কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোড দিয়েই টাকা চুরি

এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তরের জন্য যে সংকেতলিপি (সুইফট কোড) রয়েছে, সেটি ব্যবহার করেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি করা হয়েছে। আর এ কাজটি করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই অর্থ স্থানান্তরের ৩০টি পরামর্শ (অ্যাডভাইস) পাঠানো হয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের কাছে। ওই ৩০ পরামর্শের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পাঁচটি পরামর্শ কার্যকর হয়। তাতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হয়ে যায় ফিলিপাইনে। ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে বাকি ২৫টি পরামর্শের কার্যকারিতা থামানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ২৫টি পরামর্শ কার্যকর হয়ে গেলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে রাখা রিজার্ভের আরও বড় অংশ চুরি হয়ে যেত। তাতে রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগারও আশঙ্কা ছিল। চীনের হ্যাকাররা এ অর্থ সরিয়ে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কোনো কথা বলছেন না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ভরশীল একাধিক সূত্র বলছে, দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব যোগাযোগমাধ্যমটিতে তৃতীয় একটি পক্ষ ঢুকে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে গত সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘হ্যাকড’ করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে টাকা চুরির কথা বলেছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে তথ্য, তাতে ‘সিস্টেম হ্যাকড’ হওয়ার ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ সিস্টেমটি না ভেঙে যেহেতু সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে ‘অ্যাডভাইস বা পরামর্শ’গুলো পাঠানো হয়েছে, তাই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, টাকা নিয়ে যাওয়ার এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দোষ কিছু নেই। তাই তিনি নিউইয়র্কের রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক, যারা সেখানে হ্যান্ডেল করে তাদের কোনো গোলমাল হয়েছে। যদিও তারা অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, তাদের কোনো দায়িত্ব নেই, এটা হতেই পারে না।

এ সময় অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, আমি শুনেছি নিউইয়র্কের রিজার্ভ ব্যাংক এ দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের কোনো অধিকারই নেই। আমরা তাদের কাছে টাকা রেখেছি। তাই কোনোভাবে তারা দায় এড়াতে পারে না।

এর আগে সোমবার অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। আর অর্থমন্ত্রী গতকাল জানিয়েছেন, সোমবারই গভর্নর নিজে তাঁকে এ বিষয়ে অবগত করেছেন।

ৎএদিকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের দিক থেকে ‘হ্যাকড’ হয়ে অর্থ চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। ব্যাংকটির এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, ‘এখন পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির কোনো উদাহরণ নেই। এমনকি কোনো লেনদেন নিয়েও এখন পর্যন্ত প্রশ্ন ওঠেনি। এমনকি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামান্য ত্রুটিরও কোনো নজির নেই।’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৫০টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ লেনদেন হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থ চুরির ঘটনাটি যাতে তাৎক্ষণিকভাবে জানাজানি না হয় বা জানাজানি হলে প্রতিরোধের ব্যবস্থাটি দীর্ঘায়িত হয় সে জন্য বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের ছুটির দিনকে একত্র করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি যেদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম থেকে অর্থ স্থানান্তরের পরামর্শগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে পাঠানো হয়, সেদিন ছিল শুক্রবার। শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি। আবার রোববার ছুটি যুক্তরাষ্ট্রে ও সোমবার চীনের নববর্ষ উপলক্ষে ছুটি ছিল ফিলিপাইনে। তিন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনের ছুটির দিনগুলোকে সমন্বয় করেই এ ঘটনা হ্যাকাররা ঘটিয়েছে, যাতে করে ঘটনা জানাজানি হলেও এক দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগটা ত্বরিত না ঘটে।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেই রিজার্ভের অর্থ লেনদেন ও স্থানান্তর করা হয়ে থাকে। একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে সময়ে সময়ে লেনদেন বা অর্থ স্থানান্তর-সংক্রান্ত ‘আদেশ বা পরামর্শ’ দেওয়া হয়। ওই পরামর্শের ভিত্তিতে যে ব্যাংকে অর্থ রক্ষিত রয়েছে, সেই ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লেনদেন বা অর্থ স্থানান্তরের কাজটি সম্পন্ন করে।

এবারের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমের মধ্য থেকেই কে বা কারা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকের কাছে অর্থ স্থানান্তরের বেশ কয়েকটি ‘পরামর্শ’ পাঠায়। এর মধ্য থেকে পাঁচটি ‘পরামর্শ’ কার্যকরও হয়ে যায়। কিন্তু অর্থ স্থানান্তর করতে গিয়ে নিউইয়র্কের ব্যাংকটি দেখতে পায়, ওই টাকা ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর হওয়ার ‘পরামর্শ’ গেছে। তখনই এ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে নিউইয়র্কের রিজার্ভ ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ফিরতি এক বার্তার মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়, ওই ‘পরামর্শ’গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের নয়।

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ রক্ষিত রয়েছে। যেহেতু সেসব অর্থ একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, তাই ওই সব অর্থ সাধারণত কারও ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরের সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সেটি ঘটায় নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তাতে সন্দেহ তৈরি হয়।

বিদেশি মালিকানাধীন একটি বহুজাতিক ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা (যিনি এক দেশ থেকে অন্য দেশে আর্থিক লেনদেন ও কেনাকাটার ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞ) নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, এক দেশের ব্যাংকের সঙ্গে অন্য দেশের ব্যাংকের লেনদেন করা হয় মূলত ‘অথেনটিক বা নির্ভরযোগ্য’ একটি বার্তার ভিত্তিতে। সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হতে পারে, আবার বার্তাটি পাওয়ার পর ম্যানুয়ালিও কার্যকর হতে পারে। সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের মধ্যে এ যোগাযোগটি ই-মেইলেও হতে পারে আবার নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি বা সিস্টেমের মাধ্যমেও হতে পারে।

অপরদিকে, চুরি যাওয়া এ অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী জানিয়েছেন, যেহেতু অর্থগুলো কোথায় গেছে, সেটি শনাক্ত হয়েছে, তাই এ অর্থ ফেরত আনা যাবে। তবে সেটি হয়তো কিছুটা সময়সাপেক্ষ ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। এ চুরির ঘটনা নিয়ে গতকাল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

You Might Also Like