বাংলাদেশে বড় ঘটনায় সরকারি তথ্যের সংকট কেন?

আবুল কালাম আজাদ :

যেকোনো বড় ঘটনায় সরাসরি সম্প্রচারে দেখানো ছবি ও তথ্য অনেকটাই নির্ভর করে ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকের ওপর।
বাংলাদেশে গুলশানে জঙ্গী হামলার ঘটনায় গণমাধ্যমে আসা বিভিন্ন তথ্য এবং সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ওই ঘটনার পরে তথ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে পুলিশের বড় অভিযান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার না করার নির্দেশনা দিয়েছে।
অথচ বড় ধরনের সংকটের বেলায় সরকারি একক সূত্র থেকে গণমাধ্যমে তথ্য সরবরাহের কোনো ব্যবস্থাপনা দেখা যায় না বাংলাদেশে। কেন? এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রচারিত হবে বিবিসি বাংলার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘প্রবাহ’তে। প্রচারিত হবে চ্যানেল আইতে বাংলাদেশ সময় রাত ৯:৩৫ মিনিটে।
গুলশানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় প্রচারিত খবর নিয়ে সমালোচনা-বিতর্কের প্রেক্ষাপটে পুলিশের বড় অভিযান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার না করার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
সর্বশেষ গুলশানে জঙ্গী হামলা ছাড়াও বিডিআর বিদ্রোহ, রানাপ্লাজা দুর্ঘটনা, এমনকি হেফাজতের ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচীতে গণমাধ্যমগুলো তাৎক্ষণিক খবর দিয়েছে। এসব ঘটনার সময় যে ছবি দেখানো এবং সরাসরি সাংবাদিকরা যেসব তথ্য দিয়েছে পরবর্তীকালে তার অনেক কিছু নিয়েই বিতর্ক হয়েছে।
যেকোনো বড় ঘটনায় সরাসরি সম্প্রচারে দেখানো ছবি ও তথ্য অনেকটাই নির্ভর করে ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকের ওপর। বাংলাদেশের অন্যতম একটি নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক ওমর ফারুক। গত দশ বছরে বেশকটি বড় ঘটনা কাভার করেছেন তিনি।
ওমর ফারুক বলেন, “বড় বড় ঘটনার পরে অনেকে গণমাধ্যমের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেছেন তুমি সঠিক তথ্যটা দিতে পারো নাই। কিন্তু নির্ভুল তথ্য দেয়ার জন্য রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে সাপোর্ট দরকার ছিল সেটা কিন্তু আমরা পাই নাই। সাংবাদিক ছাড়াও প্রতিটি ঘটনায় ভিকটিমের স্বজনরাও ঘটনাস্থলে ভিড় করেন”।
বাংলাদেশের গত দশ বছরে বেশকটি বড় ঘটনা কাভার করেছেন ওমর ফারুক। তিনি বলেন, নির্ভুল তথ্য দেয়ার জন্য রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষের সাপোর্ট মেলেনি। ওমর ফারুক বলেন, “বড় বড় ঘটনার পরে অনেকে গণমাধ্যমের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেছেন তুমি সঠিক তথ্যটা দিতে পারো নাই। কিন্তু নির্ভুল তথ্য দেয়ার জন্য রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে সাপোর্ট দরকার ছিল সেটা কিন্তু আমরা পাই নাই। সাংবাদিক ছাড়াও প্রতিটি ঘটনায় ভিকটিমের স্বজনরাও ঘটনাস্থলে ভিড় করেন”।
মিস্টার ফারুক বলেন,“একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি যে মানুষকে ইনফর্ম করবো আমার কাছে তো তথ্য থাকতে হবে। বিভিন্ন বড় বড় ঘটনার অভিজ্ঞতায় দেখতে পেয়েছি যে, এরকম বড় বড় ক্রাইসিসে ইনফরমেশনের যে একটা স্বাভাবিক ফ্লো থাকবে বা বিরতি দিয়ে হলেও একটা ফ্লো থাকবে সেটা কখনোই থাকে না। বড় ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে একটা পাল্টা পক্ষ থাকে তারা এই সুযোগে গুজব ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে”।
গুলশানে জঙ্গী হামলার ঘটনায় দেখা গেছে, একপর্যায়ে সবগুলো টেলিভিশনেরই সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায়।
মাঝরাতে র্যাব মহাপরিচালকের বক্তব্যের পর পরদিন দুপুরে সামরিক বাহিনীর ব্রিফিংয়ের আগে পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি ভাষ্য দেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের এর নির্বাহী সম্পাদক খালেদ মুহিউদ্দীন বলেন, “সবগুলো ক্ষেত্রেই কোনো না কোন মুখপাত্র থাকলে সবসময় ভাল হয়, যে মুখপাত্র কথা বলবেন। জানাবেন যতদূর জানানো যায়। মানুষও জানবে যে কেউ একজন আছেন যিনি আমাদেরকে তথ্য জানাতে পারছেন এবং মিডিয়াও জানবে যে তার কাছ থেকে তথ্য জানা গেছে।”
অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, “গণমাধ্যম যদি সঠিকভাবে খবর না দিতে পারে তাহলে যে ব্যাপারটি ঘটবে সেটি হচ্ছে গুজব তৈরি হবে, বানানো খবর তৈরি হবে।
মুহিউদ্দীন মনে করেন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সরকার এবং মিডিয়ার অবস্থান সাংঘর্ষিক নয়।
তার মতে, “প্রতিটি ঘটনাই প্রতিটি থেকে আলাদা, প্রতিটি জায়গাই প্রতিটি জায়গা থেকে আলাদা। আমাদের যেটা এনশিওর করতে হবে যে পাবলিক ইন্টারেস্টের কোনো জায়গায় সরকার এটাকে বন্ধ করতেছে কিনা কিংবা পাবলিক ইন্টারেস্টের জায়গায় মিডিয়া এটাকে ওভার প্লে করতেছে কিনা। একটা গাইডলাইনের কথা আমাদের যারা মিডিয়া পরিচালনা করেন তারা অনেকেই বলতেছেন কারণ, এখন ধরেন সাতটা নিউজ চ্যানেল অনেগুলো টেলিভিশনও আছে। তারা কোনভাবে খবরটা পরিবেশন করবে কতখানি দেখাতে পারবে বা কতখানি দেখাতে চাইবে সেইটা দেখানোর ক্ষেত্রে একটা নীতিমালা হতে পারে। তবে সেই নীতিমালা হওয়ার ক্ষেত্রে ট্রায়াল এন্ড এররের মাধ্যমেই যাওয়া উচিত।”
খালেদ মহিউদ্দীন মনে করেন, কোন মুখপাত্র থাকলে সবসময় ভাল হয়, যে মুখপাত্র কথা বলবেন। জানাবেন যতদূর জানানো যায়।
বাংলাদেশে এখন ৭টি চব্বিশ ঘণ্টা সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেলসহ ২৫টি টেলিভিশন সম্প্রচারে আছে। এছাড়া অনুমোদন পাওয়া আরো ১৪টি চ্যানেল সম্প্রচারের অপেক্ষায় আছে। এছাড়া রয়ে শত শত অনলাইন পত্রিকা।
অবস্থায় সংকটকালীন পরিস্থিতিতে তথ্য প্রবাহ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, “গণমাধ্যম যদি সঠিকভাবে খবর না দিতে পারে তাহলে যে ব্যাপারটি ঘটবে সেটি হচ্ছে গুজব তৈরি হবে, বানানো খবর তৈরি হবে। যেটি আসলে সমস্যাটাকে আরো গভীরতর করে তুলবে।”
ইকবাল সোবাহান বলছেন, সরকার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না তবে গণমাধ্যমকেও আরো দায়িত্বশীল হতে হবে।
সরকারের ভূমিকা কী হবে এ সম্পর্কে মিস নাসরীন বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মূখপাত্র এ ঘটনাগুলি ভাষ্য দিবেন। সেই ভাষ্য সংবাদমাধ্যমে সবার কাছে প্রচারিত হতে থাকবে। আমরা এখন যে অবস্থাটা দেখতে পাচ্ছি যে ভাষ্য দেয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মুখপাত্র নেই উপরন্তু এমন মানুষের কাছ থেকে আমরা ভাষ্য পাচ্ছি যাদের কিন্তু এই সময়ে কথা বলার কথা নয়।”
সরকার এ ব্যাপারে কোনো কৌশল নিচ্ছে কিনা জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “তথ্য দেয়ার ব্যাপারে যে একটা দায়িত্ব সেটা কিন্তু সরকার বিবেচনার মধ্যে রাখছে যে তথ্য দেয়া হবে। সরকার কোনোভাবেই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। তবে এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকেও আরো দায়িত্বশীল হতে হবে”। বিবিসি

You Might Also Like