বিবেকের ওপর থেকে কালো কাচ সরাও

আইনস্টাইন সম্পর্কে কৌতুক প্রচলিত আছে। কবুতরের বাচ্চা হওয়ার পরে তিনি নাকি বলেছিলেন, কবুতরের বাসায় একটা ছোট দরজা বানাতে হবে। তা না হলে বাচ্চা বেরোবে কীভাবে? বড় দরজা দিয়ে তো বেরোবে মা-কবুতর। কিন্তু বাচ্চাটা বেরোবে কোন দরজা দিয়ে? তার জন্য একটা ছোট দরজা বানাতে হবে।
বড় মানুষেরা অনেক সময় সামান্য জিনিস বুঝতে পারেন না। আমি একবার সুইডেন যাব। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে। লন্ডন হয়ে। ঢাকা বিমানবন্দরে আমাকে উঠতে দিল না প্লেনে। কারণ, আমার ব্রিটিশ ভিসা নেই। আমি বললাম, গত মাসেই আমি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর হয়ে আমেরিকা গেছি। তখন বলল, আমেরিকা গেলে হিথ্রো হয়ে যাওয়া যায়। হিথ্রো বিমানবন্দর হয়ে অন্য কোনো দেশে যেতে হলে যুক্তরাজ্যের ভিসা লাগে। আমি বললাম, আমার আমেরিকার ভিসা এখনো ভ্যালিড। বলল, তাতে কী? একই ব্যক্তি দুই দিন আগে আমেরিকার উদ্দেশে রওনা দিলে বিনা ভিসায় হিথ্রো বিমানবন্দরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, কিন্তু অন্য কোথাও গেলে পারবেন না। নিয়মকানুন যে কত অদ্ভুত হতে পারে!
এবার আসুন গাড়ির কালো কাচ প্রসঙ্গে। যদি এটা গাড়ির সঙ্গে আসা আসল কালো কাচ হয়, তাহলে সরাতে হবে না। যদি আপনি কালো আরবণ লাগান, তাহলে সেটা সরাতে হবে। কেন? কারণ, কালো কাচঢাকা গাড়ি চড়ে গুমকারীরা গুমকৃতদের বয়ে নিয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে অকৃত্রিম কালো কাচওয়ালা গাড়ি কি গুমকারীরা জোগাড় করতে পারবে না?
পত্রিকায় পড়লাম, কোন গাড়িতে নারায়ণগঞ্জের গুমকৃতদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, পুলিশ তা জেনে ফেলেছে। পুলিশ যে গুমকারীদের ধরতে পারে না, তার পেছনের রুইকাতলাদের ধরে না, নাটের গুরু পালিয়ে যায়, তার কারণ এই নয় যে তারা কালো কাচে ঢাকা গাড়িতে যায়। তা এ জন্য যে পুলিশের চোখে একটা কালো কাচ লাগিয়ে দেওয়া হয়!
কাজেই নাগরিকদের আর্তি, নিজের চোখের কালো কাচ সরান। রাস্তার নিরীহ নাগরিকদের কালো আবরণ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখতে হবে না।
কালো কাচওয়ালা বা কাচে আবরণ-লাগানো গাড়ি ধরতে ও তাদের জরিমানা করতে পুলিশের উৎসাহ গত কয়েক দিনে ছিল দেখার মতো। মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট। সার্জেন্টদের মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রাখা। সঙ্গে একটা করে রেকার। যে গাড়িওয়ালা কথা শুনবেন না, তাঁর গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। গাড়িওয়ালা যদি বলেন, আমার কালো কাচ অরিজিনাল, তখন পুলিশ খুঁচিয়ে দেখে, সত্যি তা-ই কি না।
আইনের রক্ষক তারা। আইন হয়েছে, তারা তো রক্ষা করবেই।
তবু রবীন্দ্রনাথের কবিতারই শরণ নিতে হয়:
নিজের দুটি চরণ ঢাকো তবে
ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।
এখন অবশ্য বিষয়টি বিচারাধীন। দুই সপ্তাহের স্থিতাদেশ পাওয়া গেছে, এই দুই সপ্তাহ গাড়ির জানালার কাচে কালো আবরণ নিয়েও চলা যাবে।
গাড়ির জানালার কাচে কালো আবরণ থাকবে কি থাকবে না, এটা আসলে খুব বড় বিষয় নয়। খুলে ফেললেই হলো। একটু রোদ লাগবে, কিংবা গাড়িতে শুয়ে পড়ে ঘুম দিতে পারা যাবে না, এতটুকুনই সমস্যা। নায়ক-নায়িকাদের লোকে রাস্তাঘাটে চিনে ফেলবে, সেটা তাঁরা কোনো প্রকারে সামলে নেবেন। নেতাদেরও আমরা চিনে ফেলব, সেটা অবশ্য তাঁদের জন্য কোনো সমস্যা নয়, কারণ তাঁরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই চলাচল করেন। আর বহু নেতা আছেন, যাঁরা নিজের এলাকায় যেতে পারেন না। যেতে হলে আগে-পিছে পাহারা নিয়ে যান।
সমস্যা হবে যাঁদের গাড়িতে অরিজিনাল কালো কাচ আছে। পাঁচ মিনিট পর পর তাঁদের পুলিশ থামাবে: গাড়ি সাইডে দাঁড় করান। তাঁদের উদ্দেশে আমরা কী বলব? প্রার্থনা করব, আপনার চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘœ হোক।
দুই.
গুরুতর প্রসঙ্গে আসার আগে একটা কৌতুক বলে নিই। এই কৌতুকটা ‘ব¬ন্ড’ বা স্বর্ণকেশিনীদের নিয়ে। ব¬ন্ডরা খুব বোকা হয়, কৌতুকগুলোয় সাধারণত তা-ই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।
একজন স্বর্ণকেশী নারীর মনে হলো, এখন বড়লোক হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গুম করা। কাউকে কিডন্যাপ করে মুক্তিপণ আদায় করা। সে চলে গেল একটা স্কুলের সামনে। সামনে যে বাচ্চাটাকে পেল, তাকেই সে জাপটে ধরে গাড়িতে তুলে বাড়ি নিয়ে এল। তারপর একটা চিঠি লিখল: ‘আপনার ছেলেকে অপহরণ করেছি। মুক্তিপণ হিসেবে এক লাখ ডলার একটা বাদামি খামে ভরে স্কুলের আপেলগাছের নিচে
পুঁতে রাখবেন আগামীকাল সকালের মধ্যে। ইতিÍএকজন স্বর্ণকেশিনী।’
তারপর সেই চিঠিটা বাচ্চাটার জামায় গেঁথে দিয়ে তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল তার বাড়ির সামনে। পরের দিন সে গেল আপেলগাছের নিচে। দেখল, সত্যি একটা জায়গার মাটির নিচে একটা বাদামি খাম। তার ভেতরে এক লাখ ডলার। আর একটা চিঠি: ‘একজন স্বর্ণকেশিনী হয়ে তুমি আরেকজন স্বর্ণকেশিনীর এত বড় ক্ষতি কীভাবে করতে পারলে!’
এটা নিতান্তই কৌতুক। মানেটা হলো, দুই ব¬ন্ডই খুব বোকা।
কিন্তু এই বাংলাদেশে এই কৌতুক শুনে হাসার উপায় নেই। যদি আজকে আপনার বাচ্চাকে কেউ তুলে নিয়ে যায়Íআল্লাহ না করুনÍএবং কয়েক ঘণ্টা পরে এই রকম একটা চিঠিসমেত ফেরত দিয়ে যায়, আপনি কী করবেন? আমার ধারণা, আমাদের অনেকেই নির্ধারিত জায়গায় মুক্তিপণের টাকা রেখে আসতে চাইব। অথবা বউ-বাচ্চা নিয়ে এলাকা ত্যাগ করব।
এই বাংলাদেশ এখন এমনি রকম সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। এখানে কৌতুকের বিষয় আর কৌতুকের বিষয় নেই, আমাদের জন্য জীবনমরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বরং ইশপের গল্পের ভেকগণের মতো করে বলতে পারি, ওহে বালকগণ, তোমাদের জন্য যা ছেলেখেলা, আমাদের জন্য তা জীবনমরণ সমস্যা!
তিন.
সময়টা খুব খারাপ। একটার পর একটা বাজে ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। গুমের পর গুম। খুনের পর খুন। ফেনীতে যেভাবে গুলি করে গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, সেই নৃশংসতার কোনো তুলনা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। নারায়ণগঞ্জের নৃশংসতা ভয়াবহতম, নজিরবিহীন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ওয়েব পেজে প্রশ্নপত্র আগেই ছড়িয়ে পড়ছে, পরীক্ষার পরে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, আসলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে, তবু কারও বিকার নেই।
পর পর দুটো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটল। কত কত মানুষ মারা পড়ল। কিন্তু এ নিয়েও কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। কেউ শোক প্রকাশ করল না। পতাকা অর্ধনমিত হলো না। আমরা ধরেই নিয়েছি, গুম হবে, মানুষ মারা পড়বে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে, লঞ্চ ডুববে, মানুষ মারা যাবে। অনিয়মই এখানে নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে।
আমি যখন পুলিশ ও প্রশাসনকে বলছি, চোখের ওপর থেকে কালো কাচ সরিয়ে নিন, তখন মনে হচ্ছে, আগে নিজেকে বলতে হবে, বিবেকের ওপর থেকে কালো কাচটা সরাও।
আমরা এত অনুভূতিহীন, বিকারহীন, অসাড় হয়ে পড়ছি কেন? কেন আমরা বলছি নাÍনা, এভাবে গুম চলতে পারে না, এটা থামাও? এভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারা চলবে না, থামাও। যারা গুম করছে, যারা মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তাদের বিচার করো, সর্বোচ্চ শাস্তি দাও। এটার পুনরাবৃত্তি রোধ করো।
আমরা কেন সবাই মিলে আওয়াজ তুলছি না, প্রশ্নপত্র ফাঁস চলতে পারে না। ফাঁস হওয়ার পরেও সেই প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমাদের নতুন প্রজন্মটাকে ধ্বংস করবেন না। দয়া করুন। ব্যবস্থা নিন।
আমরা কেন বলছি নাÍলঞ্চ পানিতে ডুববে, এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান বলছিলেন, আমাদের বরিশালের জাহাজ দেখবেন ডোবে না। ডোবে এই ছোটখাটোগুলো। ঠিকমতো নকশা করা হলে আর নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হলে কোনো নৌযানই ডুববে না, যদি না চালক বা মালিক নিজেরা ডোবায়। কেন আমরা আমাদের নৌযানগুলোর নকশা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রণীত হওয়াকে বাধ্যতামূলক করছি না?
আমরা সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছি, তা শুধু এই জন্য নয় যে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটছে; বরং তা এই জন্য যে আমাদের বিবেকে কোনো নাড়া নেই, আমরা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছি না, এবং ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাধ্য করতে আমরা সোচ্চারও হচ্ছি না।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

You Might Also Like