ধর্মকে সমাজ থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করা যায় না

‘নাস্তিকতা আল্লাহ আছে এই সত্য অস্বীকার করে, যে অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মানুষই শুধু আছে সেই সত্য জাহির করা হয়। কিন্তু কমিউনিজমের জন্য এ ধরনের ঘোরাপথের দরকার পড়ে না।’ (কার্ল মার্কস)

‘যে নৈরাজ্যবাদী খেয়ে না খেয়ে আল্লাহখোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ওয়াজ করে বেড়ায় সে আসলে মোল্লা-মৌলবি-পুরোহিত আর বুর্জোয়াদের স্বার্থই রক্ষা করে।’ (ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন)

সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে ধর্মকে কাঁচি দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন করা যায় না

রাজনীতি সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ধর্ম থেকেও নয়। ধর্ম নিয়ে তর্কবিতর্কে না গিয়ে অতি প্রাথমিক অনেক বিষয় আমরা কাণ্ডজ্ঞানেই বুঝতে পারি। যেমন, আমরা চাই বা না চাই ধর্মকে সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে যান্ত্রিকভাবে আলাদা করতে পারি না। মানুষ কী নীতি মেনে চলবে, নৈতিকতার কোন মানদণ্ড দিয়ে তার নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করবে তা নির্ধারণ বা নির্ণয় করবার ক্ষেত্রে একসময় শুধু ধর্মের নির্দেশই কাজ করেছে। এখনও বিপুলসংখ্যক ধর্মভীরু মানুষের কাছে ধর্মের নির্দেশই শিরোধার্য। ধর্ম শুধু জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা কিম্বা নৈতিক বিধিবিধান নির্ণয় করেছে তা নয়, তাকে বলবৎ করবার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে। আধুনিক সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ধর্মের ভূমিকাও বদলে গিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সেটা কিভাবে ঘটেছে সেটা বোঝা এবং সেই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম ও রাষ্ট্রের প্রতি নিপীড়িতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেটা নির্ধারণ করাই বাস্তবোচিত কাজ। বিমূর্তভাবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার অর্থ নির্বিচারে আধুনিক কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ানো।

কিন্তু তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে ধর্মের বিধান বিলোপ করতে পারেনি। বাংলাদেশের সংবিধান ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার’ লাভ করবার কথা বললেও পারিবারিক জীবনে নাগরিকদের যার যার ধর্মের নির্দেশ পালন করতে বলেছে (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদ)। ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও সমাজের অবস্থাভেদে ধর্মই আইনদাতার ভূমিকা পালন করেছে এবং শাসনের হাতিয়ার হয়েছে। ধার্মিক না হতে পারি; কিন্তু সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে ধর্মের সামাজিক অভ্যাস, চর্চা বা শিক্ষা আমাদের নীতিনৈতিকতার জগৎ গঠনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। যেহেতু ধর্মের সাংস্কৃতিক ভূমিকা আছে, অতএব সরাসরি না হলেও ধর্মের প্রভাব, প্রণোদনা বা প্রেরণা ব্যক্তির জীবনে কাজ করে। ঘোর নাস্তিকও সমাজের বাইরে বাস করেন না। নিজেদের সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করলেও ধর্ম সমাজে ও সংস্কৃতিতে যে প্রভাব বা আধিপত্য বিস্তার করে থাকে, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থেকে কেউই মুক্ত থাকে না। ইত্যাদি নানান কারণে ধর্মের সঙ্গে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আমরা যত সরল মনে করি, মোটেও তা অত সরল নয়।

রাজনীতি সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ধর্ম থেকেও নয়। ধর্ম নিয়ে তর্কবিতর্কে না গিয়ে অতি প্রাথমিক অনেক বিষয় আমরা কাণ্ডজ্ঞানেই বুঝতে পারি। যেমন, আমরা চাই বা না চাই ধর্মকে সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে যান্ত্রিকভাবে আলাদা করতে পারি না। মানুষ কী নীতি মেনে চলবে, নৈতিকতার কোন মানদণ্ড দিয়ে তার নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করবে তা নির্ধারণ বা নির্ণয় করবার ক্ষেত্রে একসময় শুধু ধর্মের নির্দেশই কাজ করেছে। এখনও বিপুলসংখ্যক ধর্মভীরু মানুষের কাছে ধর্মের নির্দেশই শিরোধার্য। ধর্ম শুধু জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা কিম্বা নৈতিক বিধিবিধান নির্ণয় করেছে তা নয়, তাকে বলবৎ করবার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে। আধুনিক সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ধর্মের ভূমিকাও বদলে গিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সেটা কিভাবে ঘটেছে সেটা বোঝা এবং সেই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম ও রাষ্ট্রের প্রতি নিপীড়িতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে সেটা নির্ধারণ করাই বাস্তবোচিত কাজ। বিমূর্তভাবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার অর্থ নির্বিচারে কোনো পর্যালোচনা ছাড়া পাশ্চাত্যের ইতিহাস এবং তার পরিণতি অনুকরণ করা। এর দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। প্রথমত পাশ্চাত্য চিন্তাচেতনা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার গোড়ায় রয়েছে গ্রিক-খ্রিষ্টীয় চিন্তা। এই পরিমণ্ডলেই পাশ্চাত্যে পুঁজিতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে যাকে আমরা ‘আধুনিকতা’ বলে থাকি। তাহলে প্রথমেই এই গ্রিক-খ্রিষ্টীয় ‘আধুনিকতা’র একটা পর্যালোচনা দরকার। পাশ্চাত্যে খ্রিষ্টীয় ধর্মের যে রূপ ও ইতিহাস আমরা দেখি, ধরে নেওয়া হয় সেটাই আর সকল ধর্মের রূপ বা চরিত্র। অন্যান্য জনগোষ্ঠির ইতিহাসও বুঝি পাশ্চাত্য ইতিহাস থেকে আলাদা কিছু নয়। অথচ দরকার সুনির্দিষ্টভাবে কেন পাশ্চাত্যে গির্জা ও রাষ্ট্রের ফারাক- অর্থাৎ ধর্ম ও আধুনিক রাষ্ট্রের পার্থক্য ঘটল সেই ইতিহাস পর্যালোচনা করা। এর সঙ্গে ‘পাবলিক’ ও ‘প্রাইভেট’-এর বিভাজন ঘটে যাওয়ার দিকটিও জড়িত। এই সকল দিক বিচার না করে তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ অর্থাৎ গ্রিক-খ্রিষ্টীয় ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং তার পরিণতি হিসাবে আধুনিক রাষ্ট্রকে নির্বিচারে মেনে চলি, তখন তা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ধর্ম ও রাষ্ট্রের প্রতি নিপীড়িতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে সেটা আমরা আর বুঝতে পারি না। আধুনিকতাকে মেনে চলি, আধুনিক রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়াই, গণমানুষের ধর্ম ও নানাবিধ সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর প্রতি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠি।

ধর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থের ব্যাখ্যা এবং ধর্মতত্ত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিটি ধর্মের মধ্যেই তর্কবিতর্ক আছে। সেই তর্কবিতর্ক ধর্মের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক। কোনো ধর্মেরই একাট্টা এক রকমের সর্বজনমান্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। সেটা অসম্ভবও বটে। ইসলামও একাট্টা এক রকম নয়। শিয়া ও সুন্নির পার্থক্য আছে, শরিয়তপন্থী ও মারেফাতপন্থীদের ঝগড়া নতুন কিছু নয়। এ ধরনের ঝগড়া অহিংস ছিল না, আবার ধর্ম তার অভ্যন্তরীণ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের ঐতিহাসিক তাগিদে নিজের সংস্কারও নিজে করেছে। অর্থাৎ ধর্ম কোনো নিশ্চল অনৈতিহাসিক ব্যাপার নয়। তারও বিবর্তন ঘটেছে।

কিন্তু ধর্মমাত্রই প্রতিক্রিয়াশীল এবং তার সঙ্গে মোকাবিলার পথ একাট্টা ধর্মের বিরোধিতা- এই বিকৃত ধারণা আমরা বাংলাদেশে যেভাবে দেখি, পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় কি না সন্দেহ। আর কোনো দেশে কমিউনিস্ট নাম নিয়ে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য কমিউনিস্টরা হরতাল করেছেন তার নজির নাই।

একাট্টা ইসলামবিরোধিতা জর্জ বুশের রাজনীতি

কিন্তু আমরা আরো একটি কারণে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছি না। একাট্টা সব ধরনের ইসলামি রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি বিশেষভাবে জর্জ বুশের নীতিকেই মনে করিয়ে দেয়। জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন এস্পিসিতোর কথাই ধরি। তার কথা হচ্ছে, ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার বা ‘রাজনৈতিক ইসলাম’কে জিমি কার্টারের সময় থেকে সব মার্কিন প্রেসিডেন্টকেই মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে ৯/১১’র ঘটনার পরে জর্জ বুশ যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার সঙ্গে তুলনা চলে না। সে সময় তিনি ও তার নীতিনির্ধারকরা রাজনৈতিক ইসলামের মধ্যেও যে চরমপন্থী এবং মধ্যপন্থীর ভেদ আছেন সেটা বুঝতে চাইতেন না, বোঝার ক্ষমতাও ছিল না। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ইসলামের সব কিসিমের রাজনৈতিক প্রকাশ ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে। তারা রাজনৈতিক ইসলামকে বিশ্বব্যাপী হুমকি গণ্য করেছিল, ঠিক যেমন সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির আমলে কমিউনিজমকেও গণ্য করা হয়েছিল দুনিয়ার হুমকি হিসেবে। কিন্তু কমিউনিজম মোকাবিলার সময়েও শুরুর অনভিজ্ঞতা, সবকিছুকে এক থোকে ভাববার চর্চা ও আতঙ্ক থেকে আস্তে আস্তে নীতিনির্ধারকরা সরে আসে। তবে ওয়ার অন টেররের শুরুতে প্রেসিডেন্ট বুশ রাষ্ট্র থেকে ধর্ম সরানোর কথা বলতেন।

প্যালেস্টাইনের নির্বাচনে হামাসের জয়, ইরাকে শিয়াদের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভাব এবং মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মুসলিম ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। চরমপন্থী রাজনৈতিক ইসলাম আর মধ্যপন্থী অহিংস ইসলামের প্রতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতি এখন আর এক নয় (দেখুন, It’s The Policy Stupid : Political Islam and US Foreign Policy by John L. Esposito . Georgetown University) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার কথা। বলা বাহুল্য, ৯/১১’র পরপরই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতকে যে চোখে দেখা হতো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই চোখে এখনও দেখে কি না নিশ্চিত করে বলা মুশকিল; কিন্তু না দেখাই স্বাভাবিক। বিশেষত শেখ হাসিনা যেমন বলেন, বাংলাদেশের সকল প্রকার ‘জঙ্গি’ ইসলামের হোতা বিএনপি-জামায়াত, অতএব তাদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখাই শ্রেয় কিংবা শেখ হাসিনার সঙ্গে মৈত্রীই বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করার একমাত্র উপায়- এ ধরনের চিন্তা ওয়াশিংটনের এখন থাকার কথা নয়। বাস্তব পরিস্থিতির বদল ঘটলে সমাজে শ্রেণীর সঙ্গে শ্রেণীর সম্পর্ক এবং শক্তির ভারসাম্যেও রূপান্তর ঘটে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়।

এ কথাগুলো তোলার কারণ হচ্ছে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যে মূলত জর্জ বুশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নীতিরই প্রতিধ্বনি, সেই কথাটা মনে করিয়ে দেয়া।

তাহলে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা বা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা কমিউনিস্টদের দাবি হতে পারে না। তারা বলছেন, সকল ‘সাম্প্রদায়িক’ দল নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল আর সাম্প্রদায়িকতা যে এক নয়, সেটা আমি নিজের জবানে না বলে অগ্রজ বদরুদ্দীন উমরের শরণাপন্ন হব।

বদরুদ্দীন উমর বলছেন, ‘ধর্মের যেকোনো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবহারকেই সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেয়া এক মহাতাত্ত্বিক ও বাস্তব ভ্রান্তি। সাম্প্রদায়িকতা হলো ধর্মের এই ব্যবহারের একটি রূপমাত্র, যেখানে এক ধর্মীয় সম্প্রদায় অন্য একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করতে নিযুক্ত থাকে, অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত লোকের ক্ষতি করা তার লক্ষ্য হয়।’ এরপর তিনি ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সেখানে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রচুর মানুষ থাকা সত্ত্বেও ভারতে সাম্প্রদায়িকতা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল থাকলেও বাংলাদেশ ভারত নয়, সাম্প্রদায়িকতা এখানে কিছু থাকলেও সেটা জাতীয় কোনো সমস্যা নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক দল বা তার ভাষায় ‘মৌলবাদ’ রয়েছে, কিন্তু উমর মৌলবাদমাত্রই সাম্প্রদায়িক মনে করেন না। কারণ তাদের টার্গেট হিন্দু বা অন্যান্য সম্প্রদায় নয়। তিনি মনে করেন, ‘এদের টার্গেট হলো কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তি। সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা নয়, এই হিসেবে এর মূল্যায়ন করে এদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য বাস্তব ক্ষেত্রে ও প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়েই এদের প্রতিরোধ করতে হবে।’ (দেখুন, ‘সুবিধাবাদীদের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী জাতীয় সম্মেলন’, বদরুদ্দীন উমর, যুগান্তর ২৩ ডিসেম্বর ২০১২)।

বদরুদ্দীন উমরের এই লেখাটির গুরুত্ব বিশেষত এখন অনস্বীকার্য। তবে তার সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি দিক যোগ করতে চাই। ইসলামপন্থী দলগুলোর ঘোষিত নীতি যা-ই হোক, ইসলামি আন্দোলনে সক্রিয় জনগণ- বিশেষত তরুণদের বিশাল একটি অংশ রয়েছে, যারা স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে ইসলামকে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল, সে ব্যাপারে কিছুটা হলেও ওয়াকিবহাল। কারণ এখন গণতন্ত্রী(?), প্রগতিশীল(?) ও কমিউনিস্টদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, সে অভিজ্ঞতা থেকেও তাদের কিছু শিক্ষা হচ্ছে।

বদ্ধমূল বেকার অনুমানগুলো নাকচ করা জরুরি

বাংলাদেশের জনগণ সাম্রাজ্যবাদকে তত্ত্বগতভাবে বুঝতে না পারে; কিন্তু নিজের জীবন দিয়ে বোঝে। যে শ্রমিক পোশাক তৈরির কারখানায় পরিশ্রম করে তিলে তিলে নিজের শরীর ক্ষয় করছে কিংবা পুড়ে মরছে। পুঁজিবাদ কী জিনিস- সেটা সে তার শরীর দিয়েই আন্দাজ করতে পারে। এ ব্যাপারে তাদের নিজেরও বয়ান আছে। সমাজে শ্রেণী যদি থাকে, তাহলে সংগ্রামও থাকবে। সেই সংগ্রামের বয়ান যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ থেকে ধার নিতে হবে কিংবা তার সাথে মিল থাকতে হবে, তার কোনো কথা নাই। নিপীড়িতের এই ভাষা বোঝা দরকার। একইভাবে এই অনুমানও ভুল নয় ইসলামপন্থী দলগুলোরও সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নিজস্ব বয়ান আছে। এই বয়ান বোঝার দরকার আছে। অর্থাৎ নিজের গর্ত থেকে কমিউনিস্টদের বেরিয়ে এসে অন্যদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। সে ক্ষেত্রে নিজ কমিউনিস্ট জগতের বাইরের কিন্তু নিজ সমাজের অন্যদের সাথে কথা বলবার ক্ষমতা অর্জন না করলে কমিউনিস্ট রাজনীতি আরো অবক্ষয়ের মধ্যে নিপতিত হবে। বাংলাদেশে এটাই নিয়তি কি না জানি না। সেই ক্ষেত্রে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই থেমে থাকবে না। আমাদের কাজ হবে তাকে বিকশিত করে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাবার অভিমুখ, নীতি ও কৌশল নিয়ে ভাবা। কমিউনিজম বদ্ধ, সঙ্কীর্ণ ও ইসলামি আতঙ্কের রোগী হয়ে বাংলাদেশে হাজির রয়েছে। এ ধরনের কমিউনিজমের কোনো ভবিষ্যৎ নাই এটা কাণ্ডজ্ঞানেই বোঝা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মজলুমের লড়াই যদি থেমে না থাকে তাহলে একালে তার চিন্তা, মতাদর্শিক ও কৌশলগত রূপ কী হবে, সেটা সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। চোর বাসন চুরি করে নিয়ে গেছে বলে শ্রমিক, কৃষক মেহনতি মানুষ মাটিতে ভাত খাবে না, সে সম্পর্কে কমিউনিস্ট কমরেডরা নিশ্চিত থাকতে পারেন।

পাশাপাশি আরো অগ্রসর পর্যালোচনার দরকার। অসাধারণ অবদান স্বীকার করার পরও কার্ল মার্কসকে চিন্তা জগতের শেষ কিম্বা একমাত্র বাদশাহ ভাববার কোনো দরকার নাই। মার্কস ‘মানুষ’কে তার সমাজ ও ইতিহাসের সারৎসার হিসাবে ভাবতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নিছকই অর্থনৈতিক এজেন্টে পর্যবসিত করেছিলেন, কিম্বা অন্যদের সেভাবে ভাবতে প্রণোদিত করেছেন। সেই ভুলের বোঝা মাথায় নিয়ে চলবার কোনো যুক্তি নাই। তিনি ইউরোপকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে মুক্ত ছিলেন দাবি করা কঠিন। ইতিহাসকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের পদ্ধতি দিয়ে তৈয়ার কিম্বা বিশ্লেষণের ওপর তার অকুণ্ঠ বিশ্বাস কম আপদ তৈরি করেনি। বিজ্ঞান চর্চা ও ইতিহাস চর্চার ফারাক নিয়ে অতএব বিস্তর কাজ করবার আছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বদ্ধমূল ধারণাকে নাকচ করতে হবে। যেমন, ধর্মকে চিন্তার পশ্চাৎপদতা, অর্ধচেতন বা অসম্পূর্ণ অবস্থা মনে করা এবং এটা যুক্তিহীনতা, কুসংস্কার বা সোজা কথায় চিন্তাহীনতা বা দেশকালপাত্র নির্বিশেষে প্রতিক্রিয়াশীল গণ্য করা এই মুখস্থবিদ্যা বাদ দিতে হবে। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক ধর্মসহ নীতিনৈতিকতার ওপর গড়ে ওঠা প্রতিটি সম্পর্ককে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে খারিজ না করে দিয়ে এবং তাকে ‘প্রাইভেট’ ব্যাপারে পরিণত না করে টিকে থাকতে পারে না। কারণ বাজার ব্যবস্থা ও পুঁজির প্রধান চরিত্রই হচ্ছে টাকার কাছে পুরান সকল নীতিনৈতিকতার অবসান ঘটানো। এ কারণে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একাট্টা ধর্মবিরোধীদের- বিশেষত বয়ান নির্বিশেষে ‘ইসলাম’ নামের যেকোনো রাজনৈতিক ধারার যারা বিরোধী, তারা মূলত পুঁজির অতি নিম্ন শ্রেণীর দাস ছাড়া অধিক কিছু নয়। এরা ধর্ম যেমন বোঝে না, পুঁজির স্বভাব সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা নাই। পুঁজির গোলামগণ কমিউনিজমের পতাকা উত্তোলন করে থাকলেও কোনো অবস্থাতেই তারা বাংলাদেশের জনগণের মিত্র হতে পারে না।

বাংলাদেশে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময় থেকে হাল পর্যন্ত মোটা দাগে বাম, সেক্যুলার এবং ধর্মীয় ধারার ভেতর ধর্মকে বিচার করবার মূল জায়গাটা ছিল আস্তিকতা/নাস্তিকতা এবং প্রগতিশীলতা/প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বন্দ্ব। আজ এটা স্পষ্ট বোঝার সময় হয়েছে যে, এই দ্বন্দ্ব বর্তমানের ভারী রাজনৈতিক বিতর্কগুলো মীমাংসায় কোনো কাজেই আসবে না; বরং এযাবৎকালের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় তা প্রচণ্ডভাবে প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাচেতনা ও গণবিরোধী রাজনীতির জন্ম দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে।

কিন্তু এর পরও এই প্রশ্নে মজলুম জনগণকে দৃঢ় থাকতে হবে যে, বাংলাদেশে ধর্ম ও ধর্মীয় রাজনীতি বিচার করবার প্রশ্নটিকে পদ্ধতিগতভাবে শ্রেণী রাজনীতির দিক থেকে কিংবা সাম্রাজ্যবাদ/পুঁজিবাদ বিরোধিতার জায়গা থেকেই তুলতে হবে। এর বাইরেও যদি কোনো মুক্তিকামী রাজনৈতিক চিন্তা, ভাব বা বিশ্বাস থেকে থাকে তাহলে তাকেও আমলে আনা দরকার। যেহেতু বাম বা তথাকথিত প্রগতিশীলদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা আর ফলে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসলামপন্থী দলগুলোর কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরনো স্নায়ুযুদ্ধের নীতি অনুযায়ী কমিউনিজম ও কমিউনিস্টদের বিরোধিতা করা। একদিকে প্রগতিশীলতা আর অন্য দিকে ইসলামের নামে এ ধরনের আত্মঘাতী রাজনীতির বিরোধিতাই বাংলাদেশে জাতীয় রাজনীতির বড় স্রোত হয়ে উঠেছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কমিউনিস্টদের ভুল রাজনীতি ছাড়াও আরো নানা কারণে গত কয়েক দশকে কমিউনিজম বা কমিউনিস্টদের প্রতি এ দেশের জনগণের সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। তার একটি কারণ কমিউনিজমের যে বয়ান আমরা হাজির করি, তার উৎপত্তি পাশ্চাত্যে। এটা এখন স্পষ্ট হওয়া দরকার, পাশ্চাত্য জ্ঞান-শৃঙ্খলার নির্বিচার অধীনতা মেনে এখনকার রাজনৈতিক কর্তব্যসাধন সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই সেক্ষেত্রে স্লোগানসর্বস্ব কেরিকেচার ছাড়া আর কিছুই হবে না, গণমানুষের রাজনীতি হওয়া তো দূরের কথা। আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শিখতে হবে এবং পরিবর্তনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আকাক্সক্ষা ধারণ করে গণশক্তি নতুনভাবে গঠনের কাজ করবার জন্য চিন্তা ও তৎপরতায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে ইসলামপ্রধান দেশগুলোর বিরুদ্ধে নির্বিচার যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ দেখার পরও ইসলামপন্থী অধিকাংশ দল মার্কিনিদের পুরনো বুলি আউড়িয়ে চলেছে। জনগণকে বোঝাতে হবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে যারাই ধর্ম বা আস্তিকতা/নাস্তিকতার ধুয়া তুলে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে, জনগণকে বিভক্ত করেÑ তারা যে পক্ষেরই হোক, জনগণের দুশমন। স্নায়ুযুদ্ধকালে বামদের রাজনীতি ছিল নাস্তিকতার চর্চা। বিপরীতে ইসলামি রাজনীতির বা বাম বিরোধিতার মূল জায়গা ছিল নাস্তিকতা বিরোধিতা; মূলত তারা এ জায়গায় দাঁড়িয়েই কমিউনিস্ট ও কমিউনিজমের বিরোধিতা করেছে। এই দুই ধারা একই সমস্যার দুই দিক মাত্র।

বাংলাদেশের এই বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রমাণ করে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে একটি নির্বিচার অবস্থান আমাদের দেশে জারি রয়েছে। অর্থাৎ পাশ্চাত্যে গড়ে ওঠা ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ কায়েমই আমাদের আদর্শ- এই বিচারশূন্যতাকে প্রশ্ন করা দরকার এবং এ বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান আরো গভীর করা আমাদের কর্তব্য। সেই কর্তব্যকে রাজনৈতিক কর্তব্য হিসেবেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

সোজা কথায় ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার ছাড়া এখন কোনো সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদবিরোধী রাজনীতি সম্ভব নয়। সেটা বামপন্থী বা ইসলামি রাজনীতি উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদি তারা প্রত্যেকেই আদৌ জনগণের পক্ষে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায়। বামপন্থার নামে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার দিন যেমন শেষ হয়ে গেছে, একইভাবে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই বাদ দিয়ে ইসলামের নামে রাজতন্ত্র কায়েম কিংবা ধনীকে আরো ধনী ও গরিবকে আরো গরিব বানাবার রাজনীতির দিনও শেষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশে গণশক্তি গঠনের প্রশ্ন তাই ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্র্রের মৌলিক বিচার সম্পন্ন না করে অগ্রসর হতে পারবে না। এক কথায় বললে, আধুনিকতার ভিত্তিকে প্রশ্নের সম্মুখীন ও চ্যালেঞ্জ না করতে পারলে আমাদের এগিয়ে যাবার বিকল্প কোনো পথ নাই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র ও ধর্ম বিভাজনের অনুমানগুলো বা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করবার যে ক্লাসিক্যাল সেক্যুলার প্রস্তাবনা, তার প্রেক্ষিত ইউরোপ। ইউরোপের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনৈতিহাসিকভাবে এই বিভাজনকে শাশ্বত ও অনিবার্য ধরে নেয়া ঐতিহাসিক অজ্ঞতা অবশ্যই। তা ছাড়া এই অনুমানের বিস্তর রাজনৈতিক ও দার্শনিক সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশে আমাদের অবশ্যই সেসব সমস্যা নতুন করে বিচার করে দেখতে হবে।

বলা বাহুল্য, গণতন্ত্র রাষ্ট্রের একটি ধরন, রাষ্ট্রের এই ধরনের সঙ্গে ধর্মের এই সম্পর্ক অনুধাবনের অক্ষমতা একই সঙ্গে গণতন্ত্র সম্পর্কে অপরিচ্ছন্ন ধারণারও প্রমাণ। অর্থাৎ বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার এই ধারা প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মবিরোধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

You Might Also Like