মূল্য দিচ্ছে তুরস্ক ব্রাজিল ইরান

হাশমেত বাবাওগ্লু :

আমেরিকান সাংবাদিক, দি ইন্টারসেপ্ট-এর গ্লিন গ্রিনওয়ার্ল্ডÑ যিনি দি গার্ডিয়ানে অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাইল নিয়ে কয়েকটি রিপোর্ট করে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি অর্জন করেছেন, তিনি সম্প্রতি ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের বিরুদ্ধে চলমান ইমপিচমেন্ট প্রয়াসের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ব্রাজিলে আমরা রুটি চুরির জন্য গরিবদের গ্রেফতার করছি; কিন্তু বিলিয়ন তথা হাজার হাজার ডলার চুরি করার জন্য ধনীদের ধরছি না। আমরা ওষুধ সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে চুরির জন্য গরিবদের গ্রেফতার করছি, কিন্তু কর ফাঁকি দেয়ার জন্য ধনীদের গ্রেফতার করছি না। সরকারি কৌঁসুলিদের অফিসের স্বায়ত্তশাসন জোরদার করেছে আমাদের সরকার। নতুন পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবী আমদানির জন্য এবং ফেডারেল পুলিশের স্বায়ত্তশাসনের জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করেছি।

এটা হচ্ছে একটা অভ্যুত্থান। কারণ ব্রাজিলের সংবিধান যখন একটি ইমপিচমেন্টের অনুমোদন দেয়Ñ তখন ওই ব্যক্তিকে উচ্চপর্যায়ের অপরাধ ও অপকর্ম করতে হবে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি মারাত্মক অপরাধ এবং হীন ও অসম্মানজনক কাজ করলেই তাকে ইমপিচ করা যায়। প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ উচ্চপর্যায়ের, তথা মারাত্মক কোনো অপরাধ করেননি। সুতরাং যা ঘটছে তা হচ্ছে, পপুলার ভোট বা জনগণের ম্যান্ডেটকে অসম্মান করে কিছু ব্যক্তি ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। যে কেউ প্রেসিডেন্ট হতে চাইলে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করার পরিবর্তে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

সাক্ষাৎকারটি দেখে গুলেনের আন্দোলনের বিশেষ ম্যান্ডেট আদালতের বিষয়টি স্মরণ করছি। তুর্কি সরকার ২০১৪ সালে ওই স্পেশাল ম্যান্ডেট কোর্টটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ২০০০ সালের শেষের দিকে গুলেনের অনুসারীরা তুরস্কের নেতৃস্থানীয় জননেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারকে পরাজিত করার একমাত্র পথ হচ্ছেÑ গুলেনের লোকদের ক্ষমতায় বসানো। পরবর্তী বছরগুলোতে তারা সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করে এবং মিথ্যা অভিযোগে আইকার বাগবানের মতো সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফসের সাবেক চেয়ারসহ সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের কারাগারে নিক্ষেপ করেছে।

বিপুল ক্ষমতার অধিকারী কৌঁসুলিরা তুরস্কের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করতে উদ্যোগী না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি; কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর অভ্যুত্থানের বিপদের মুখে বিবেকবান বহু মানুষ নতুন করে জেগে ওঠে। সুপার চার্জড কৌশলে এবং গুলেনপন্থীদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তুরস্কের নেতৃবৃন্দ বেঁচে যান। তবে ব্রাজিলে মারাত্মক এক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভাইস প্রেসিডেন্ট মিচেল টিমার প্রেসিডেন্ট রুসেফের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

দেখা যাচ্ছে রাস্তায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করে তার প্রশাসনে বিভেদ-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে অবৈধ ওয়ারটেপ প্রকাশ হওয়ার পর সাতজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। গত রোববার ব্রাজিলের পার্লামেন্টের নি¤œকক্ষ প্রেসিডেন্ট রুসেফের অভিশংসনের পথ পরিষ্কার করার জন্য তার ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আগামী মাসে সিনেট ইমপিচের আহ্বান জানালে ১৮০ দিনের জন্য রুসেফকে বরখাস্ত করা হবে।

আইনগত যুদ্ধের চাইতেও সম্ভবত বেশি মজার ব্যাপার হচ্ছে, অতি সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে জনগণ ক্রমবর্ধমান হারে আলোড়িত হচ্ছে। ব্রাজিল ২০০০ সালের দিকে লুলা ডি সিলভার নেতৃত্বে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তর অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কিছু সময় দেশটি বিপর্যয়ের মুখেও পড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের আসন্ন ইমপিচমেন্টের কারণে দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা অব্যাহত থাকবে। কারণ এ ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ এবং রাজপথ আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।

ব্রাজিলের অতি সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে, তুরস্কের বহু নাগরিক ২০১০ সালের মে মাসের ঘটনার দিকে ফিরে তাকাতে চান। যখন ইরান ও ব্রাজিল তুরস্কের কাছে কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাঠানোর জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। একটি রিসার্চে রি-অ্যাক্টরের একটি সমৃদ্ধ চুল্লির জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তেহরান ঘোষণাকে ডাবিং করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে এই ত্রিমুখী চুক্তিটি করা হয়।

পশ্চিমা সরকারগুলোর মতে, এ চুক্তিতে কমপক্ষে দু’টি সমস্যা আছে। প্রথমত, তুর্কি এবং ব্রাজিলের নেতা ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সাথে করমর্দন করেছেন। মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ইসরাইল এবং পশ্চিমা বিশ্ব আক্ষরিক অর্থেই ঘৃণা করত। তারা মনে করত ব্রাজিলের সিলভা এবং তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরদোগান তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

ছয় বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন আবিষ্কার করে, সত্যিকার অর্থে ইরান সরকারের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং সংলাপের মাধ্যমে পারমাণবিক হুমকি দূর করা সম্ভব। এর পরও ওবামা প্রশাসন সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তেহরানের সাথে করমর্দন করেনি।

২০১০ সালে তেহরান ঘোষণায় স্বাক্ষরের মাধ্যমে আহমাদিনেজাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পতন ঘটে। অপর দিকে গাজী পার্ককে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে তুরস্ক। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে ব্রাজিল সরকার জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়ে। এ সময় জনতা রাজপথে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।

সিলভা ও এরদোগান পরস্পর মতবিনিময় করেন এবং বলেন, ‘বিশ্ব পাঁচ রাষ্ট্রীয় শক্তির চেয়ে বড়’। তারা অভিমত ব্যক্ত করেন, মানবতা কোন দিকে যাচ্ছে সে ব্যাপারে সঠিক কথা বলার অধিকার আছে সব জাতির। অল্পসংখ্যক ক্ষমতাশালী বা কর্তৃত্বশীল সরকার পর্যায়ক্রমে বিশ্বশক্তিকে কয়েকটি দেশের হাতে কুক্ষিগত করতে চায়। নিঃসন্দেহে আগামীতেও যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত অব্যাহত থাকবে।

তুর্কি দৈনিক সাবাহ থেকে ভাষান্তর :

মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

You Might Also Like