অর্থ না ফেরতের দায় কার?


ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশ ব্যাংকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বৈদেশিক ও দেশীয় মুদ্রায় যে অর্থ সঞ্চিত থাকে তার মালিক এ দেশের জনগণ। বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রায় সঞ্চিত অর্থের ভাণ্ডার স্ফীত হওয়ার যে প্রবণতা এর কৃতিত্ব বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকজন বর্ণচোরা একান্ত নিজের বলে দাবি করলেও তা যে সঠিক নয় সে বিষয়টি এ দেশের সাধারণ জনমানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও তার সাশ্রয়ে যারা নিরলসভাবে অবদান রেখে চলেছেন তারা হলেনÑ এ দেশের কৃষক, বিভিন্ন কলকারখানায় বিশেষত তৈরি পোশাক ও তদসংশ্লিষ্ট পশ্চাৎসংযোগ কারখানায় কর্মরত শ্রমিক, প্রবাসে কর্মরত শ্রমিক এবং বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তা।

বাংলাদেশের কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে দেশ আজ আমাদের প্রধান কিছু খাদ্যপণ্যে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয় বরং উদ্বৃত্ত যা কিছু তা বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বাংলাদেশকে তার খাদ্য চাহিদা মিটানোর জন্য প্রচুর চাল আমদানি করতে হতো। আজ আমদানি না করার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার যে সাশ্রয় হচ্ছে এর কৃতিত্বের সম্পূর্ণটুকুই এ দেশের কৃষকের। বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগের জোগান আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হতে। তৈরি পোশাক রপ্তানি বাবদ যে আয় তার পেছনের মূল অবদান পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তা যারা পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে পোশাকশিল্প কারখানা স্থাপন করে সফলতা পেয়েছেন। বাংলাদেশের যে সকল শ্রমিক প্রবাসে কর্মরত তারা তথায় অতি সাধারণভাবে জীবনযাপন করে বৈদেশিক মুদ্রায় উপার্জিত অর্থের সামান্য একটি অংশ ব্যয় করে, অবশিষ্ট অংশ দেশে প্রেরণ করছেন। এ সকল সমষ্টিগত প্রচেষ্টার কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার নিয়ে আজ আমরা স্বাচ্ছন্দবোধ করতে পারছি। কিন্তু সে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত তাদের মধ্যে কারও কারও অবহেলা বা সংশ্লিষ্টতায় যদি বৈদেশিক মুদ্রা খোয়া যায় এবং সে খোয়া যাওয়া অর্থের সম্পূর্ণ অংশ ফেরত পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে আইনগতভাবে এর দায় কার ওপর বর্তায় বোধ করি এ বিষয়টি কারও অজানা নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫টি ভুয়া অ্যাডভাইজের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমে রক্ষিত অর্থ হতে যে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে ফিলিপাইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে অর্থের সম্পূর্ণ অংশ যে ফেরৎ পাওয়া যাবে না ব্যাংকটিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত বিতর্কিত জনৈক ডেপুটি গভর্নরকে উদ্ধৃত করে ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হতে অর্থ চুরি সংশ্লেষে যে ঘটনাটি সংগঠিত হয়েছে এমন ঘটনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ অবহিত হওয়ার পরক্ষণেই থানায় মামলা দায়ের ও বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা। কিন্তু অতীব দুঃখ ও পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পদত্যাগী গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন অনেকে অর্থ উদ্ধার ও দোষীদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে যতটুকু না তৎপর তার চেয়ে অধিক তৎপর ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার ক্ষেত্রে।
এ কথাটি আজ অনেকটা দিবালোকের মতো সত্য ফিলিপাইনের জাতীয় দৈনিকে অর্থ চুরির সংবাদ প্রকাশিত না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সংশ্লেষে যে এমন একটি জঘন্য চুরির ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল তা জানা হয়ত এ দেশের জনমানুষের পক্ষে কখনও সম্ভব হতো না।
পদত্যাগী গভর্নরের কর্মকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বহুলাংশে বিনষ্ট হয়েছে। সে সময় ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন অনেককেই বেসরকারি ব্যাংকসমূহে নিজেদের পোষ্য বা আত্মীয় নাম দিয়ে প্রচুর আকর্ষণীয় চাকরি বাগিয়ে নিতে দেখা গেছে। পোষ্য বা আত্মীয়স্বজনের নামে নেয়া এ সকল চাকরি জুটিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির পদস্থদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কাহিনি নিয়ে অনেক মুখরোচক গল্প আছে। ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন অনেক পদে প্রচুর চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা রয়েছেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তার কর্মদক্ষতার চেয়ে পদত্যাগী গভর্নরের সন্তুষ্টি অধিক বিবেচ্য ছিল।
ব্যাংকটির রিজার্ভের অর্থ চুরির মাসাধিকাল পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে থানায় যে মামলা দায়ের করা হয়েছে তাতে আসামির নাম অজ্ঞাত উল্লেœখ রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল ঘটনাটি জানার অব্যবহিত পর স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ তদন্ত সমাপনান্তে দোষীদের চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করা। বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ স্বয়ং অর্থমন্ত্রীর অভিমত, ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির সাথে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জড়িত। এ বাস্তবতায় মামলা সংশ্লেষে তদন্ত কার্য সঠিক পথে পরিচালনা করতে হলে বিদেশে গিয়ে তথ্য উদঘাটনের পরিবর্তে ব্যাংকের অভ্যন্তরে তদন্তকে কেন্দ্রীভূত রেখে এগিয়ে যেতে হবে। আর এ ধরনের মামলায় কর্মপš’া নির্ধারণ করে সঠিক ব্যক্তির দ্বারা সঠিকভাবে তদন্ত করতে পারলে দায় নির্ধারণ কঠিন কোনো ব্যাপার নয়।
লেখক : সাবেক জজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

You Might Also Like