জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব অস্বীকার নিরাপত্তা সংকট বাড়িয়েছে : ডয়চে ভেলে

বাংলাদেশে গুলশান হামলা প্রমাণ করলো যে, জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলে নিরপত্তা সংকট কমে না, বরং বাড়ে। আইএস নেই বললেই তার তৎপরতা বন্ধ হয় না, বরং তারা আরো শক্তি সঞ্চয় করে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে, তাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে জঙ্গিদের আক্রমণ বন্ধ করা যায় না। এতদিন বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে ‘টার্গেট কিলিং’। মুক্তমনা, ব্লগার, প্রকাশক, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ, পুরোহিত, যাজক বা এলজিবিটি গ্রুপের সদস্যদের হত্যা।

আর এবার দেখল জিম্মি করে ২০ জন বিদেশিকে হত্যা। তবে আইএসপিআর ২০ জন বললেও এখনো অনেকে নিখোঁজ বলে জানা যাচ্ছে। তাই প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এখনই বেঁধে দেয়া যাচ্ছে না।

এই হামলাকারীরা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে শুক্রবার রাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তেই প্রবেশ করে। তারা দেশীয় অস্ত্রের সঙ্গে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ফোল্ডেড বার এক-২২ পিস্তল ব্যবহার করে। অথচ পুলিশ অদক্ষতার কারণে বিষয়টি বুঝতে না পেরে প্রথমে মামুলি অভিযান চালায়।

ফলাফল – অচিরেই ফুরিয়ে যায় গুলি, শুরুতেই নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। আইএসপিআর বলছে, শনিবার সকালে চূড়ান্ত কমান্ডো অভিযানের আগেই রাতে ২০ জন বিদেশিকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, অভিযান পরিকল্পনায় ১২ ঘণ্টা সময় নিয়ে কী লাভ হলো?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালেও ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতায় মোট নিহতের সংখ্যা জানাননি। শুধু বলেছেন, ছয়জন জঙ্গি নিহত হয়েছে, ধরা পড়েছে একজন। ১০ ঘণ্টায় জিম্মি নাটকের অবসান ঘটে। আর সেই অবসান যে রক্তাক্ত অবসান, তা জানা গেল এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই, আইএসপিআর-এর ব্রিফিংয়ে। জানা গেল, অভিযানের আগেই ২০ জনকে গলা কেটে হত্যার খবর।

বিভীষিকার ১২ ঘণ্টা

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে একদল অস্ত্রধারী গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালালে অবস্থানরত অজ্ঞাত সংখ্যক অতিথি সেখানে আটকা পড়েন।

বাংলাদেশে গলাকেটে হত্যার এই ঘটনা ঘটে আসছে ২০১১ সাল থেকে। কিন্তু সরকার এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলে পাশ কাটিয়েছে এতকাল। এছাড়া তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস এবং জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদার দায় স্বীকারকে ভুয়া বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

গুলশানের এই জিম্মি ঘটনার পর এবারো আইএস দায় স্বীকার করে এবং ২৪ জনকে হত্যার কথা জানায়। দেখা যায়, নিহতের সংখ্যা আইএস-এর দাবির সঙ্গে প্রায় মিলে যাচ্ছে। এমনকি পুরোও মিলতে পারে। কারণ ২০ জনের বাইরে আরো কয়েকটি পরিবার তাদের পরিবারের সদস্য নিহত হওয়ার দাবি করছেন।

শুক্রবার, এই জিম্মি ঘটনার আগে, ঝিনাইদহে এক হিন্দু পুরোহিতকে হত্যা করা হয় বাংলাদেশে। এরপর শনিবার সকালেও সাতক্ষীরায় আরেক পুরোহিতকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তিনি এখন মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপতালে চিকিৎসাধীন। গত একমাসে চারজন পুরোহিততে হত্যা করা হয়েছে। অব্যাহত আছে হত্যার হুমকিও।

সরকার প্রকৃত ঘটনা বার বার আড়াল করায় বাংলাদেশে গেয়েন্দা নেটওয়ার্কও অনেক দুর্বল। তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য আছে কী না, সন্দেহ রয়েছে তা নিয়েও। এর আগে ঢাকা ও রংপুরে দুজন বিদেশি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিল। অথচ তারপরও কোনো কার্যকর নিরপত্তা ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

গুলশানের ঐ স্প্যানিশ বেকারিটিতে প্রধানত বিদেশিরাই মূলত যাতায়ত করতেন। জঙ্গিরা সেটা জানলেও গোয়েন্দাদের কাছে সম্ভবত সেই তথ্য ছিল না। থাকলে যেখানে বিদেশিদের আনাগোনা, সেরকম কূটনৈতিক এলাকায় একটি বেকারি বা রেস্টুরেন্ট এভাবে অরক্ষিত থাকে কীভাবে?

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাই এখন প্রশ্নের মুখে। সাধারণ নাগরিক, সংখ্যালঘু, মুক্তমনা, ব্লগার, বিদেশি নাগরিক – সকলেই যেন টার্গেট। কারুরই যেন নিরাপত্তা নেই। আর যারা এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে চান, তারা কিন্তু ঠিকই থাকেন নিরাপত্তাবেষ্টনীতে।

বাংলাদেশে আইএস-এর কাজ বাড়াতে নেতা নির্বাচন করা হয়েছে তিনমাস আগে। মে মাসে আইএস এক ভিডিও বার্তায় রমজানে তাদের হামলা বড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল। তাদের পরিকল্পনায় বাংলাদেশও ছিল। এখন বোঝা গেল, তারা তাদের ছক অনুযায়ীই এগোচ্ছে। কিন্তু বিপরীতে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখেছে একেবারে ঢিলে ঢালা। তাই যা হবার তাই হয়েছে।

You Might Also Like