ব্রঙ্কসে আরেক বাংলাদেশী সন্ত্রাসী হামলার শিকার

ব্রঙ্কসে আরেক বাংলাদেশী সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ছেন। পর পর এধরনের কযেকটি ঘটনায় ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মো: আলী সাবরি হায়দার (৪০) নামে ব্রঙ্কসে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশী গত ৫ আগস্ট শুক্রবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন। শুক্রবার রাত প্রায় দশটায় ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার সাবওয়ের অদূরে গ্লিব এভিনিউ এবং ওভারিং স্ট্রিটের কর্ণারে আলী হায়দার কে চারজন যুবক এলোপাতারি কিল ঘুষি মেরে মারাত্মক জখম করে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক হামলাকারীকে গ্রেফতার করেছে। এ সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে।
ভিকটিম আলী হায়দারের দেশের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর এলাকায়। তিনি ডানকিন ডোনাটে কাজ করেন। স্ত্রী কন্যা নিয়ে দীর্ঘ দশ বছর যাবৎ আলী হায়দার ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার সাবওয়ের নিকটবর্তী ওভারিং স্ট্রিট এলাকায় বসবাস করছেন।
Bangladeshi_Hader_Hate_Crime_Bronx_NY_2
আলী হায়দারের স্ত্রী সোহানী আলম লাবনী জানান, ওই দিন রাত প্রায় দশটায় কাজ থেকে ফেরার পর তার স্বামী তাকে নিয়ে স্থানীয় গ্রোসারী স্টোরে যাবার পথে অতর্কিত হামলার শিকার হন। গ্লিব এভিনিউ এবং ওভারিং স্ট্রিটের কর্ণারে ৪ জন দুর্বৃত্ত অকস্মাত তার মুখে এবং শরীরে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা তাদের ফোন কিংবা অর্থ কড়ি কোন কিছুই নেয়নি। আঘাতে আলী হায়দার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং প্রচন্ড রক্তক্ষরন হয়। এ সময় লাবনীর চিৎকারে আশে পাশের লোকজন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তারা পুলিশে কল করেন। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ না আসায় তার অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে স্থানীয় হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এম্বুলেন্সে করে জ্যাকবি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ হাসপাতালেই আলী হায়দার বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে ।
এদিকে এ সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে ব্রঙ্কস বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ এবং ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার সিভিক এসোসিয়েশন গত ৮ আগষ্ট সোমবার সন্ধ্যায় ব্রঙ্কসের ওভারিং ষ্টিটে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশকারীরা হেইট ক্রাইম বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে একটি বিরাট র‌্যালি এলাকা প্রদক্ষিণ করে। র‌্যালি থেকে সন্ত্রাসী বর্ণবাদী হামলার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেয়া হয়। বর্ণবৈষম্য হামলা বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যা কার্ড বহন করা হয়। সমাবেশে মূলধারাসহ দল-মত-বর্ণ নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী যোগ দেন।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট বিশিষ্ট আইনজীবি মো. এন মজুমদার, কমিউনিটি এক্টিভিস্ট ড. নুরুল আমিন পলাশ, সাখাওয়াত আলী, কেরামত আলী, মোঃ খবির উদ্দিন ভুইয়া, খসরুজ্জামান খসরু, গোলাম ইয়াহিয়া টিপু, আফসানা আমিন, ইয়াছমিন গাফফার, হোসনে আরা বেগম শিউলী, ফরিদা ইয়াছমিন, ভিকটিমের স্ত্রী সোহানী আলম লাবনী, কন্যা লামিয়া এশা প্রমুখ। প্রতিবাদ সমাবেশে অনান্য কমিউনিটির লোকজনও যোগ দেন। বাংলাদেশী এবং মূলধারার বিভিন্ন মিডিয়া গুরুত্ব সহকারে অনুষ্ঠানটির সংবাদ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে।
সমাবেশ স্থলে প্ল্যা কার্ডসহ সর্বস্তরের নারী-পুরুষ শিশুরা উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট পীস, স্টপ ভায়োলেন্স, কাট আউট হেইট ক্রাইম ইত্যাদি শ্লোগান দেয়।
প্রতিবাদ সভায় আইনজীবি মো. এন মজুমদার জানান, বিগত ছয় মাসে ব্রঙ্কসে বাংলাদেশীদের ওপর বেশ ক’টি হামলার ঘটনা ঘটে। পর পর এসব ঘটনায় ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তিনি এই ধরনের ঘটনাসমূহকে হেইট ক্রাইম বলে উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, গত ২০ জুন সোমবার রাত প্রায় দশটায় ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার স্টারলিং বাংলাবাজার এভিনিউর স্টারলিং ফার্মেসীর সামনে ব্ল্যাক কার চালক সোহেল চৌধুরী (৪০) কে দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক এলোপাতারি কিল ঘুষি মেরে মারাত্মক জখম করে। গত ১৬ জুন বৃহস্পতিবার রাত প্রায় সাড়ে দশটায় ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ম্যাগ্রো এভিনিউর মসজিদে তারাবীর নামাজে যাওয়ার সময় অপর বাংলাদেশি আতিক আশরাফকে দুই কৃষ্ণাঙ্গ যুবক একই কায়দায় হামলা চালিয়ে মারাত্মক জখম করে। গত ২৩ এপ্রিল হামলার শিকার হন মো. সাইফুর রহমান। এরপর বাংলাদেশী কমিউনিটি অব নর্থ ব্রঙ্কসের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম খান ব্রঙ্কসে মারকাত্মভাবে প্রহৃত হন। গত ৬ ফেব্রুয়ারী ক্যাব চালক মো. আতাউর রহমান এবং জানুয়ারীতে ব্রঙ্কসে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মুয়াজ্জিন মজিবুর রহমান আক্রান্ত হন। সর্বশেষ হামলার শিকার হন আলী হায়দার।
এ ঘটনাগুলোকে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ হেইট ক্রাইম বলে মন্তব্য করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্রঙ্কসে হেইট ক্রাইম আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। সমাবেশে বর্ণবৈষম্য হামলাসহ সকল ছিনতাই, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান হয়।
এদিকে, ৪৫ পুলিশ প্রিসেনক্টের ইনচার্জের বরাত দিয়ে আলী হায়দারের কন্যা লামিয়া এশা জানান, তার বাবার ওপর হামলাকারীদের মধ্য থেকে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। অন্য তিন হামলাকারীকে গ্রেফতারে পুলিশ জোর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি পুলিশকে জানিয়েছে, হামলার সময় তিনি (হামলাকারী) মদ্যপানরত ছিলেন। পুলিশ অবশ্য এ হামলাকে হেইট ক্রাইম নয় বলে মন্তব্য করে।
পুলিশের বরাত দিয়ে লামিয়া এশা আরো জানান, কোন ক্রাইমের ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ। ক্রাইম রিপোর্টের প্রেক্ষিতে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিশেষ পুলিশি টহলসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রঙ্কসে বাংলাদেশী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অপরাধজনিত নানা ঘটনা ঘটলেও অনেকেই পুলিশকে জানাতে ভয় পায়। এলাকাবাসী জানায়, ব্রঙ্কসের ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায়ই সন্ত্রাসী হামলা, ছিনতাই, অপরাধজনিত কার্যকলাপ ঘটলেও ভিকটিমরা কেউই পুলিশকে অবহিত করে না। সেজন্য পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খেতে হয়।
সংবাদ সূত্র: সাখাওয়াত হোসেন সেলিম

You Might Also Like