দুর্নীতির শীর্ষে পাসপোর্ট

এখন সময় ডেস্কঃ বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্থাটি বলছে, এ খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় পাসপোর্ট খাতে, এর হার ৭৭.৭ শতাংশ।

দ্বিতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৭৪.৬% শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৬০.৮% শতাংশ। চতুর্থ বিআরটিএ ৬০.১% শতাংশ, পঞ্চম ভূমি প্রশাসন ৫৩.৪% শতাংশ, ষষ্ঠ বিচারিক সেবা ৪৮.২% শতাংশ ও সপ্তম অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য ৩৭.৫% শতাংশ খাত। এ ছাড়া ঘুষের শিকার হওয়ার হার ২০১২ তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ছয় শতাংশ।

বুধবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি ‘জাতীয় সেবা খাতের দুর্নীতি ২০১৫’- শীর্ষক এক রিপোর্টে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল রিপার্টটি তুলে ধরেন।

এ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৬৭.৮% শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে। ৫৮.১% শতাংশ পরিবারকে ঘুষ দিতে হয়েছে। পরিবার প্রতি বাৎসরিক গড় পরিমাণ ৪ হাজার ৫৩৮ টাকা।

২০১৫ সালে বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও হয়রানির হার ২০১২ তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত ৬৭.৮% শতাংশ বনাম ৬৭.৩% শতাংশ থাকলেও সেবাগ্রহণকারী পরিবারগুলোকে ২০১২ সালের তুলনায় প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বেশি দিতে হয়েছে।

বিভিন্ন খাতে সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের জনগণের ওপর ঘুষ তথা দুর্নীতির বোঝা অধিক। জরিপে অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৭১% শতাংশ পরিবার ঘুষ বা নিয়ম বর্হিভূত অর্থ দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে ‘ঘুষ না দিলে কাঙ্খিত সেবা পাওয়া যায় না’।

টিআইবি জানায়, নিয়ম বর্হিভূত অর্থের পরিমাণ ৮৮২১.৮ কোটি টাকা। এই প্রাক্কলিত অর্থের পরিমাণ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাংলাদেশের জিডিপির ০.৬% শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ৩.৭% শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রতিবেদনের সারাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ওয়াহিদ আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা রহমান ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ নূরে আলম। টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।

টিআইবি আরো জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কমিউনিটি সিরিজের আলোকে নমুনা কাঠামো তৈরি করে তিন পর্যায় বিশিষ্ট স্তরায়িত গুচ্ছ নমুনায়ন পদ্ধতিতে জরিপটি পরিচালিত হয়। নভেম্বর ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত পরিবারসমূহ ১৫টি প্রধান ও অন্যান্য খাতে যে সকল সেবা গ্রহণ করেছে তার ওপর ভিত্তি করে ১ নভেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপের বৈজ্ঞানিক মান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পাঁচজন বিশেষজ্ঞের সার্বিক সহায়তা ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে।

পল্লী এলাকায় ৭০% শতাংশ এবং শহর এলাকায় ৩০% শতাংশ নমুনা বিবেচনায় ও ৬৪টি জেলা ও ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে স্তর বিবেচনায় প্রতিস্তরে দৈবচয়নের মাধ্যমে ২৪০টি পরিবার নির্বাচন করা হয়। জরিপের আওতাভুক্ত মোট ১৫৮৪০টি পরিবারের মধ্যে ১৫,২০৬টি পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়, যার মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ১০,৭৮৩টি (৭০.৬%) শহরাঞ্চলে ৪,৬৬৩টি (২৯.৪%)।

দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গুরুত্ব ও প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ১৫টি প্রধান খাতকে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। খাতসমূহের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি প্রশাসন, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, কর ও শুল্ক, এনজিও, পাসপোর্ট, গ্যাস, বিআরটিএ, বীমা। এ ছাড়া তথ্য প্রদানকারীরা এর অতিরিক্ত যে সকল খাত উপ-খাতের তথ্য দেন সেগুলো ‘অন্যান্য’ (ওয়াসা, বিটিসিএল, ডাক ইত্যাদি) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাতীয় খানা (পরিবার) জরিপের সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সালে সেবা খাতে ঘুষের শিকার হওয়ার হার ২০১২ সালের তুলনায় সার্বিকভাবে বেড়েছে(৫৮.১% বনাম ৫১.৮%)। তবে সার্বিকভাবে অনিয়ম দুর্নীতির হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ভূমি প্রশাসন, বিচারিক সেবা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, এনজিও ও অন্যান্য খাতে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও বীমা খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, কর ও শুল্ক খাতে দুর্নীতির হার প্রায় অপরিবর্তিত আছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য, বিচারিক সেবা, ভূমি প্রশাসনসহ মোট ৬টি খাতে ঘুষের শিকার খানার হার ২০১২ এর তুলনায় কমেছে। তবে শিক্ষা, বিদ্যুৎ এবং এনজিও এর ক্ষেত্রে এই হার বেড়েছে। ঘুষের হার অপরিবর্তিত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, কর ও শুল্ক ও অন্যান্য খাত।

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামঞ্চলে সেবা খাতে দুর্নীতির প্রকোপ বেশি (৬২.৬% বনাম ৬৯.৫%)। অনুরূপভাবে, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামঞ্চলে ঘুষ প্রদানে বাধ্য হবার হারও বেশি (৫৩.৪% বনাম ৫৯.৬%)।

২০১৫ সালের জাতীয় খানা জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩৬.১% এবং বিদ্যুৎখাতে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ৩১.৯%। উল্লেখ্য, খাতওয়ারী হারের ক্ষেত্রে কৃষিতে ২৫.৮%, কর ও শুল্ক খাতে ১৮.১%, গ্যাস ১১.৯%, বীমা খাতে ৭.৮%, ব্যাংকিং সেবায় ৫.৩%, এনজিও খাতে ৩% এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে (যেমন; বিটিসিএল, ডাক, ওয়াসা ইত্যাদি) দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ১৭.১%। গ্যাসের সংযোগ নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ঘুষ প্রদান করতে হয়েছে যার গড় পরিমাণ ২৭,১৬৬ টাকা।

এ ছাড়া বীমা খাতে সেবা নিতে খানাকে গড়ে ১৩,৪৬৫ টাকা ঘুষ প্রদান করতে হয়েছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত খানাকে বিচারিক সেবার ক্ষেত্রে গড়ে ৯৬৮৬ টাকা এবং ভূমি প্রশাসনে গড়ে ৯২৫৭ টাকা পর্যন্ত ঘুষ প্রদান করতে হয়েছে।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, যিনি সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন তার কাছ থেকে ঘুষ ছাড়া সেবা প্রাপ্তি সম্ভবপর হয় না। যার ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ জনগণ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ঘুষ ছাড়া সেবা প্রাপ্তি এখন প্রায় দুরূহ। সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হ্রাসের প্রবণতাকে এগিয়ে নিতে আইনের বাস্তব, প্রভাবমুক্ত ও কঠোর প্রয়োগ এবং তথ্যের অভিগম্যতা বৃদ্ধিসহ সকল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

You Might Also Like