নইলে আমরাও দায়ী থাকবো

নূরে আলম সিদ্দিকী

আমাদের দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ক্ষমতাসীন নেত্রী, কি বিরোধীদলের তরফ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত কোন প্রতিবাদ বা কার্যকর কোন আন্দোলনের কোন প্রয়াসই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সুশীল সমাজের হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকে বারবার দাবি উত্থাপিত হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে উভয় জোটেরই এক সুস্পষ্ট অনীহা জাতির কাছে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা পাচার হলেও সরকারি ও বিরোধী জোটের কোনো সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখতে পেলো না হতভাগ্য জাতি। শুধুমাত্র ফরাসউদ্দিন সাহেবকে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেই সরকার তার দায়ভার সারলেন। ফরাসউদ্দিন সাহেবের সততা ও নির্ভীকতা সর্বজনবিদিত। তাদের তদন্তে যেটিই বেরিয়ে আসুক সেটি বাস্তবে কতটুকু প্রতিস্থাপিত হবে এ নিয়েও জনমনে আশঙ্কা বিস্তর। কারণ এর আগে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে ২৬ হাজার কোটি টাকা লোপাট, ৩১ লাখ মানুষকে সর্বস্বান্ত করার জন্য যারা দায়ী, জনাব খালেদ ইব্রাহিমের তদন্ত রিপোর্টে তার সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ তো হয়ই নি বরং নির্লজ্জের মতো অর্থমন্ত্রী বলেছেন, শনাক্তকারী লুটেরারা এতোই প্রভাবশালী যে, খালেদ ইব্রাহিমের রিপোর্টটি প্রকাশ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এদেশে মৌলিক অধিকারের বিন্দুমাত্র অবস্থান থাকলে এই বেশরম, বেলাজ মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হতো।

সম্প্রতি পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে নাম আসায় বিক্ষোভের মুখে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমন্ডুর ডেভিড গুনলাগসন পদত্যাগ করেছেন। এর আগে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে দেশের প্রেসিডেন্টকে আহ্বান জানান তিনি। মোসাক ফনসেকার (পানামার একটি পরার্শক প্রতিষ্ঠান) ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী গুনলাগসন ও তাঁর স্ত্রী ২০০৭ সালে উইনট্রাস নামের একটি কোম্পানি কেনেন। ২০০৯ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাওয়া লভ্যাংশের কথা তিনি গোপন করেছিলেন। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন একটার পর একটা বিবৃতি দিয়ে তাঁর অবস্থান এবং তিনি যে নির্দোষ সেটি প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য যে, পিতৃসূত্রে পাওয়া অর্থ অফশোর কোম্পানির শেয়ারে গচ্ছিত থাকলেও উল্লিখিত ৩০ হাজার পাউন্ডের বিপরীতে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবগত ও কর প্রদান করেছেন। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তাঁর একটি বাড়ি আছে আর কিছু সঞ্চয় আছে যেটি থেকে তিনি সুদ পান। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ডাউনিং স্ট্রিটে উঠে নিজের বাড়িটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন। সেই আয়ের উপরও তিনি নিয়মিত কর দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও তিনি রেহাই পান কি-না সন্দেহ। কিন্তু এখানে আমার একটি পর্যবেক্ষণ নবনির্বাচিত বিরোধী দলের নেতা মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নন বলেই ডেভিড ক্যামেরন কোন ফাঁকফোকর দিয়ে এ যাত্রায় রেহাই পেয়েও যেতে পারেন। এটা ভবিতব্য বিষয় হওয়া সত্ত্বেও সত্যিকার গণতান্ত্রিক চর্চা আছে বলেই সুশীল সমাজ ও বিরোধী দলের এমনকি নিজ দলের সাংসদদের চাপে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবুও এ সমস্ত ঘটনায় মন্ত্রিপরিষদের পদত্যাগ এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচনেরও বহু নজির থাকা সত্ত্বেও এবার সেটির আশঙ্কা কম। কারণ জেরেমি করবিন-এর নেতৃত্বে লেবার পার্টি এই মুহূর্তে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন মোকাবিলা করার মতো সাংগঠনিক অবস্থায়  নেই। পৃথিবীর যেসব দেশে গণতন্ত্র আছে সেসব দেশে এই ঘটনায় তুলকালাম কাণ্ড হলেও মৌলিক অধিকার বিবর্জিত অথবা দলীয়ভাবে শাসিত সমাজতান্ত্রিক চায়নায় এ ব্যাপারে কোন টুঁ-শব্দটি নেই- তেমনি বাংলাদেশেও। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে বাংলাদেশেরও ২৫ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা গেছে। যার মধ্যে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা কাজী জাফরউল্লাহর নাম উল্লেখ থাকলেও এ ব্যাপারে এদেশে সরকার বা বিরোধী জোটের কোন পক্ষ থেকেই কোনরকম উচ্চবাচ্য নাই। কোন ব্যাখ্যা দেয়ারও কোন গরজ বা মাথাব্যথা আছে বলেও পরিলক্ষিত হলো না।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের প্রথিতযশা অধ্যাপক এবং এনশিয়েন্ট ল’র উপর বিশ্বের সবচেয়ে বড় অথরিটি প্রফেসর ড. মরিসন-এর সঙ্গে আমার একটা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে (আমার ছেলে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন মেরীর ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকে)। তিনি আমাকে কৌতুক করে বলতেন, আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা স্বচ্ছ কাঁচের ঘরে অবস্থান করেন। তাদের সবটুকুই ট্রান্সপারেন্ট। আর তোমাদের দেশের নেতারা এমন গহিন কালো অন্ধকার ঘরে অবস্থান করেন যে, তারা জনগণের কাছে প্রায় অদৃশ্যই। শুনে কষ্ট হলেও এর প্রতিবাদ করতে সাহস পাইনি, কারণ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রায়শই তিনি লন্ডন ইউনিভার্সিটি এফিলিয়েটেড কলেজগুলো পরিদর্শনের জন্য বাংলাদেশে আসেন এবং বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, এখানকার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উপর তার লেখা বৃহৎ গ্রন্থটি পাশ্চাত্য জগতে গভীর গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়।

বৃটিশরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বটে। একসময় কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষে তাদের বিস্তীর্ণ রাজ্যশাসন তারা এত দীর্ঘসময় টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল- তার অন্যতম শক্তি ছিল, আইনের শাসনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ। আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমার বুক ফেটে চৌচির হয়ে যায়। মৌলিক অধিকারের দৈন্যতা এত প্রকট যে, প্রশাসন,  গণমাধ্যম, রাজনীতি, সবই যেন অতি আজ্ঞাবহ। সবখানেই আজ নৈতিকতার চরম অবক্ষয়। দুর্নীতি যেন বাধা বিপত্তিহীন। দুর্নীতির রেশ টেনে ধরা বা দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেয়ার বিষয়টি আজ মানুষের কল্পনারও বাইরে চলে যাচ্ছে।

জাতীয় সংসদের একতরফা নির্বাচন; পৌরসভা, উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও যে বেহাল অবস্থা দেশবাসী অবলোকন করলো, তা হলো- নির্বাচন কমিশন শুধুই অথর্ব, অকার্যকর ও দলকানা নয়, একেবারেই লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বসে আছে। ঘটা করে গণমাধ্যমকে ডেকে যখন তারা গালভরা বুলি আওড়ান, নির্বাচন ভালো হয়েছে বলে কৃতার্থ বোধ করেন, তখন এই খুন-খারাবির কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হলে, কী নির্বিকার চিত্তে তারা জবাব দেন, এটি আমাদের দায়িত্বের আবর্তের মধ্যে পড়ে না!

পাকিস্তানের ২৩ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল শক্তি ও কেন্দ্রবিন্দু ছিল ছাত্রলীগ, স্থপতি ছিলেন আমাদের প্রাণের মুজিব ভাই- বঙ্গবন্ধু; যার রাজনৈতিক সংগঠন ছিল আওয়ামী লীগ। সেই আওয়ামী লীগের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নেত্রী যখন বলেন, দেশের মানুষ গণতন্ত্র চায় না, উন্নয়ন চায়- তখন আমাদের সোনাঝরা প্রদীপ্ত অতীত যেন ঘনঘোর অমানিশার মধ্যে হারিয়ে যায়। নিজের কাছে নিজেরই প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে, এই সুদীর্ঘ আন্দোলনের পথপরিক্রমণ কি শুধুই উন্মাদনা ছিল? কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের দৃপ্ত পদচারণা শুধু কি আবেগ দ্বারা পরিচালিত ছিল? তা না হলে অবক্ষয়ের অতলান্তে সারা দেশটা যখন নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে, তখন সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অঙ্গন, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী- সবাই এমন নীরব, নিস্তব্ধ কেন? মোসাহেব, চাটুকার, বন্দনাকারীদের এই অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ম্য কেন? কে এসব প্রশ্নের জবাব দেবে?

সমগ্র দেশবাসীকে আমার উদ্বেলিত হৃদয়ের নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে আমার সকরুণ বিনম্র ফরিয়াদ- আসুন, আমরা যার যার অবস্থান থেকে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে পরিত্রাণের জন্য কথা বলি, যে যার আঙ্গিক থেকে প্রতিবাদ করি এবং এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার কাছে ফরিয়াদ করি। সমাজের যে স্তরটির প্রতিবাদে মুখর হওয়ার কথা তাদের উজ্জীবিত না হওয়ার কারণে সমগ্র জনতা নীরব, নিথর, নিস্তব্ধ। তারা কুম্ভকর্ণও নয়, দেশ সম্পর্কে নির্বিকারও নয়। তাদেরকে উজ্জীবিত করতে হলে আমাদেরকেই বুক চিতিয়ে বিরামহীনভাবে যার যার আঙ্গিকে সরব হতে হবে। নইলে আমরাও বিবেকের রায়ে ইতিহাসের কাছে দায়ী হয়ে থাকবো।

You Might Also Like