শক্তিশালী মুসলিম উম্মাহ গঠন

মুসলিম উম্মাহর অবস্থা আজ খুব ভালো নয়, তা সবাই জানেন। এখন পর্যন্ত আদর্শিক দিক দিয়ে মুসলমানদের মাঝে, উম্মাহর অবস্থান এবং ইসলাম সম্পর্কে অনেক অজ্ঞতা রয়েছে। এখানে বিদায়াত প্রচলিত আছে। মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ জায়গায় শিরক প্রবেশ করেছে। বস্তুগতভাবে বললে, বেশির ভাগ মুসলিম দেশেই অশিক্ষা ও দারিদ্র্য বিরাজমান। এ ছাড়া উন্নয়নের দিক থেকেও তারা অনেক পেছনে। কিছু দেশ ছাড়া মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুব খারাপ, তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও খুব দুর্বল।

মুসলিম বিশ্বের আদর্শিক অবস্থা, তাদের বস্তুগত অবস্থা যখন এমন- তখন একটি শক্তিশালী উম্মাহ গঠন করতে তাদের কী করা উচিত? একটি শক্তিশালী উম্মাহ গড়ে তুলতে অবশ্যই তাদেরকে শিক্ষা, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষাকে গড়তে হবে। আদর্শিক বিষয় দেখার আগে এগুলো হলো অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে আমরা সবাই অবগত। সব দেশেই নয়, বেশির ভাগ দেশেই ইসলামি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা পূরণ হচ্ছে না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি- আমার স্কুল থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত আমাকে কুরআনের বিশটি আয়াতও শেখানো হয়নি। আমি দশটি আয়াতও শিখিনি। শিখিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী- যিনি আমাদের আদর্শ। তাহলে কি এ শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষা আমাদের চাহিদা পূরণ করছে?

এটি পূরণ করছে না। স্বাধীন মুসলিম দেশগুলোর শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা গড়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমি জানি, এটি সময়ের ব্যাপার এবং এখানে আল্লাহর বিধান এবং অন্য অনেক বিষয় জড়িত। তাই সময় প্রয়োজন। কিন্তু উদ্দেশ্য স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা অর্জন করতে হবে, যেটি আমাদের যাবতীয় বস্তুগত চাহিদা পূরণ করবে, সভ্য-সুন্দর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সব চাহিদাই পূরণ করবে। একই সাথে, এটি আমাদের ইসলামিক প্রয়োজন মেটাবে- যদিও বর্তমানে বেশির ভাগ দেশেই এ ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কিন্তু উম্মাহর কাছে উদ্দেশ্য পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বৈষয়িক অগ্রসরতার জন্য, আদর্শিক উন্নতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা। যদি চলমান শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের প্রয়োজন পূরণ না করতে পারে তাহলে আমাদের দায়িত্ব হবে ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন করা এবং ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে জানা। ব্যক্তিগত পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই।

যোগ্য উম্মাহ গড়ার কথা বলছিলাম। বস্তুগত বিভিন্ন দিকের মধ্যে কিছু বিষয়ের ওপর আলোচনা করেছি। সত্যিকার অর্থে আমাদের এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে যে, উম্মাহ নিজেই আগ্রাসনের শিকার, হুমকির সম্মুখীন। আজ আমরা জানি, অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি সভ্যতার দ্বন্দ্ব (Clash of Civilization) সম্বন্ধে কথা বলছেন। আমেরিকার একজন প্রধান পণ্ডিত, হান্টিংটন সভ্যতার দ্বন্দ্ব সম্বন্ধে কথা বলেছেন এবং তিনি বলেছেন, ‘পশ্চিমাদের কাছে ইসলামই পরবর্তী হুমকি। পাশ্চাত্য সভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে এর বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকির অবসান ঘটাতে হবে।’ যেন এটিই সভ্যতার সর্বোচ্চ সীমা, যেন এটিই শেষ কথা। আমরা পশ্চিমা সভ্যতাকে শেষ হিসেবে গ্রহণ করি না। শুধু হান্টিংটন নন, ফুকুয়ামা তার বই The End of History (ইতিহাসের সমাপ্তি)-তে বলেছেন, ‘ইতিহাস তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছেছে। তিনি বোঝাচ্ছেন, সত্যিকার অর্থে সেক্যুলার গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ হলো শেষ দৃষ্টিভঙ্গি, যেটি মানবসভ্যতা অর্জন করেছে। তাই নতুন কোনো কিছু আসবে না, ভালো কোনো কিছু আসবে না। এটি ইতিহাসের সমাপ্তি।’ কিন্তু আমরা মনে করি, সেক্যুলারিজম শেষ অধ্যায় হতে পারে না।

মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা আল্লাহর বিধানকে ভুলে গেছে এবং এটিই সমস্ত অনৈতিকতার মূল কারণ। আমরা পৃথিবীতে যা দেখি, তাতে বেশির ভাগ যুদ্ধ জাতিগতভাবেই হচ্ছে। সেক্যুলারিজমের কাছে আমরা নৈতিকতাকে ছেড়ে দিতে পারি না, আত্মসমর্পণ করতে পারি না, যা আল্লাহ তায়ালার বিধানকে ভুলিয়ে দেয়।

পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব ও পাশ্চাত্যের চ্যালেঞ্জ

মুসলিম জাতির কাছে পাশ্চাত্যের চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং সবচেয়ে বেশি ও মৌলিক হলো বুদ্ধিবৃত্তিক। মুসলিম জাতির রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সম্বন্ধে বেশি বলা প্রয়োজন মনে করি না। পশ্চিমারা কী চায়? পশ্চিমারা চায় মুসলিম দেশগুলো পশ্চিমাদের নির্দেশ মেনে চলুক। এটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

মুসলিম দেশগুলোর ব্যাপারে অনেক বেশি নাক গলানো হয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদেরকে তাদের নির্দেশ মানাতে চায়। যদি আমরা তাদের আদেশ মেনেও নিই- তারা কখনো মুসলমানদের ভালোর জন্য এবং ইসলামের ভালোর জন্য কোনো নির্দেশ দেবে না। আমি বলি না, অন্যের ভালো বিষয়গুলো শুনব না। আমাদের অন্যের ভালো কথা শোনা উচিত। কিন্তু আমরা পশ্চিমাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে মেনে নিতে পারি না। তারা আমাদেরকে তাদের সংস্কৃতির কাছে নত হতে বলে- যেটা সবচেয়ে অশোভন, অশ্লীলতাপূর্ণ ও দেহ প্রদর্শনে ভর্তি। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতিতে নারীদের নোংরাভাবে ব্যবহার এবং পুরুষদের লালসার বস্তুতে পরিণত করা হয়। জানি না, মানব ইতিহাসে এ রকম বাজে সামাজিক ব্যবস্থা ছিল কি না। তাদের পারিবারিক জীবন কমবেশি তিক্ত, তাদের মা-বাবা অবহেলিত; এমনকি না আছে তাদের শিশুদেরও নিরাপত্তা। সত্যিকার অর্থে মা-বাবা তাদের সমাজে অবহেলিত ও নিরাপত্তাহীন। বৃদ্ধ বয়সে তাদের মারাত্মক সমস্যা হয়। ছেলেমেয়েরা মা-বাবা দু’জনের যতœ পায় না। সম্ভবত তাদের বেশির ভাগই একজনের অর্থাৎ মায়ের যত্ন পায়। অথচ আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে শিশুদের মা-বাবা দু’জনেরই যত্ন পাওয়া উচিত। তারা কোনো কারণ ছাড়াই অথবা অর্থহীন কারণেই তাদের পরিবারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। বিবাহ ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত সুন্দর ব্যবস্থা। এটি পুরুষ বা মহিলা কারো জন্যই ক্ষতিকর নয়। পাশ্চাত্য এমন এক অবস্থায় এসেছে, সেখানে সত্যিই পরিবার ধ্বংস হচ্ছে। তারা অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

অর্থনীতির দিকে আসা যাক। তারা আমাদেরকে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর মানুষ হিসেবে দেখতে চায়। তারা আমাদের দেশ তাদের বাজার বানাতে চায়। কিন্তু আমি অবশ্যই বলব, আসল হুমকি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক। অন্যান্য চ্যালেঞ্জও সেখানে আছে; কিন্তু মূল ও গূঢ় মৌলিক চ্যাকুলঞ্জ যেটি পশ্চিমাদের থেকে আসছে, সেটি সত্যিকার অর্থেই বুদ্ধিবৃত্তিক। তারা অভিযোগ করছে এবং আমাদের বলছে, ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা সম্ভব নয়। ইসলামি রাষ্ট্র হওয়া নাকি ভালো নয়। তারা বলছে, ইসলাম মানবাধিকার দেয় না এবং নারীর অধিকার দেয় না। অবশ্যই দুঃখের সাথে বলব, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু মুসলমানের কর্মকাণ্ডে এটি প্রকাশ পায় যে, ইসলাম যেন মানুষের অধিকার এবং নারীর অধিকার দেয় না। কোনো কোনো দেশের কোথাও কোথাও এর কিছু প্রকাশ আছে, যা এমন ধারণার জন্ম দেয়। অথচ আমাদের তা করা উচিত নয় কিছুতেই। ইসলামের সুনাম ক্ষুণ্ন করা উচিত নয় আমাদের।

মানবাধিকার এবং নারীর অধিকার ইসলামে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সমর্থনে তিনটি মূল প্রমাণ উল্লেখ করব। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সংবিধান উলামা দ্বারা প্রণীত। ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের সংবিধান যদিও উলামা দ্বারা প্রণীত নয়, তথাপি সব দলের উলামা দ্বারা গ্রহণীয়। তাই আমরা বলতে পারি, এসব দলিল যেগুলো উলামাদের দ্বারা প্রণীত অথবা তাদের দ্বারা সমর্থিত- পরিষ্কার প্রমাণ করে যে, ইসলাম মানবাধিকার দিয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের ওপর পৃথক অধ্যায় আছে। ইরানের সংবিধানেও জনগণের স্বাধীনতার ওপর অধ্যায় আছে। এ ব্যাপারে মানবাধিকার সম্পর্কে OIC Declaration যেটি OIC ফিকাহ একাডেমি কর্তৃক অনুমোদিত, তাও দেখা যেতে পারে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

You Might Also Like