বিএনপির জাতীয় ঐক্যের আহ্বান : লক্ষ্য বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম

রিয়াদুল করিম :
বিএনপি শুরু থেকেই ধরে নিয়েছে, তাদের জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সাড়া দেবে না। কিন্তু দলটির নেতারা মনে করছেন, এই আহ্বান জামায়াত ইস্যুতে কিছুটা চাপে ফেললেও বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ার আহ্বানে সরকার না এলেও বিএনপি নিজেদের মতো করে একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম গড়ার চেষ্টা করবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতীয় ঐক্য ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিএনপি মনে করছে, তাদের জাতীয় ঐক্যের আহ্বান আওয়ামী লীগ নাকচ করেছে। তারপরও দলটি একই আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তাদের মূল লক্ষ্য সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপির সঙ্গে একমত হওয়া দলগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম গড়া।
বিএনপির সূত্র জানায়, তাদের মূল লক্ষ্য ২০-দলীয় জোটের বাইরে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা। কিছু কর্মসূচির মাধ্যমে ‘সরকারের ব্যর্থতা, অপশাসন ও গণতন্ত্রহীনতার কারণে জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে’ এমন বার্তা দেওয়া এবং একটি কনভেনশন করা।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার বিএনপির আহ্বানে শেষ পর্যন্ত সাড়া না দিলে বিএনপি ২০-দলীয় জোটের বাইরে থাকা সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা করবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যারা একমত হবে, তাদের নিয়ে এই ঐক্য গঠন করা হবে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপি অনেক দিন ধরেই এ ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করার চেষ্টা করছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ২০১২ সাল থেকে এই উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। সে সময় দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওই প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন। কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি, গণফোরাম, বিকল্প ধারা, জাসদ (রব), নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এরপর বিএনপির চেয়ারপারসন ও দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন সময় জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন। সর্বশেষ গুলশানে জঙ্গি হামলার পর খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে এই পরিস্থিতিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিএনপি মনে করছে, সরকারকে চাপে রাখতে ২০-দলীয় জোটের বাইরে একটি বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজন। গত ৩০ মে খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছিলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে’ আনতে হবে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির একার পক্ষে তা সম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সব গণতান্ত্রিক দল, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, সুশীল সমাজ—সব শ্রেণির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে নতুন ‘প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করতে হবে।
বিএনপির সূত্র জানায়, এখন বিএনপি এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম গঠন করতে চায়। এ জন্য কিছু দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর এই প্রক্রিয়া আরও গতি পেতে পারে। ভেতরে ভেতরে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি প্রাথমিক অবস্থায় মতবিনিময়ের মতো কিছু কর্মসূচি নেওয়া হতে পারে। ঢাকার বাইরে সমাবেশ করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে।
বিএনপি ও জোটের সূত্র জানায়, এই বৃহত্তর ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বিএনপির জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে বাধা মনে করা হচ্ছে। সর্বশেষ ১৩ জুলাই জোটের বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে। খালেদা জিয়া বৈঠকে বলেন, বিএনপি জাতীয় ঐক্য করতে চায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জামায়াতই বাধা। জামায়াতের কারণে ড. কামালের গণফোরাম, রবের জাসদসহ আরও কিছু দল ও ব্যক্তি ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিতে রাজি হন না। তখন জামায়াতের প্রতিনিধি বলেন, ভোটের রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান কী? জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, এটি ভোটের বিষয় নয়। এখানে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ওই সভায় থাকা একটি দলের চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, সেদিনের আলোচনায় মনে হয়েছে, একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম গঠন এবং কনভেনশন করা বিএনপির লক্ষ্য।
বিএনপির সূত্র জানায়, বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে চাপে পড়েছে। কিন্তু জামায়াতকে জোটছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলটি জামায়াতকে বাইরে রেখে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়া করতে চায়। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী এমাজউদ্দীন আহমদও সম্প্রতি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে জামায়াতে ইসলামী জাতির কাছে ক্ষমা চাইলে তাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে আপত্তির কিছু থাকবে না। অথবা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে জামায়াত একপাশে সরে দাঁড়াতে পারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির এই আহ্বানের কয়েকটি ইতিবাচক দিক তাঁরা দেখছেন। যেমন, এই আহ্বান বিএনপির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। পাশাপাশি এই ইস্যুতে মাঠে নামতে পারলে বিএনপি লাভবান হবে। বিএনপিকে সরকার সব সময় জঙ্গিবাদের জন্য অভিযুক্ত করে আসছে, বিএনপির এই উদ্যোগ জনমনে সরকারের অভিযোগের জবাব কাজ করবে।

You Might Also Like