‘পৃথিবীতে আজ কোনো সুখবর নেই’

গত শতকের মধ্যভাগে কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে আজ কোনো সুখবর নেই।’ কবি যদি এই শতকে বেঁচে থাকতেন এবং বিশ্বজোড়া সন্ত্রাসের তাণ্ডব দেখতেন, তাহলে কী লিখতেন, তা কল্পনা করা কষ্টকর নয়। জার্মানিতে আবারও আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে ব্যাভেরিয়ার আনসবাখে। এখানেও লোন কিলার। সে সিরীয় শরণার্থী। জার্মানিতে আশ্রয়লাভের অনুমতি পায়নি। তারও মানসিক রোগ ছিল এবং আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে বলে জানা গেছে।

আইএস এই সন্ত্রাসের দায় স্বীকার করেনি। পুলিশও এখন পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি, এটা মানসিক বিকারগ্রস্ত এক ব্যক্তির আত্মহত্যার প্রয়াস, না জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি গানের আসরে ঢুকে বহুজনকে হত্যার চেষ্টা? এই হামলায় সে শুধু নিজেই মারা গেছে। আহত হয়েছে ১২ জন। প্রায় একই সময়ে ঘটিত কাবুলের আরো বড় সন্ত্রাসের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে আইএস। কাবুলে শিয়া মিছিলে হামলায় ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, এটা একটা ভয়াবহ হামলা। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার উপস্থিতি এবং কাবুল একটি সুরক্ষিত শহর হওয়া সত্ত্বেও এই ঘটনা ঘটল কী করে?
বাংলাদেশে সন্ত্রাসের ছোট একটি ঘটনা ঘটলেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বিচলিত হয়ে পড়ে। নিশা দেশাই ছুটে আসেন সন্ত্রাস দমনে সাহায্যদানের প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু কাবুল শহর প্রকৃতপক্ষে তাদের দখলে। আফগানিস্তানকে শুধু সামরিক সাহায্যদান নয়, সেখানে তাদের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এ অবস্থায় কাবুলে আইএস হামলা চালায় কিভাবে? একজন মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞই বলেছেন, ‘আইএস বিশ্বময় সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে এবং কোনো কোনো দেশে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ম“ জোগাচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের মূল ঘাঁটি ধ্বংস করতে হবে এবং আইএস, তালেবান ও আল-কায়েদা—এই তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপকেই চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হবে।’
কিন্তু এই ইচ্ছা আমেরিকার নেই। সম্প্রতি লন্ডনের একটি দৈনিকে একজন কলামিস্ট লিখেছেন, ‘আমেরিকা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বটে, কিন্তু আইএসকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাটি থেকে উৎখাতের ইচ্ছা তার নেই। তার কাছে প্রায়রিটি সিরিয়ার আসাদ সরকারকে উচ্ছেদ করা। এ জন্যই মধ্যপ্রাচ্যের এই তথাকথিত ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) একসময় তারা তৈরি করেছিল এবং এখন আইএস শত্রু হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার সহযোগিতা নিয়ে তাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ঘটাতে ওয়াশিংটন চায় না। আমেরিকার ইচ্ছা, আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতি অথবা সামরিক দখলদারি বহাল রাখা এবং এই আইএস জুজুর ভয় দেখিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতেও তার সামরিক দখলদারি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সফল করা।’
ব্রিটিশ সাংবাদিকের এই অভিমতের জের টেনেই বলা চলে, ফ্রান্স ও জার্মানিতে পর পর দুটি ব্যাপক সন্ত্রাস মার্কিন পরিকল্পনাকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ইউরোপে কমিউনিজম রুখতে গিয়ে জার্মানি ও ইতালিতে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়ে তৎকালীন ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পরবর্তীকালে যে বিপদে পড়েছিল, বর্তমানেও তেমনি বিশ্বের সমাজতন্ত্রী শিবিরকে ধ্বংস করতে গিয়ে পলিটিক্যাল ইসলাম বা ইসলামী জঙ্গিবাদের জন্ম দিতে গিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন শক্তিজোট একই বিপদে পড়েছে। এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, সে জন্য পশ্চিমা শিবিরের মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এই সন্ত্রাস ইউরোপের মাটিতে এখন তার থাবার বিস্তার ঘটিয়েছে। পশ্চিমা শিবিরের এখানেই টনক নড়ার কথা।
ইউরোপের ঐক্য ও নিরাপত্তা আমেরিকার দরকার। এ জন্যই ব্রিটেন যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) না ছাড়ে, সেই আবেদন নিয়ে লন্ডনে ছুটে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা, ব্রিটেনে গণভোটের আগে। কিন্তু ব্রিটেনকে ইইউ ছাড়তে হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ এবং ন্যাটো আমেরিকার শেষ আশা ইউরোপে রাশিয়ার পুতিনের কূটনৈতিক সাফল্য ঠেকিয়ে রাখার জন্য। ইউরোপ এবং ন্যাটো দুর্বল হলে রাশিয়াকে তার হারানো রাজ্যগুলো পুনরুদ্ধার করা থেকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। ক্রিমিয়া রাশিয়ায় ফিরে গেছে। ইউক্রেন এবং আরো দু-একটি রাজ্য যাবে। রাশিয়া পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী হবে। মধ্যপ্রাচ্যেও রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে সুয়েজ যুদ্ধের (১৯৫৬) সময়ের মতো ভূমিকা নেবে।
তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা তাই আমেরিকার আরো একটি বড় মাথাব্যথার কারণ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যতই ইসলামপন্থী হোন, যতই স্বৈরাচারী হোন, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার রেজিম চেঞ্জের নীতিতে মার্কিন সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছেন। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরান সরকারের বিরোধিতা করেছেন এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের উচ্ছেদে ‘রিবেলদের’ সামরিক সাহায্য দিয়েছেন। আইএসের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধপ্রচেষ্টা ব্যাহত করার জন্য রুশ বিমান ভূপাতিত করেছেন। ইসরায়েলের সঙ্গে একটি ছোটখাটো বিবাদ দ্রুত মিটিয়ে নিয়েছেন। এরদোয়ানের এক চোখে ওসমানিয়া সাম্রাজ্য বা অটোমান এম্পায়ার পুনঃপ্রতিষ্ঠার নেশা; অন্য চোখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে অবস্থান নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একক শক্তি হিসেবে মাথা তোলার স্বপ্ন।
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে কথিত আইএস হামলা তাঁর এই স্বপ্নকে দারুণভাবে আঘাত করেছে। তুরস্ক থেকে আতাতুর্কের সেক্যুলারিজম ঝেঁটিয়ে বিদায় করার ব্যবস্থা করেও তিনি কট্টর ইসলামপন্থীদের খুশি করতে পারেননি। আরো কট্টরপন্থী ফেতুল্লাহ গুলেন আমেরিকায় বসে হিজমত নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন এবং এই হিজমত এরদোয়ান সরকারের বিরোধী। তারা তুরস্কে আরো মৌলবাদী সরকারের প্রতিষ্ঠা চায়। অন্যদিকে তুরস্কের শিক্ষিত শ্রেণি, সুধীসমাজ, এমনকি সামরিক ও অসামরিক প্রশাসনের একটা বড় অংশ সেক্যুলার রাষ্ট্রাদর্শের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চায়।
এরদোয়ানের যুদ্ধ তাই দুই ফ্রন্টে। চলতি মাসের ব্যর্থ অভ্যুত্থান তাঁকে এ দুই ফ্রন্টেই সাফল্যলাভের সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি তা নিজেও স্বীকার করেছেন। অনেকে মনে করেন, এই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর পেছনে তাঁরও হাত ছিল। একটি অপ্রস্তুত অভ্যুত্থানকে উসকে দিয়ে তিনি চেয়েছেন এই অভ্যুত্থান দমন ও গণতন্ত্র রক্ষার নামে তাঁর স্বৈরাচারী শাসনকে সব বিরোধিতামুক্ত করার লক্ষ্যে কঠোর দমননীতি চালাতে। তা তিনি এখন চালাচ্ছেন। একদিকে তিনি এই অভ্যুত্থানের জন্য দোষ চাপাচ্ছেন ফেতুল্লাহ গুলেনের ওপর, অন্যদিকে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমে বিশ্বাসী হাজার হাজার মানুষকে তিনি গ্রেপ্তার করেছেন। তাদের ওপর চলছে নিষ্ঠুর নির্যাতন।
সানডে টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কের ধরপাকড় ষাটের দশকে চীনে কালচারাল রেভল্যুশনের সময়ের ধরপাকড়কেও ছাড়িয়ে গেছে। ১১৮ জন জেনারেল, প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডের ৩০০ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আট হাজার পুলিশ বরখাস্ত হয়েছে। তিন হাজার বিচারককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অনেককে আটক করা হয়েছে। ২১ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাবিদকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এক হাজার স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা দ্বারা সব নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ গণতন্ত্র রক্ষার নামে সারা তুরস্কে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এক বিভীষিকার রাজত্ব। এই বিভীষিকা ইস্তাম্বুলের জঙ্গি-সন্ত্রাসকে ম্লান করে দিয়েছে। তুরস্কের এই পরিস্থিতির মুখে পশ্চিমা শিবির এখন কী করবে? তারা সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা করেছে। আবার একই সঙ্গে তুরস্কে যদি মৃত্যুদণ্ড পুনঃপ্রবর্তন করে এরদোয়ান তাঁর বিরোধীদের ফাঁসি দেন, তাহলে তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অর্থাৎ সারা তুরস্কে বিভীষিকার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেও এরদোয়ান পার পাবেন, যদি তিনি তুরস্কে মৃত্যুদণ্ড প্রথা পুনঃপ্রবর্তন না করেন।
ভাগ্যের পরিহাস, বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় এরদোয়ান চরম বিরূপ মনোভাব দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে এই মৃত্যুদণ্ড রদ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। দুদিন না যেতেই সেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানই নিজের দেশে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রথা পুনঃপ্রবর্তন করতে চাইছেন।
সন্ত্রাস দমন ও স্বৈরতন্ত্রের পোষকতার ব্যাপারে পশ্চিমা শক্তি দুমুখো নীতি অনুসরণ বন্ধ না করলে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস পরাজিত হবে না। ইউরোপে এই হামলা যদি আরো ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়, তখন তাদের আরো শক্ত নীতি নিতে হবে। না হলে ইউরোপ আরো বিপন্ন হবে। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি অথবা ট্রাম্প—যিনিই জয়ী হয়ে আসুন, তাঁরা কী করবেন? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নতুন নীতি নির্ধারণ করবেন, না পুরনো নীতি অনুসরণ করতে চাইবেন? নতুন নীতি গ্রহণ করতে চাইলে রাশিয়ার সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে আইএসকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে আইএস তার সন্ত্রাস বাড়াতে থাকবে এবং আইএসের নামের আড়ালে বিভিন্ন দেশে স্থানীয় উগ্রপন্থী দল ও গোষ্ঠী তাদের সন্ত্রাস চালাবে।
বিশ্বশান্তি ও বিশ্বমানবতা দুই-ই আজ এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারে। বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা এই দানব দমনে সাফল্য অর্জন করবে না।

You Might Also Like