শেকড়সন্ধানী একজন প্রকাশক

ড. মাহবুবুল হক

 

বাংলাবাজারের বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে। এদের মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী একজন প্রকাশক হলেন সিকদার আবুল বাশার।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়ন ও প্রকাশে তিনি আগ্রহী ও নিয়োজিত। এ ধরনের একটি গ্রন্থে একজন রাজাকারের নাম মুদ্রিত হওয়ার জন্যে তাকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়েছে জামালপুরের আদালতে। এ জন্যে কেবল তার শ্রম ও অর্থই ব্যয় হয় নি, বিড়ম্বনার শিকারও হতে হয়েছে।

সিকদার আবুল বাশার ইতিহাসমনস্ক একজন ব্যতিক্রমধর্মী প্রকাশক। ইতিহাস সম্পর্কে তার ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট পরিষ্কার। তিনি যেসব ইতিহাসগ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেছেন তাতে রাজ-রাজরার আখ্যান প্রাধান্য পায় নি, বরং বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন দিক।

মানুষের জীবনের সার্থকতাকে তিনি বিচার করতে চান প্রধানত তিনটি মানদণ্ডে। সেগুলি হল : ১. শিক্ষিত, আধুনিক, ইতিহাস-সচেতন যোগ্য প্রজন্ম গড়ে তোলা, ২. সংস্কৃতিবান মানুষ তৈরির জন্যে ভালো গ্রন্থ রচনা করা, ৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগারের মতো সব ধরনের সেবা ও জ্ঞানচর্চামূলক প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষ রোপণ করা। নিজের চিন্তা ও কর্মে সেই মানদণ্ড অনুসরণে তিনি প্রয়াসী।

নিজের গণমুখী ও কল্যাণব্রতী মানস গঠনে যাঁদের প্রভাব ও ভূমিকা ছিল তাঁদের কথা মনে রেখেই জীবনের পথ পাড়ি দিয়ে চলেছেন সিকদার আবুল বাশার। পারিবারিক উত্তরসূরীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার কথা সব সময় স্বীকার করেন তিনি। তার দাদা, চাচা, চাচাতো ভাইসহ অনেকেই তাদের জীবন ও কর্মে সমাজসেবা, শিক্ষাসাধনা ও স্বদেশব্রতে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। আর কর্মজীবনে সক্রিয় ও সফল ভূমিকার পেছনে সব সময় তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ইতিহাসবিদ, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীদের সনিষ্ঠ অবদানকে।

শিক্ষিত সমাজ ও নতুন প্রজন্মকে আমাদের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবগাঁথা সম্পর্কে আগ্রহী ও সচেতন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে সিকদার আবুল বাশারের স্বপ্নকল্প। নিজের চিন্তা, কর্ম ও লেখনীর সাহায্যে সে স্বপ্নকল্প বাস্তবায়নে নিরন্তর নানাভাবে তিনি সচেষ্ট। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশে তৈরি হয়েছে গৌরবোজ্জ্বল জাতীয় ইতিহাস। সেই সংগ্রামী ইতিহাসের বিজয়গাঁথাকে জাতীয় মানসে সদা সমুজ্জ্বল রাখার একান্ত ইচ্ছা তিনি মনের গভীরে লালন করেন।

সিকদার আবুল বাশার একজন পরিশ্রমী প্রকাশক। যে-কোনো বই প্রকাশের সময় এ সংক্রান্ত কাজের সমস্ত দিকেই থাকে তার সযতœ তৎপরতা। প্রকাশনার সব কাজ তিনি করেন নিবিষ্ট মনে। সৃজনশীল ও নান্দনিক শিল্পী হিসেবে প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার কাজে নিজেকে জড়িত করেও আনন্দ পান তিনি। তা ছাড়া প্রকাশিত বই সম্পর্কে সবাইকে অবগত করানোর কাজটিও বেশ মনোযোগ দিয়ে করেন। এ ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারেও তিনি বিশেষ তৎপর ও অগ্রণী। পুস্তক বিপণনের ক্ষেত্রে প্রথাগত পথে খুব-একটা হাঁটতে চান না বলে মনে হয়। তাই দেখা যায়, চটকদার ও চটুল বই প্রকাশের পথ তিনি এড়িয়ে চলেন। বস্তুত, গবেষণামূলক মননশীল বই প্রকাশের দিকেই তার সমস্ত ঝোঁক। আসলে রাতারাতি কাঁচা পয়সা করার লোভ তার নেই। বরং মানুষের মনোজগতে মহৎ মূল্যবোধ সৃষ্টিতেই প্রণোদনা বোধ করেন।

তার প্রকাশনা সংস্থা ‘গতিধারা’ থেকে প্রকাশিত বইগুলির দিকে তাকালেই এ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। আধুনিক ও লোকসাহিত্য, প্রাচীন ও ধ্র“পদী সাহিত্য, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ, অভিধান ও ভাষাতত্ত্ব, সংস্কৃতি ও নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদির মতো উৎকর্র্ষমণ্ডিত গ্রন্থ প্রকাশনায় নিয়োজিত রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। বিগত ২০ বছরে ‘গতিধারা’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। এসব বই ছাত্র-গবেষক-অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনোজগতের ইতিবাচক উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। উক্ত প্রকাশনার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস, ৬৪ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আঞ্চলিক ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া জনপদের ইতিহাস সংক্রান্ত বই। সিকদার আবুল বাশার বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস সংগ্রহ ও প্রকাশনায় অনন্য অবদান রেখেছেন। এভাবেই সংগৃহীত হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির সামগ্রিক ইতিহাসের উপাদান। এ দিক থেকে বাংলাদেশে তিনি আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে বলতে গেলে পুরোধার ভূমিকায় আসীন। প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণেও ‘গতিধারা’ তৎপর। কেদারনাথ মজুমদারের ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ’, দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা’, কুমুদনাথ মল্লিকের নদীয়া-কাহিনী ও ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ এ ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এখানেই লক্ষণীয় প্রচলিত ধারার প্রকাশনা থেকে তার প্রকাশনার গুণগত পার্থক্য। আর এর চালিকা শক্তি হচ্ছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক মনোজাগতিক দৃঢ়তা। তাই তিনি জনপ্রিয় লেখকদের দারুণ-কাটতি বইয়ের পেছনে ছোটেননি, বরং সচেষ্ট হয়েছেন মননশীল নবীন-প্রবীণ লেখক-গবেষকদের কম কাটতির বই প্রকাশের মতো ঝুঁকি নিতে।

সিকদার আবুল বাশার কেবল পরিশ্রমী নিষ্ঠাবান প্রকাশক নন। একই সঙ্গে তিনি লেখক, গবেষক ও অনুবাদক। ‘ঝালকাঠি জেলার ইতিহাস, ‘পটুয়াখালী জেলার ইতিহাস’ তার লেখা গ্রন্থ। এইচ. বেভারেজ বি.সি.এস-এর ‘দি ডিস্ট্রিক্ট অব বাকেরগঞ্জ’ গ্রন্থের অনুবাদ তারই করা। এ ছাড়াও কিছু গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন তিনি। লেখালেখি ও প্রকাশনার মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যকে তিনি কেবল সমুন্নত করেন নি, পাশপাশি নানা আলোচনা সভা, সেমিনার, লোকজ মেলায় অংশগ্রহণ করে ইতিহাস-ঐতিহ্যে-সচেতনতার ধারাকে বেগবান করায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

আকর্ষণীয় ও মানসম্পন্ন বিপুলসংখ্যক প্রকাশনার মাধ্যমে সিকদার আবুল বাশার ‘গতিধারা’কে উন্নীত করেছেন প্রথম শ্রেণির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে। তার এই প্রতিষ্ঠান কোনো সরকারি সংস্থা নয়। বিদেশি সাহায্যপুষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানও নয়। তাই ভাবতে অবাক লাগে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং একান্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলতে গেলে জাতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এ জন্যে যথাযথ স্বীকৃতি তার প্রাপ্য।

জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড়সন্ধানী এই পুরোধা প্রকাশককে অভিনন্দন।

ড. মাহবুবুল হক : খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক ও গবেষক

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

You Might Also Like