তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান, মা-বাবার দাবি ‘সবকিছু সাজানো’

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর তনুর দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে এ প্রতিবেদনকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন তার মা-বাবা।

আদালতের নির্দেশে তনুর মরদেহ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয়দফা ময়নাতদন্তের আড়াই মাস পর রোববার দুপুরে মেডিক্যাল বোর্ড প্রতিবেদনটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডিতে) জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগে তনুর শরীরে যৌনক্রিয়ার (সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স) আলামত পাওয়া গেছে। তবে তনু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কিনা, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকি প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে মেডিক্যাল বিভাগের প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা সাংবাদিকদের বলেন, ‘দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের জন্যে তনুর মরদেহ তোলার পর দেখা যায় এতে পচন ধরেছে। সে কারণে দ্বিতীয় প্রতিবেদনে তেমন কোনো নতুন আলামত খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের (যৌনক্রিয়া) আলামত পাওয়া গেছে।’

এদিকে, তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে তার পরিবার। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সবকিছু সাজানো, প্রথম ময়না তদন্তের প্রতিবেদনকে সমর্থন করতেই দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তনুকে হত্যার পরদিন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে তার প্রথম ময়নাতদন্ত করেন ডা. শারমিন সুলতানা। সেই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন তাকে ধর্ষণ ও হত্যার কোনও আলামত পাওয়া যায়নি। আমরা এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করায় তার দ্বিতীয় ময়না তদন্ত হয়। কিন্তু, ৭৮ দিন পর ডা. কামদা প্রসাদের নেতৃত্বে তারা যে দ্বিতীয় প্রতিবেদন দিয়েছেন তাতে আমরা পুরোপুরি হতাশ। এই প্রতিবেদন প্রথম প্রতিবেদনকে সমর্থন করেই লেখা হয়েছে। প্রথমটাতে যা যা আছে এটাতেও তাই তাই। এতে নতুন কিছুই নেই।

তনুর বাবা মনে করেন, মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি এর আগে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে জানিয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেটিই সঠিক।

তনুর মা আনোয়ারা বেগমও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। গতকাল বিকেলে কুমিল্লা সেনানিবাসের অদূরে আলেখারচর এলাকায় তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘তনু সবসময় বোরকা পড়ে চলত, এখন ডাক্তাররা খুনিদের বাঁচাতে আমার মরা মেয়ের চরিত্র হনন করছে।’

তিনি বলেন, সেনানিবাসের ভেতর একটি বাসায় তনুকে হত্যা করে লাশ জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়। আমরা লাশ উদ্ধার না করলে হয়তো শিয়াল-কুকুরে তার লাশ খেত, তখন হয়ত বলা হতো শিয়াল-কুকুরই তনুকে মেরেছে। ঘাতকরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণেই ডাক্তাররা মৃত্যুর কারণ গোপন রেখেছেন।

তনুর মা অভিযোগ করে বলেন, মেয়ে হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে এখন আমাদেরকে সেনানিবাস থেকেই বের করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। আমার মেয়েটা সেনানিবাসের ভেতরই মারা গেছে, তার শরীরে এত জখম থাকার পরও এখন ডাক্তাররা তার মৃত্যুর কারণ খুঁজে পায় না, আমার তনুকে ফেরত দেয়া হোক, আমরা সেনানিবাস ছেড়ে চলে যাব।

তিনি আরও বলেন, তনুর যদি যৌনক্রিয়ার অভ্যাস থেকেই থাকে তাহলে তার চুল কেন কাটা হল, নাক দিয়ে রক্ত আসল কেন এবং তাকে কেন হত্যা করা হল। এখন আমরা সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান বলেন, তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়, কেউ তা মেনে নিতে পারে না। এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্যই এ ধরনের অগ্রহণযোগ্য একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করে প্রকাশ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক একই সূত্রে গাঁথা। হত্যার কারণ উদ্ঘাটন করতে না পারলে এ ধরনের চিকিত্সক দিয়ে কীভাবে আমাদের ফরেনসিক বিভাগ চলবে, কীভাবে মানুষ ন্যায়বিচার পাবে? তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় সুরতহাল এবং দুটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

গত ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে কলেজছাত্রী তনুর লাশ পাওয়া যায়। পরদিন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে তার প্রথম ময়নাতদন্ত করেন ওই কলেজের প্রভাষক ডা. শারমিন সুলতানা। তিনি গত ৪ এপ্রিল ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি এবং ধর্ষণের আলামতও পাওয়া যায়নি। এদিকে আদালতের নির্দেশে গত ৩০ মার্চ দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের জন্য তনুর লাশ কবর থেকে উত্তোলন ও ডিএনএ আলামত সংগ্রহ করা হয়। গত ১৪ মে কুমিল্লার আদালতে এসে পৌঁছায় নিহত তনুর ৭টি বিষয়ের ডিএনএ প্রতিবেদন। এতে তনুর ভেজাইনাল সোয়াবে পৃথক ৩ জন পুরুষের শুক্রানু পাওয়া যায়। তনুর ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়ায় প্রতিবেদনটি দেওয়ার জন্য সিআইডিতে চিঠি পাঠান মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা। একাধিকবার চিঠি চালাচালির পর আদালতের নির্দেশে গত ৭ জুন ফরেনসিক বিভাগের চাহিদা মোতাবেক তনুর ভেজাইনাল সোয়াব, দাঁত, চুল, অন্তর্বাস, কাপড়সহ ৭টি বিষয়ের ডিএনএ প্রতিবেদন ফরেনসিক বিভাগে হস্তান্তর করে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি। -পার্সটুডে

You Might Also Like