আমেরিকা : দ্য বাস্কেট কেস

যুক্তরাষ্ট্র একটি সেরা দেশ, যেকোনো বিচারে এ যাবৎকালের সবচেয়ে সেরা রাষ্ট্র। বিশ্বের বড় অংশজুড়ে গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের তুলনামূলক সাফল্যের কৃতিত্বও তার। ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট থেকে সিনিয়র বুশ পর্যন্ত ৬০ বছর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও রক্তপাতহীন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনÑ যে আমেরিকাকে প্রতিদ্বন্দ্বিহীন, বাধাহীন করে তোলে, সেই আমেরিকা এখন জাতীয় নেতৃত্বের বিচারে, সাধারণ মানুষের রুচিবোধে, পাবলিক ডিসকোর্স ও পলিসির প্রচলিত ধারাÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি ‘বাস্কেট কেস’ [এমন কোনো ব্যক্তি বা বস্তু যা অকার্যকর বা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অনুপযোগী বলে মনে হয়]।
বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে উঁচুদরের লোকটি ছিলেন সম্ভবত থমাস উড্রো উইলসন। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বছর প্রেসিডেন্ট এবং এরপর এক মেয়াদে নিউ জার্সির গভর্নর থাকার পর তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হন। তার উত্থান কোনো বস্তি থেকে একজন গ্যাংস্টারের উত্থানের মতো ছিল না। ১৯১২ সালে ডেমোক্র্যাটিক কনভেনশনে মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইটি ছিল প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মিসৌরির বিউচ্যাম্প ‘চ্যাম্প’ ক্লার্ক ও উইলসনের মধ্যে। তিনবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে হেরে যাওয়া উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান উইলসনকে সমর্থন দেন। ফলে শেষ পর্যন্ত উইলসনের হাতেই ধরা দেয় মনোনয়ন। অন্য দিকে, টানা চারবার প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড থাফট ও সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্টের পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রুজভেল্ট বেশির ভাগ প্রাইমারিতে জয়ী হলেও রিপাবলিকান পার্টির গ্রান্ডিরা মনোনয়ন দেন থাফটকে। এতে ক্ষেপে গিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দেন রুজভেল্ট। এই বিভক্তির মধ্যে ব্রায়ানি উইলসনকেই আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং উইলসন বিজয়ী হওয়ার পর থাফটকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে সেই ঘোষণার পুরস্কারও তাকে দিয়েছিলেন।
অথচ এই পদের কোনো যোগ্যতাই ব্রায়ানের ছিল না। তিনি ছিলেন তুখোড় বক্তা। কিন্তু নীতিপ্রণেতা হিসেবে ছিলেন এতটাই নিম্নমানের যে, তিনি ডারউইনের ‘ইভলিউশন থিওরি’ শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি সানফ্রান্সিস্কো ওয়ার্ল্ড ফেয়ারে জাহাজ নিয়ে অংশ নিতে বিভিন্ন দেশকে আমন্ত্রণ জানান। তার এই আমন্ত্রণের মধ্যে ভূমিবেষ্টিত সুইজারল্যান্ডের নামও ছিল। মনোনয়ন পেয়েই উইলসন ঘোষণা করেন তিনি আর কখনোই এমন অমর্যাদাকর রাজনৈতিক কনভেশন মেনে নেবেন না, যা কিনা তাকে কেবল দেশের শীর্ষ পদে বসানোর জন্যই বাছাই করে নিয়েছে।
গত সপ্তাহের ডেমোক্র্যাটিক কনভেনশনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা ইতিহাসকে ফের স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও প্রার্থী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়া কাজ করছে এবং আমেরিকার রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে প্রার্থী বাছাইয়ের আর কোনো ভালো পদ্ধতি এখনো নেই। তাই বলা যায় এই প্রক্রিয়া আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং মাঝে মধ্যে এই কনভেনশনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অনেক প্রতিপাদ্যই সামনে চলে আসবে। কিন্তু এবারের কনভেনশনে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট বা অ্যাডলি স্টিভেনসনের মনোনয়ন মুহূর্তের মতো কোনো চমকপ্রদ বা উজ্জীবিত হওয়ার মতো কিছু ছিল না।
সবচেয়ে অনুজ্জ্বল ক্ষণটি সাথে নিয়ে আসেন মাইকেল ব্লুমবার্গ। তিনি নিউ ইয়র্কের তিনবারের মেয়র এবং আমেরিকার শীর্ষ ধনীদের একজন, যার প্রতিষ্ঠিত ব্লুমবার্গ নিউজ সার্ভিসের দামই প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রিপাবলিকান মনোনয়ন লাভের দৌড়ে এগিয়ে যেতে দেখেন, তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে দলীয় মনোনয়ন দরকার নেই, নিজেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়বেন। প্রাথমিকভাবে একজন স্বতন্ত্র রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবেই নিউ ইয়র্কের মেয়র পদে লড়াই করেন ব্লুমবার্গ এবং কয়েক বছর নিজেকে স্বতন্ত্র হিসেবে জাহিরও করেন। তাই তিনি হিলারি ক্লিনটনকে সমর্থন দেয়ার কথা ভাববেন এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু ট্রাম্পের ব্যবসায়িক ইতিহাস নিয়ে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন তা সহজে ক্ষমা করা যায় না। এটা ঠিক, ব্লুমবার্গের সম্পদ আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে আসেনি, এসেছে নির্মাণ শিল্প ও ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে। কিন্তু ট্রাম্পের ব্যাপারে বক্তব্য তার উদ্দেশ্যটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। ডেমোক্র্যাট স্পিকারদের সবাই ছিলেন সেই সমস্যার অংশ, যা ট্রাম্পের প্রচারণাকেই বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্লিনটন দম্পতি, জো বাইডেন, বার্নি স্যান্ডার্স, এলিজাবেথ ওয়ারেন, বারাক ওবামাÑ এরা সবাই বিশ্বে আমেরিকার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থানের জন্য ভূমিকা রেখেছেন। এরা হাউজিং বাবল, মহামন্দা নিয়ে কাজ করেছেন, ক্লিনটন ছাড়া বাকিরা আমেরিকার জাতীয় ঋণ সাত বছরের মধ্যে দ্বিগুণ করায় ভূমিকা রেখেছেন, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ওলটপালট করেছেনÑ সেই ‘এবানডন্ড রেডলাইন’ ধরে এগিয়েছেন, ইরানের সাথে পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তি করেছেন, আইএসআইএসের ব্যাপারে ইতস্তত মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন, মার্কিনিদের অপটু কার্যক্রম রাশিয়া ও ইরানকে সিরিয়ায় টেনে এনেছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইউরোপীয় ব্যাংকারদের এমন পদ্ধতিতে ইরানের সাথে লেনদেন করার পরামর্শ দিয়েছেন যা এখনো আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ।
এর কোনোটির জন্যই ব্লুমবার্গ বদনামের ভাগিদার নন। সমস্যা তার মাথায়, তার চিন্তাভাবনায়। তিনি ধারণা করতেন নিউ ইয়র্কের কোনো সন্ত্রাসী ‘ওবামাকেয়ার’র বিরোধিতায় উদ্বুদ্ধ হতে পারেন, ইসলাম নয়। তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এবং তার অহংবোধ রিপাবলিকান প্রার্থীর চেয়ে কম ছিল না। মেয়র হিসেবে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন ব্লুমবার্গ, কিন্তু স্কুল পরিবেশ উন্নত করার ব্যাপারে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। আর আমি মনে করি, টাইমস স্কোয়ারকে একটি পথচারী ও সাইকেলচালকদের জোনে পরিণত করা কাজটি ছিল একেবারে অর্থহীন। অথচ, নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত মেয়ররা তাদের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। যেমন ফিওরেল্লো লা গুয়ার্দিয়া হিটলারের তীব্র সমালোচনা করতেন, এড কোচ ছিলেন জাতিসঙ্ঘের তীব্র সমালোচক এবং রুডলফ গিউলিয়ানি মেট্রোপলিটন অপেরা হাউজে ইয়াসির আরাফাতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এটাই নিউ ইয়র্কের চিত্রÑ কমবেশি বন্ধুত্বপূর্ণ, সবসময় নিজের প্রশংসায় রত। ডেভিড লিটারম্যান যেমনটা বলেছেন, ‘এই সেই শহর যে কখনো ঘুমায় না, কিন্তু রাতভর নিজের অধোবাসের মধ্যে এক রুম থেকে আরেক রুমে ঘুরে বেড়ায়।’
নিউ ইয়র্ক ব্যবসায়ী মহলের একজন সুপরিচিত বন্ধু, যিনি মূলত এসেছেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে, তিনি আমাকে গত সপ্তাহে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থীদের নির্বাচন তাকে একটি আরব প্রবাদের কথা মনে করিয়ে দেয়Ñ মূত্র হলো মলের ‘ভাই’। আমার মনে হলো ঠিকই তো, কারণ ট্রাম্প ফেনোমেনন ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত ও নজিরবিহীন, এবং ক্লিনটনের জিদ কিছুটা হলেও ফুটে উঠেছিল। আমি ভেবেছিলাম অন্তত আগের দুই প্রেসিডেন্টের চেয়ে এবার হয়তো কিছুটা উন্নতি ঘটবে। রাজনীতি সর্বদাই একটি বাজে পেশা এবং ডোনাল্ড বা হিলারি কেউই নতুন কোনো স্বাদ এনে দেয়ার মতো ব্যক্তিত্ব নন।
কানাডার ‘ন্যাশনাল পোস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাটির সার সংক্ষিপ্ত করেছেন মাসুম বিল্লাহ

You Might Also Like