বিএনপিতে নেতৃত্বের বিস্ফোরণ

কর্মীর অভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন জমাতে না পারলেও নেতার অভাব হয়নি বিএনপিতে। কাউন্সিলের সাড়ে ৪ মাস পর শনিবার (০৬ আগস্ট) ঘোষণা করা হয়েছে ৫০২ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটি। সঙ্গে ৭৩ জন উপদেষ্টা ও স্থায়ী কমিটির ১৯ জন সদস্য যোগ করলে কমিটির আকার দাঁড়ায় ৫ শ’ ৯৪ জনে। বিষয়টিকে ‘নেতৃত্বের বিস্ফোরণ’ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ১৯ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় স্থায়ী কমিটির দু’টি পদ ফাঁকা রেখে ঘোষিত হয়েছে ১৭ জনের নাম। এর মধ্যে নতুন দুই মুখ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পদ নিয়ে দলে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নেই। তার পদ পাওয়ার বিষয়টি পূর্ব নির্ধারিতই ছিল। পদের জন্য তিনি যোগ্য ব্যক্তিই বটে।

কিন্তু সালাহউদ্দিন আহমেদের স্থায়ী কমিটিতে ঢুকে পড়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আত্মীয়তার (ভাগ্নি জামাই) সম্পর্ক থাকার কারণেই তাকে এতো বড় পদে বসানো হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ জনে উন্নীত করা হয়েছে ভাইস চেয়ারম্যান প্যানেল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে দলে কথা বলার মত বা নেতৃত্ব দেওয়ার মত একজন লোক খুঁজে পাওয়া যায় না, সেই দলে ৩৫ জন ভাইস-চেয়ারম্যান কোথা থেকে এলো। এদের রাজনৈতিক ব্যাগ্রাউন্ডইবা কী?

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩৫ ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে নতুন মুখ ২২ জন। এদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী, পেশাজীবী নেতা, আইনজীবী, আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা কয়েকজন থাকলেও বিএনপির মত বড় একটি রাজনৈতিক দলের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের সময় এখনো তাদের হয়নি বলেনই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তাছাড়া ক্রমবিন্যাসের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটির জায়গাটাও লংঘন করা হয়েছে ভাইস চেয়ারম্যান প্যানেলে। বর্ষীয়ান রাজনীতিক, ম‍ুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির আগের কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে রাখা হয়েছে এম মোরশেদ খান ও হারুন আল রশীদের পরের সিরিয়ালে। অথচ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের হওয়ার কথা ছিল স্থায়ী কমিটির সদস্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়া সব চেয়ে বড় হ য ব র ল পাকিয়েছেন নিজের উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে। ৭৩ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি হাস্যরসের উদ্রেক করেছে। এখানে এমন সব লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যারা আগে কখনো বিএনপির নির্বাহী সদস্যও ছিলেন না। যাদের নামও জানেন না বিএনপির অনেক সক্রিয় নেতা।

আবার অনেক পরীক্ষিত ও স্বীকৃত নেতাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ৭৩ সদস্য’র এই ‘হাস্যকর’ কমিটিতে ঢোকানো হয়েছে। ৯০’এর ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা আমান উল্লাহ আমান, রাজপথে মার খাওয়া নেতা জয়নুল আবদিন ফারুক, ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালামকে এখন চেয়ার ভাগা-ভাগি করতে হবে আফরোজা খান রিতা, সঞ্জিব চৌধুরী, কাজি আসাদ, কবির মুরাদ, ইসমাইল জবিউল্লাহদের মত ‘হঠাৎ’ অভ্যাগতদের সঙ্গে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাজের লোক না থাকলেও পদ নিয়ে কামড়াকামড়ি করার লোকের অভাব নেই বিএনপিতে। সে কারণেই সবার মন যোগাতে ঢাউস কমিটি করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫০২ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে বিতর্কিত লোকের অভাব নেই। আছেন মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ড কার্যকর হওয়া নেতাদের সন্তান, কারাগারে সাজা ভোগ করা নেতা। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুনোখুনির ঘটনায় হত্যা মামলার আসামিও আছেন বিএনপির নতুন কমিটিতে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, কমিটি নিয়ে নানা জনের নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ থাকতে পারে। সবার মতামতকেই আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখছি। শুধু এটুকুই বলব, অনেক চিন্তা-ভাবনা ও বিচার বিশ্লেষণ করেই ম্যাডাম এই কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন।

You Might Also Like