ইসলামে জঙ্গি ও চরমপন্থীর স্থান নেই

আলাউদ্দিন ইমাম: চলমান বিশ্বে মিডিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনজুড়ে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য এবং আতঙ্কের বিষয়। মুসলমান, অমুসলমান ধর্মীয় রাজনৈতিক মহল, এই সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও জঙ্গিবাদীদের নিয়ে শুধু মহাব্যস্ত নয়, রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত। কেন এই সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ জন্ম নিলো, কারা এর পেছনে নাটের গুরু, এর প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা কী হতে পারে এ চিন্তায় হিমশিম খাচ্ছে সব মহল।জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা হারাম : জঙ্গিবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। ইসলামের নামে হোক অথবা অন্য নামে। ইসলামের লেবাস ধারণ করে হোক অথবা ভিন্ন পোশাকে। যখন, যেখানে, অন্যায়ভাবে মানুষের জানমালের ক্ষতি করা হবে, তাই জঙ্গিবাদ। ক্ষতিগ্রস্ত সে মানুষ মুসলমান হোক অথবা অমুসলিম, ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক, দেশী অথবা বিদেশী। ইসলামের নামে-বেনামে অন্যায়ভাবে মানুষ খুন করা, জানমালের ক্ষতি করা অথবা দেশের সম্পদ নষ্ট করাই হলো জঙ্গিবাদ। অন্যায়ভাবে অমুসলিমদের জান-মাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করাই হলো সাম্প্রদায়িকতা। এরকম সাম্প্রদায়িকতাও ইসলামে হারাম।বাংলাদেশের আলেম সমাজ : বাংলাদেশের সব মহলের আলেম এ সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদকে হারাম ফতোয়া দিয়ে আসছেন এবং ওয়াজে, বয়ানে, মসজিদে, মাদরাসায়, মাহফিলে ও মিলাদে এর বিরুদ্ধে বলে যাচ্ছেন। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের ইজ্জত সম্মান ও জানমালের ওপর আঘাত করা এবং অমুসলিমদের ধর্মীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে হামলা সম্পূর্ণ হারাম। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরিফে এবং আল্লাহর রাসূল সা: বিদায়ী ভাষণে বিশদ আলোচনা করেছেন। এই জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সরকারি দল, বিরোধী দল, রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা, ইমাম, খতিব ও পীর মাশায়েখ সবার জন্য ফরজ, তথা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর রাসূল সা: যেকোনো অন্যায়কে প্রতিরোধ করার আদেশ দিয়েছেন। নবী করিম সা: বলেন, ‘তোমাদের যে কোনো অন্যায় দেখে সে যেন তা প্রতিরোধ করে’ (আল হাদিস)।
সাম্প্রদায়িকতা : ইসলাম সার্বজনীন এবং মানবতাবাদী পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হওয়ার কারণে সাম্প্রদায়িকতার সম্পূর্ণ বিরোধী। রাসূল সা: বিদায়ী ভাষণে ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলমানদের জানমালকে মুসলমানদের জানমালের মতো মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ ঘোষণা করেছেন। এ ব্যাপারে ভাষা এবং আঞ্চলিক পার্থক্যকে নির্মূল করেছেন। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্র না থাকায় এবং মুসলমানেরা ইসলামে অজ্ঞ ও চরিত্রহীন হওয়ায়, কিছু কিছু ধর্মান্ধ মুসলমান দেশে ইসলামবিরোধী কাজের কারণে অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে সাম্প্রদায়িক কাজে লিপ্ত হয়। এর আর দু’টি কারণ : একটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামি শিক্ষা ও শাসন এবং অমুসলিমদের জানমালের ক্ষতি করলে কী পাপ হবে সে সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকা। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক স্বার্থবাদিতা ও ভোগবাদী পরিবেশ মানুষকে ভোগী ও লোভী বানিয়ে দিচ্ছে। ফলে চরিত্রহীন ও লোভী এই মানুষ নামের পশুগুলোকে কাজে লাগিয়ে শত্রুরা ইসলামের ক্ষতি করার জন্য অমুসলমানদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। আর ইসলামবিরোধী মহল এবং অমুসলমানেরা বাস্তব কারণ বের করার পরিবর্তে তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এসব অপকর্মকে ইসলামি মহলের সাম্প্রদায়িক কাজ বলে অপপ্রচার চালায়। ফলে আসল কারণ জানা সম্ভব হয় না। অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। দেশে যে অবস্থা চলছে, তাতে মনে হয় আলেম ওলামা ও ইসলামি দলের লোকেরা, মসজিদে মাহফিলে অমুসলমানদের জানমালের ক্ষতি করাকে কত বড় পাপ এসব কথাগুলো আলোচনা না করলে, পশুমার্কা মানুষের এসব দেশে অমুসলমানদের বসবাস করা কঠিন হয়ে যেত।
স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার : বিদেশী নাগরিক খুন হচ্ছে, অমুসলিমদের দোকানে-বাড়িতে হামলা হচ্ছে, মন্দির ভাঙচুর, ঠাকুরকে হত্যা করা হচ্ছে, দিন দিন এই পাপ যেন বেড়েই চলেছে। এর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার খুবই প্রয়োজন। ঘুষ দুর্নীতি পক্ষপাতিত্ব ও প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করার মানসিকতা থাকলে কোনো কিছুরই সুষ্ঠু বিচার ও নির্মূল সম্ভব নয়। কর্তাব্যক্তিরা যদি আগেই বলে দেন এ কাজ অমুক পক্ষ করেছে, তাহলে সঠিক তদন্ত কোনো দিন হবে না। কর্তাব্যক্তিকে অপমান আর অসন্তুষ্ট করে সঠিক রিপোর্ট কে দেবে? এসব কারণে কোনো অপকর্মই বন্ধ ও নির্মূল করা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন নিত্যনতুন অঘটন সংঘটিত হচ্ছে। এর জন্য দায়ী রাজনৈতিক ব্যক্তি আর ধর্মীয় নেতাদের অনৈক্য ও ব্যর্থতা। তাদের দেশপ্রেম বর্জিত দলীয় চিন্তা।
এত পুলিশ আর্মি, এত আনছার বিজিবি, এত প্রকারের গোয়েন্দা আর বাহিনী লালন করার পরও যদি মানুষ শান্তি না পায়, অমুসলিমরা নির্যাতিত ও খুন হয়, এর জন্য তারা ইসলাম ও মুসলমানকে দায়ী করবেই। কারণ এ দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ। এ কারণেই এ সব ঘটনার স্বচ্ছ নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত এবং বিচার হওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ ইসলামের শত্রুরা এসব অপকর্ম ইসলামি লোকেরা করছে বলে প্রচারণা চালিয়ে ইসলামের ক্ষতি করতে চায়। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ বুদ্ধিজীবীরাও তাদের প্রচারণার শিকার হয়ে এসব অপকর্ম ইসলামপন্থীরা করাচ্ছে মনে করে।
জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা খুন অথবা ফ্যাসাদ সৃষ্টির কারণ ছাড়া কোনো মানুষকে (সে যে ধর্মের লোকই হোক) অন্যায়ভাবে খুন করে, তারা যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যেকোনো মানুষের (সে যে ধর্মের লোকই হোক) জীবন রক্ষা করল, সে সারা মানবজাতিকেই রক্ষা করল (আল কুরআন)। অপর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের (সে যে ধর্মের লোকই হোক) কল্যাণ করার জন্য (আল কুরআন)।’
রাসূল সা: বলেন, ‘কোনো মুসলমান যদি কোনো অমুসলিমকে অতিরিক্ত কাজ দেয়, তাকে ঠিকভাবে তার পাওনা না দেয় এবং কষ্ট দেয়, আমি রাসূল ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে অমুসলিমের পক্ষে গিয়ে আল্লাহর দরবারে বিচার দেবো’ (আল হাদিস)। অপর হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে মানুষের (সে যে ধর্মের লোকই হোক) উপকার করে, সেই ভালো মানুষ (আল হাদিস)।’ মদিনা সনদে অমুসলিদের ইসলামি রাষ্ট্রে পূর্ণ ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার দেয়া হয়েছে। কুরআন ও হাদিসে মানুষ খুন ও অমুসলিমদের কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে এ রকম বিধান থাকায়, সব ইমাম, আলেম, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী হওয়ার পরও যারা ইসলাম, আলেম ওলামা, ইসলামি দল ও মুসলমানকে জঙ্গিবাদী ও সাম্প্রদায়িক বানাতে চায়, তারা আসলেই ইসলাম, মুসলমান ও মুসলিম দেশের শত্রু।
লেখক : খতিব

You Might Also Like