ঘুম ও সুখী মানুষ

কামরুজ্জামান

ঘুম। রহস্যের এক অপার জগৎ। ঘুম নিয়ে মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই, আবার ঘুমের মধ্যে আছে রহস্যের আরেক রাজ্য স্বপ্ন। আমি ঘুমের অজানা অধ্যায় আর স্বপ্নের দিকে যাচ্ছি না। সহজ সরল রেখায় ঘুম আমাদের আচ্ছন্ন করে, কখনো কখনো স্বপ্ন এসে চৈতন্যকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো যে ঘুম দোকান থেকে খরিদ করা যায়, স্বপ্ন খরিদ করা যায় না। ঘুম নিয়ে দৈনিকের পাতায় কিংবা দেশ-বিদেশের নানা সাময়িক পত্রে অনেক চমকপ্রদ সংবাদ পরিবেশন হতে দেখেছি, যে না ঘুমিয়ে কেটে যাচ্ছে কারো জীবনের চল্লিশ বছর। পরিচিত বন্ধু বান্ধবদের মধ্যেও দেখেছি না ঘুমিয়ে কেটে যাচ্ছে তাদের দিবস-রজনী। এ নিয়ে গবেষকদের চিন্তার কোনো অন্ত নেই। একবার এক অসামান্য দৃশ্য বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল, সম্ভবত পরিবারটি ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিল স্বজনের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী শহরে। কিন্তু উন্নত চিকিৎসায়ও জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, তাই পরিবারটি ফিরে যাচ্ছে মৃত স্বজনের লাশ নিয়ে খোলা ট্রাকে। আপাদমস্তক আবৃত হয়ে আছে মৃতের শরীর আর প্রায় পাশাপাশি স্বাভাবিক ঘুমে শুয়ে আছে এক অবোধ শিশু। চমকে উঠেছি দেখে একটি চিরনিদ্রা আরেকটি নিদ্রা। ঘুম নিয়ে ঠাট্টা মশকরার কোনো শেষ নেই, সেগুলো আমাদের জীবনাচারে সাহিত্যে ব্যাপকভাবে চর্চিত। এমন সংবাদ আছে যা আমাদের বিচলিত করে আর রসবোধ সৃষ্টি করে। ডোম ঘরে লাশ কথা বলে উঠেছে, ‘স্যার আমি তো মরি নাই’। ঘুম নিয়ে জীবনের মধ্যে গল্পেরও কোনো শেষ নেই, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন গল্প তৈরি হয়ে চলেছে, আর আমরাতো কেউ জানি না কোনদিন এসে উপস্থিত হবে চিরনিদ্রার ক্ষণ। আর এই রহস্যের দ্বার কোনোদিন উন্মোচিত হবে না মহাকালের প্রবাহে। একদিন এসে অস্তিম ঘুম আমাকে তুলে নিবে তার স্বচ্ছ সুন্দর স্বাভাবিক নিয়মে। মৃত্যুকে আমি সৌন্দর্যই বলি, কেননা মৃত্যু না থাকলে পৃথিবী এতো সুন্দর হতো না, নতুনের জয়গান হতো না তারুণ্যের মহিমা বিকশিত হতো না।
এমনি এক ঘুমের গল্প দিয়েই লেখাটি শেষ করা যাক। ছুটির দিনগুলোতে কিংবা কোনো সুযোগ পেলে হাতে কোনো কাজ না থাকলে ঘুরে বেড়ানো আমার স্বভাব। আর কিছু বন্ধু, ছোটভাই সব সময়ই সঙ্গী হয়ে যায় আমার। ছুটির দিন সকালেই বাসায় এসে হাজির আমিনুল। চলো আজ সারাদিন ঘুরে বেড়াবো, ও আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু কত অসাধারণ ভ্রমণ করেছি ওর সাথে বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। প্রকৃতির এতরূপ লাবণ্য লীলালাস্যের ঐশ্বর্য্যরে কান্তি দুই নয়নে দেখতে পেতাম না যদি না আমিনুল আমাকে পাহাড়ের সৌন্দর্যে ঘেরা রাঙামাটির কর্ণফুলী নদীতে নিয়ে না যেতো। আমিনুল এসেই তারা দিচ্ছে চলো বেরিয়ে পড়ি, আমি বললাম, আগে স্থির করা যাক কোথায় যাওয়া যায়। এক সময় নারায়ণগঞ্জ চলে যেতাম কমলাপুর থেকে ট্রেনে করে, ছোট্ট শহর আমার খুব ভালো লাগে ঘুরে ফিরে আবার ট্রেনে ঢাকা চলে আসা।
বর্তমান অবস্থার কথা চিন্তা করে নারায়ণগঞ্জের কথা বাদ দিয়ে আমিনুল বললো আমরা আজ শহরেই ঘুরবো আমিও এক কথায় রাজি। আমাদের বেরুতে বেলা দ্বিপ্রহর গড়িয়ে গেল। ও বললো চলো রমনা পার্কেই যাই কোনো দিন তো ভালো করে পার্কের বৃক্ষগুলোর সাথে কথাই হয়নি কত নাম না জানা বৃক্ষ। আজ ওদের সাথে কথা হবে নাম পরিচয় জানবো কোথায় ওদের আদিবাস। আমরা রমনা পার্কের নাম না জানা বৃক্ষগুলোর নাম পরিচয় জানতে শুরু করলাম। এর মধ্যে আছরের আজান হয়ে গেল। আজানের শব্দ কানে আসার সাথে আমিনুল নামাজের জন্য মসজিদের দিকে রওনা হলো। আমি বললাম, তুমি যাও আমার বেশ ক্লান্তি ভর করেছে আমি এই শিমুল গাছের বেদিতে শুয়ে কিছুটা বিশ্রাম নেই। ও চলে গেল মসজিদের দিকে। কখন আমি ক্লান্তিতে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। এর মধ্যে কতটা সময় গড়িয়েছে কিছুই বলতে পারি না, আমি হঠাৎ জেগে উঠে টের পেলাম গাছের বেদি ঘিরে বসার বেঞ্চগুলোতে সুস্বাস্থ্যের চর্চায় প্রতিদিন নিয়ম করে বেড়াতে আসা মানুষের শোরগোল। তখন আমার ঘুম ভেঙে গেছে তবু আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে আছি। একজন মধ্য বয়স্ক মানুষ খুব তৃপ্তি নিয়ে বলছে, দেখুন বন্ধুগণ একজন সুখী মানুষ কী সুন্দর বৃক্ষের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েছে। আর আমরা দোকান থেকে ঘুম খরিদ করে এনেও ঘুমাতে পারছি না। এই তো সুখী মানুষ, দেখেন কী নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে আছে। একবার ইচ্ছে হচ্ছিল উঠে গিয়ে আমার জীবনের চড়াই-উৎড়াইগুলো মেলে ধরি তাদের সামনে এই তো আমার সুখী জীবন, এই তো আমি সুখী মানুষ। পরক্ষণেই ভাবলাম কিছু মানুষ যদি একজন মানুষকে সুখী ভেবে আনন্দ পায় এটা কম কিসে। থাকুক না সেই মানুষগুলো সুখী মানুষ দেখার আনন্দের মধ্যে।

You Might Also Like