জঙ্গিবাদের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে

নূরে আলম সিদ্দিকী

বহু দিন থেকে আমার নিবন্ধ এবং টকশোতে আমি মাথা কূটে বলে আসছিলাম সন্ত্রাসী, জঙ্গি— এরা বিবেক-বিবর্জিত তো বটেই, এদের কোনো দল নেই, কোনো আদর্শ নেই। হিংস্রতা ও পাশবিকতা ছাড়া এদের ধর্ম বিশেষ করে ইসলামের আদর্শের অনুশীলনের প্রতি বিন্দুমাত্র আনুগত্য নেই। আমরা যারা ধর্ম মানি, দীনের অনুসরণে জীবনযাপনে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাই— আমরা সবাই সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, গুপ্তহত্যার কোনো স্থান বা অনুমতি এমনকি প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ ইসলাম একেবারেই অনুমোদন করে না, কস্মিনকালেও করেনি। তাদের কর্মকাণ্ড থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, এরা খাতেমুন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারী তো নয়ই, নবী এবং তার সাহাবাদের জীবনাদর্শ বিন্দুমাত্র অনুসরণ তো করেইনি, বরং পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বর্ণিত জীবনব্যবস্থার উল্টো পথে হাঁটছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শিক্ষা থেকে কোনো দীক্ষা গ্রহণ তো দূরে থাক, রসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবাদের জীবনাদর্শ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

ঘোষিত জিহাদ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই মানুষ হত্যা ইসলামে হারাম। এমনকি জিহাদের ময়দানেও কারও হাত থেকে অস্ত্র পড়ে গেলে অথবা বিচূর্ণ হয়ে গেলে তার ওপর আঘাত হানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জিহাদের ময়দানে কেউ আত্মসমর্পণ করলে তার জীবনের নিরাপত্তা দেওয়াও মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক। জিহাদের ময়দানে মুসলমান যোদ্ধারা প্রতিপক্ষের প্রতি মহান ঔদার্যের এমন ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আজকে পৃথিবীজোড়া আল-কায়েদা, তালেবান, আইএস— এসব তকমাজুড়ে যারা সন্ত্রাস ও জঙ্গি তত্পরতায় লিপ্ত হয়েছেন, তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে আজকে যারা জঙ্গি ও সন্ত্রাসের বিন্দুমাত্র গন্ধ পেলে হৈ-হৈ-রৈ-রৈ করে ওঠেন, সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরাশক্তির উচ্চস্তরের নেতৃবৃন্দ পর্যন্ত শুধু এর প্রতিবাদই নয়, প্রতিহত করার দৃপ্ত শপথ ঘোষণা করেন, এসব সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উদ্ভব তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায়। আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশ ধর্মের প্রতি আনুগত্যে সর্বোচ্চ আবেগপ্রবণ দেশ হলেও অন্য ধর্মের প্রতি এদেশের মানুষের কোনোরূপ হিংসাত্মক মানসিকতা নেই। সব ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা নিজ নিজ আঙ্গিকে প্রতিপালনের বিষয়েও তাদের কোনো বৈরী মনোভাব নেই।

প্রতিবেশী ভারতের প্রতি কোনোরূপ কটাক্ষ না করেও বলা যায়, বাবরি মসজিদ ভাঙা, গুজরাটের বীভৎস দাঙ্গাসহ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে শতবারের বেশি মানুষ দাঙ্গাকবলিত হয়েছে। ভারতের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ, সংবাদমাধ্যম— এসব অমানবিক দাঙ্গার বিরুদ্ধে যে অকুতোভয় মত প্রকাশ করেছেন তা অতুলনীয়। বাংলাদেশে তো নয়ই, পাকিস্তান আমলেও তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৬৪ সালে ভারতবর্ষের একটি দাঙ্গাকে ইস্যু করে বিহারিদের উসকে দিয়ে এখানে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে গিয়ে এদেশের মানুষ, বিশেষ করে তখনকার দিনের যৌবন উদ্দীপ্ত অকুতোভয় প্রাণ কিছু মানুষ জীবন বিসর্জনও দিয়েছেন। দৈনিক ইত্তেফাক সেই সময় আট কলামজুড়ে শিরোনাম করেছিল— ‘পূর্ববাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’। তখনকার ছাত্রলীগ দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল— সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কোনো ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালালে ছাত্রলীগ তার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সচিবকেও সেদিন জীবন দিতে হয়েছিল। আমার মতো অনেককেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। পাকিস্তানিদের সেই সাম্প্রদায়িক জিঘাংসার স্বপ্ন তো চরিতার্থ হয়ইনি, বরং বাঙালির জাতীয় চেতনাকে তা আরও উজ্জীবিত, উদ্বেলিত ও শাণিত করেছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে স্বাধিকারের দাবিতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। ইদানীং বিক্ষিপ্তভাবে হলেও বিপথগামী কিছু দুষ্কৃতকারী বিচ্ছিন্ন কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত এবং জাতির জন্য অশনি সংকেত। পুলিশ প্রশাসন ও সামাজিক শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিযুক্ত অন্যান্য প্রশাসনিক শক্তিগুলো এর অন্তর্নিহিত কারণ ও যোগসূত্র খুঁজে বের করতে পারছেন না। এটি আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

হয়তো সবারই মনে আছে, কোনো সন্ত্রাসী গ্রেফতার হলে তাকে সামনে রেখে ফালতু কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ছোট ও মাঝারি ধরনের রাশি রাশি অস্ত্র প্রদর্শন করা হতো। গণমাধ্যমগুলোও নির্দ্বিধায় তা প্রচার করত। আমি বহুবার হুঁশিয়ার করেছি যে, তিলকে তাল বানিয়ে এ ধরনের প্রদর্শনী আত্মঘাতী হবে। এর সুযোগে অনেকেই আমাদের জঙ্গিকবলিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালাবে। অস্ত্রসহ জঙ্গি বা সন্ত্রাসী, সে যে দলেরই হোক না কেন, তাকে ত্বরিত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি নাও হতে পারত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অসহায়ের মতো এই সাফাইও গাইতে হতো না, বাংলাদেশে তালেবান, আল-কায়েদা বা আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণার সঙ্গে একমত বলে আমি নিশ্চিত। কিন্তু ‘সোনার চান পিতলা ঘুঘু’রা এ কথাটি পূর্বে মনে রাখলে, রাশি রাশি অস্ত্র প্রদর্শনের এই বোকামিটা করতেন না। অন্যদিকে ব্লগার সেজে যারা উসকানিমূলক লেখা লিখছেন তারা দুটি ভাগে বিভক্ত বলে আমার মনে হয়। একটি বিশেষ শ্রেণি এই উসকানিমূলক লেখার মাধ্যমে বড় রকম আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। অন্য অংশটি উন্নত কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিলাষ থেকে এই অপকর্মগুলো করছেন। এদেরও শাস্তি প্রদানের আইনি ব্যবস্থা আছে। কিন্তু উন্নাসিকতার কারণে তাদের বিরুদ্ধেও উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হলে ওদের যেমন দুঃসাহস কমত, সরকারের বিরুদ্ধে আবেগপ্রবণ ধর্মপ্রাণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতো, শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ক্রমান্বয়ে নিঃশেষিত হতো। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। এটি রাজনৈতিক সমস্যা, রাজনৈতিকভাবেই এর সুরাহা করতে হবে। তা না হলে পুলিশ প্রশাসন এর ক্লু খুঁজে পাবে না, শিকড়ের সন্ধান পাবে না। বরং মুখরক্ষার জন্য দুয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও মূল শক্তিটা থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরেই। সাপের লেজ হয়তো কাটা যাবে কিন্তু বিষদাঁত ভাঙা যাবে না। সাপের গর্তের সন্ধানও পাওয়া যাবে না।

আমি ক্ষমতাসীন জোটকে, বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে সবিশেষ অনুরোধ করব, এটাকে জাতীয় সমস্যা ভেবে অনতিবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে একটি বৈঠক ডাকুন। এই বৈঠকে খোলামেলা আলোচনার মধ্য দিয়ে অনেক সত্য যেমন বেরিয়ে আসবে, সমাধানের পথও তৈরি হবে। অন্যদিকে সরকারের স্কন্ধে এই সমস্যা সমাধানের গুরুভার এককভাবে চেপে না থেকে সর্বজনীনভাবে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের কাঁধে এ দায়ভার বর্তাবে। যারা সুযোগ পেলেই বিবৃতি দেন, মানববন্ধন করে হিরো বনতে চান, প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের একটি উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের কাঁধেও দায়িত্বের জোয়াল চাপালে সমস্যার অনেকখানি সমাধান বেরিয়ে আসা সম্ভব। বিক্ষিপ্ত সন্ত্রাস ও জঙ্গি তত্পরতায় যখন পাশ্চাত্য জগতের রথী-মহারথীরা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, বাংলাদেশে তাদের গোয়েন্দা পাঠানোরও প্রস্তাব করছেন, তখন আমাদের দেশের দুই নেত্রী একে অপরকে দোষারূপ করতেই ব্যস্ত। বিএনপির সঙ্গে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের যোগসাজশের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। একদিকে এই সন্ত্রাস জঙ্গি, অন্যদিকে মুরতাদদের বিরুদ্ধেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অক্ষমতাও সরকার কর্তৃক প্রদর্শিত হয়েছে। এই মুহূর্তে পরস্পরের বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধ বাঞ্ছনীয় নয়। এই প্রশ্নে বিবৃতি যুদ্ধ বন্ধ করে এর শেকড় খোঁজার জন্য একটি আলোচনার ব্যবস্থা করা সরকারি জোটের আশু কর্তব্য। শেখ হাসিনার উদ্যোগকে প্রতিপক্ষরা গ্রহণ না করলে তাদের দেশপ্রেমের দেউলিয়াত্বই জনগণের কাছে প্রতিভাত হবে। আর উদ্যোগটি না নিলে এর শেকড় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আজকের এই সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা ও জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে যদি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের যোগসাজশ বা ইন্ধন থাকে এবং সেটা উন্মোচিত হয়, তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী দেশপ্রেমী মানুষের কাছে তাদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।

ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা ও বিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একই টেবিলে বসলে জঙ্গিবাদের সমস্যাসহ তিস্তা ব্যারাজ, ফারাক্কার পানি বণ্টন, সমুদ্রসীমাসহ কিছু জাতীয় সমস্যা নিয়ে বৈঠক করার ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে ব্যক্তিগতভাবে কার কতটুকু লাভ সেই দুশ্চিন্তার পরিমণ্ডলে আবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্বার্থরক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে উদ্যোগ নিলে দেশ উপকৃত হবে; জাতি স্বস্তি পাবে। পরস্পরের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির একটা ইতিবাচক মোড় নেবে। আপামর জনগোষ্ঠীর মনে রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তা প্রশমিত তো হবেই। বরং দুষ্কৃতকারীদের পাশবিক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড এমনিতেই থেমে যাবে। এই ঔদার্যের ব্যত্যয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথর’-এর মতো মরীচিকার পেছনে অনর্থক ঘুরতে ঘুরতে শক্তিক্ষয় করবেন।  সমস্যার সমাধান আনতে পারবেন না।

উপসংহারে বলি, প্লেটোর একটা কথা আছে— ‘দেশ জনগণের কিন্তু সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব রাজনীতিকদের, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের, যারা পারেন তারা স্টেটসম্যান, যারা পারেন না তারা ব্যর্থতার বেলাভূমিতে গুমরে মরেন’।

লেখক : রাজনীতিক।

You Might Also Like