের প্রতিদিনকার বৈরী পরিবেশ ও বৈষম্যের শিকার হওয়া প্রতিরোধ করতে ইচ্ছুক উদারমনা ব্যক্তিরা অলিম্পিক পর্যায়ে হিজাবধারী ক্রীড়াবিদদের সুযোগ দিয়ে একটা পথ বের করতে চেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশই মনে করছেন, অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম নারীরা প্রমাণ করছেন, তারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে চান। হিজাব তাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, খেলাধুলায় পুরুষদের প্রাধান্য একেবারে শুরু থেকে। পাশ্চাত্যেও নারীরা মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন। মুসলিম নারীদের সমস্যা আরো বেশি। কেবল খেলাধুলা নয়, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। এসব প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ হওয়া খুবই কঠিন।
হিজাবের ডামাডোলে আরেকটি বিষয় কি চাপা পড়ে যাচ্ছে না? নারীদের পোশাক নিয়ে এত হইচইয়ের মধ্যে পুরুষেরা কী পরল, তা নিয়ে কেউ কথা বলে না কেন? আর নারীরাই বা এত খোলামেলা হবে কেন? এই অলিম্পিকে হিজাব যেমন দেখেছে, তেমনই দেখেছে মেক্সিকোর জিমন্যাস্ট আলেক্সা মরেনোর সংক্ষিপ্ততম পোশাক। এ প্রেক্ষাপটেই ব্রিটেনের ডেইলি মেইল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, রিও গেমসের ‘সবচেয়ে ভালো আর সবচেয়ে খারাপ পোশাক’।
বিবিসির প্রেজেন্টার হেলেন স্কেলটনও বিষয়টি নিয়ে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। তিনি সব সময় তার স্কার্টের দৈর্ঘ্য নিয়ে আলোচনায় আসেন। কিন্তু তার পুরুষ সহকর্মীর শর্টস নিয়ে কেউ কথা তোলে না। কেন? তিনি সেটাই জানতে চেয়েছেন।
অর্থাৎ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে, নারীদের মূল্যায়ন করা হয় তাদের অবয়ব দেখে। তাদের কর্মসম্পাদনের দক্ষতা কতটুকু, তারা কী করতে পারেন, তাদের সামর্থ্য ইত্যাদি দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করা হয় না।
এ কারণেই বলা যায়, এসব নারী ক্রীড়াবিদ দুর্দান্ত সাফল্য পেলেও, তারা সীমানা ছাড়িয়ে গেলেও, সব প্রতিকূলতা জয় করলেও, আমাদের সবাইকে আশ্চর্য করলেও, নিজ নিজ দেশের জন্য বিপুল পদক বয়ে আনলেও তারা কেবল হেরেই যাচ্ছেন। বিষয়টা এখনই ঘটছে, এমন নয়। বরং সুদূর অতীত থেকেই তা চলে আসছে। আমরা পুরুষেরা যে খেলায় খেলছি, নারীরা কিন্তু তাতে নেই।
[আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : হাসান শরীফ]
নয়া দিগন্ত

You Might Also Like