ইসলামে শান্তি ও নিরাপত্তার গুরুত্ব

ব্যক্তি সমাজ রাষ্ট্র ও মানবতার জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তার বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। মানবতার সকল ক্ষেত্রে সকল প্রকার উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং সার্বিক ও সার্বজনীন অগ্রগতির ভিত্তি হলো শান্তি, স্থিতিশীলতা, ও নিরাপত্তা। এ দিকে ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ খাদ্যের নিশ্চয়তার সাথে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানকে মানুষের জন্য তাঁর করুণা ও অনুগ্রহ বলে ব্যক্ত করেছেন। তিনি মক্কাবাসীদের লক্ষ্য করে বলেন: ‘তারা যেন অবশ্যই এই ঘরের (কাবা ঘর) মালিকের ‘ইবাদাত করে, যিনি তাদেরকে ক্ষুধার সময় খাদ্য এবং ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন’। [সূরা কুরাইশ, ৩-৪]

ইসলামী শারী’আতের উদ্দেশ্যসমূহের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিরাপত্তা বিধান করা। বিশেষজ্ঞগণ অত্যন্ত জরুরি ও অত্যাবশ্যক উদ্দেশ্যকে ৬টি বিষয়ের নিরাপত্তা বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। সেগুলো হলো; ধর্ম, জীবন, বংশ, সম্পদ, বুদ্ধিমত্তা ও সম্মানের সংরক্ষণ করা ও এগুলোর নিরাপত্তা বিধান করা। ইসলামী বিশেষজ্ঞ আল- মাওয়ারদী বলেন, পৃথিবীর স্থিতিশীলতা ও এর শৃংখলা বিধান ৬টি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে। তন্মধ্যে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেখানে মানুষ অতি তৃপ্তির সাথে বসবাস করবে। মানুষের আশা- আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে, ভাল মানুষ সুখ-শান্তিতে জীবনযাপন করবে আর দুর্বল মানুষও যেখানে ভালেবাসা, সহযোগিতা বন্ধুত্বভাব অর্জন করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্যতম।

ইসলাম মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে আহ্বান জানায় যে, হে মানব সকল! তোমরা সৃষ্টিকর্তার বিধি-বিধান ও ব্যবস্থার সাথে একমত পোষণ কর। তাতে সকল মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। নিরাপত্তা লাভ করবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন: ‘তোমরা এমন একটি কথার (ব্যবস্থা) দিকে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান’। [আল- ‘ইমরান, ৬৪] আল্লাহর এ আহ্বানে তারা যদি সাড়া না দেয় তাহলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায়ের স্বার্থে তাদেরকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন: ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য আর আমার ধর্ম আমার জন্য’। [আল- কাফিরুন, ৬] শুধু তাই নয়, অশান্তি, অস্থিরতা ও ভীতির অবস্থা, বিশৃংখলা, বিপর্যয়ের সৃষ্টি ও নিরাপত্তা যাতে বিঘিœত না হয় সেজন্য যারা অন্যান্য ধর্ম, দেব- দেবতা ও ব্যবস্থার অনুসরণ করে তাদেরকে গালি দিতে পর্যন্ত নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ‘যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের ডাকে তোমরা তাদেরকে গালি দিওনা’। [আল- আন’আম, ১০৮]

আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টিকে আরো সূক্ষ্ম ও সার্বজনীনভাবে পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, প্রকৃত মু’মিন হলো সে ব্যক্তি যার কাছে মানুষরা তাদের রক্ত ও সম্পদের নিরাপত্তা লাভ করে’। [আল- আলবানী, সাহীহ ইবন মাজাহ, হা . নং ৩৯২৪] এ শান্তিরভাব তৈরি ও বজায় রাখার জন্য আল্লাহর রাসূল আরো বলেছেন: ‘তোমরা সকলে আল্লাহর বান্দা হিসাবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও’। [আল বুখারী ও মুসলিম] সুতরাং যে মু’মিন- মুসলিমদের ব্যাপারে মানুষেরা তাদের জীবন ও সম্পদ নিয়ে ভীত- সন্ত্রস্ত হবে না, তারা তাদের ধর্মীয় উপাসনা ও শ্রদ্ধা- সম্মানের পবিত্র স্থানগুলোর ব্যাপারেও কোন ভীতিকর অবস্থায় থাকার প্রশ্নই আসে না। তাই প্রকৃত কোন মুসলিমের অন্যের ধন-সম্পদ, জীবন, তাদের উপাসনালয় ইত্যাদির ওপর চড়াও হওয়ার, আঘাত করার কোন কল্পনাই করা যায় না। ইসলাম এটাকে কোনভাবেই অনুমোদন দেয় না।

ইসলাম ও নবীর বিদ্যালয় থেকে মানব জাতির যে প্রজন্ম শিক্ষা অর্জন করেছে, আবার নিষ্ঠার সাথে যারা তাদের অনুসরণ করেছে এবং করছে তারা সকলেই এর চির শাশ্বত মহান শিক্ষার সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে কার্যকরী করেছে। এমনকি ঘোষিত যুদ্ধের ময়দানেও তারা দুর্বল, বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও নিরীহ সাধারণ মানুষদের সাথে অসদাচারণ করতেন না। গাছ, শস্য ফল-ফলাদি ইত্যাদি নষ্ট করতেন না। তারা ইসলাম ও তাদের নবীর শিক্ষা ও যুদ্ধ নীতির সামান্যতম সীমাও লঙ্ঘন করতেন না। নিহত ব্যক্তির অঙ্গহানি করতেন না। মরদেহের সাথে অসম্মানজনক ব্যবহার করতেন না। প্রতিপক্ষ শক্তি যখন সন্ধি করার ইচ্ছা ব্যক্ত করতো তখন আল্লাহর নির্দেশের আলোকে সঙ্গে সঙ্গেই মুসলিমগণ তাদের সাথে সন্ধি করে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। আল্লাহ বলেন, ‘তারা যদি সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে আপনিও তার দিকে ঝুঁকে পড়বেন’। [আল-আনফাল, ৬১] আর চুক্তিবদ্ধ পক্ষের সাথে কখনো আগে চুক্তি ভঙ্গ করতেন না।

ইসলাম নিরস্ত্র বেসামরিক লোকদের সাথে যুদ্ধ করতে নিষেধ করে। বরং সশস্ত্র ব্যক্তিরাও যদি চুক্তিতে এগিয়ে আসে তাহলে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন: ‘অতঃপর তারা যদি তোমাদের কাছ থেকে সরে দাঁড়ায়, তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের নিকট শান্তি প্রস্তাব করে তবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা অবলম্বনের পথ রাখেননি’। [আন- নিসা, ৯০]

রক্তপাত এড়ানো এবং শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্য ও দূরদৃষ্টি নিয়ে সাথীদের চরম ক্ষোভ ও অসমর্থন থাকা সত্ত্বেও নতজানু ও স্পষ্টত অপমানজনক শর্তগুলো মেনে নিয়ে আল্লাহর নবী সেদিন হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ছিলেন।

মক্কা বিজয়ের সময়েও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁকে ও তাঁর সাথী মুসলিমদের যারা অবর্ণনীয় নির্যাতন করেছে, জীবন, ধন-সম্পদ কেড়ে নিয়েছে, তাদেরকেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। এসব কিছুই ছিল শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। রক্তপাত, ধন-সম্পদের ক্ষতি সাধন, ভীতিকর, অস্বস্তিকর, বিশৃংখলা সৃষ্টির পথকে রুদ্ধ করে দেয়া।

শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার প্রতি সম্মানবোধের প্রতি ইসলামের সর্বোচ্চ গুরুত্ব এই পর্যায় পৌঁছেছে যে, কোন মানুষকে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে হত্যার দোষে দোষী হওয়ার অপরাধে হত্যা করার কারণ ছাড়া যদি হত্যা করা হয়, তাতে যেন সকল মানুষকে হত্যা করার শামিল হয়। পক্ষান্তরে একজন মানুষকে জীবিত রাখা যেন সকল মানুষকে জীবিত রাখা। আল্লাহ তা’আলা বলেন: ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করলো আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করলো’। [আল- মায়িদাহ, ৩২]

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন: ‘আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। কেউ অন্যায়ভাবে নিহিত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমরা তার প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি’। [বানু ইসরাঈল, ৩৩] এখানে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, ‘যথার্থ কারণ ছাড়া’ ন্যায় সঙ্গতভাবে এ বিষয়টি নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র ও এর বিচার বিভাগ। এর অর্থ কোনভাবেই এটা নয় যে, ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নেবে। তাহলে তো সমাজে আরো বেশি বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে যা ইসলামী নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

ইসলাম মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছে, মানবতার কল্যাণের অন্যতম দিক হলো শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা। এ দায়িত্ব মুসলিম জাতির ওপর ন্যাস্ত। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে আল্লাহ তাদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন: ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের বাছাই করা হয়েছে মানবতার কল্যাণের জন্য’। [আল- ‘ইমরান, ১১০] ইসলামের এ মহৎ উদ্দেশ্যের প্রেক্ষাপটেই ‘দীন’কেই সর্বৈব কল্যাণকামিতা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘দীন সর্বৈব কল্যাণকামিতা’ (বিশ্ব মানবতার জন্য কল্যাণকামী)। সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! কার জন্য? তিনি বলেন, ‘আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম নেতৃবৃন্দের জন্য এবং তাদের সর্ব-সাধারণের জন্য’। [সাহীহ মুসলিম] আর মানবতার কল্যাণকামিতার সর্বোচ্চ দিক হলো মানুষের জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

মানুষের জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই ইসলামী ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপনকে অপরিহার্য করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব বিষয় মানুষের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য, হিংসা- বিদ্বেষ, জিগাংসা, হানাহানি, খুন খারাপী, হতাশা, বঞ্চনা, শোষণ, নিপীড়ন এবং সাধারণ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরায়, ইসলাম এ সকল বিষয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং হারাম ঘোষণা করেছে। তাই ইসলামের সাথে সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদসহ যে কোন ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কোনই সম্পর্ক নেই। ‘ইসলাম’ শান্তির ধর্ম, নিরাপত্তার ধর্ম, মানবতার ধর্ম।

You Might Also Like