‘ভারতে এবারের নির্বাচনে রেকর্ড ভোট পড়েছে’

ভারতে সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে ভোটদানের হার অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে বলে বলছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এর আগে ভারতে লোকসভা নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটের হার ছিল ৬৪ শতাংশ, যেটা প্রায় তিন দশক আগে ১৯৮৪ সালে। কিন্তু ২০১৪-র এই নির্বাচনে ইতিমধ্যেই ভোটদানের হার ৬৬.৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, এবং নির্বাচন কমিশন বলছে পোস্টাল ব্যালট ও কিছু পুর্ননির্বাচনের হিসেব যোগ করা হলে এই শতকরা হার আরও বাড়বে।

২০১৪-র নির্বাচন নিয়ে আগ্রহের কারণ কী?

দিল্লির অশোকা রোডে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে বসে কমিশনের ডিজি অক্ষয় রাউত হিসেব দিচ্ছিলেন দেশের বিভিন্ন শহরে গতবারের তুলনায় এই নির্বাচনে ভোটদানের হার কতটা বেড়েছে।

দিল্লি-মুম্বাই-ব্যাঙ্গালোরের মতো মেট্রো কিংবা লখনোউ-পুনে-কানপুরের মতো তুলনায় আর একটু ছোট শহর, সর্বত্রই এবার প্রায় দশ থেকে বিশ শতাংশ ভোট বেশি পড়েছে, এবং কমিশন বলছে, শহরের লোক ভোট নিয়ে উদাসীন, এমন যে একটা ধারণা প্রচলিত আছে, ভোটাররা এবার সেটাও ভুল প্রমাণ করে দিয়েছেন।

আর প্রায় একই ধরনের ছবি সারা দেশেই, প্রায় সব রাজ্যেই, যে কারণে ভোটদানের হার তিরিশ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

প্রতি তিনজন ভারতীয় ভোটারের মধ্যে দুজনই এবার ভোট দিয়েছেন, এবং সমাজতাত্ত্বিক শিব বিশ্বনাথনের মতে, নবীন প্রজন্মের ভোট নিয়ে আগ্রহটা তার একটা বড় কারণ।

মি বিশ্বনাথন সেই সঙ্গেই বলছেন, ‘‘যে কোনও কারণেই হোক ভারতের রাজনীতি তুমুল আগ্রহের সঞ্চার করেছে, মানুষ সেখানে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন, যদিও এর সঙ্গে বিজেপি-র কোনও সম্পর্ক নেই।’’আঙুলে ভোটের কালি নিয়ে সেলফি তোলা আধুনিক ভারতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে

ভোটদানের উঁচু হার রাজনৈতিকভাবে কীসের ইঙ্গিত?

বিজেপি-র দাবি, এই বিপুল ভোটের হার আসলে পরিষ্কার অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের অন্যতম এম জে আকবর সম্প্রতি বিজেপি-তে যোগ দিয়েছেন, ভোটের এই হার নিয়ে তার বক্তব্য মানুষ পরিবর্তন চাইছে।

এটা হল পরিবর্তনের ভোট। তরুণ ভোটাররা তো এবার আমার মনে হয় আশি শতাংশেরও বেশি ভোট দিয়েছেন, আর এই ভোটে সরকার যে পাল্টাবে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’’

নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ বা জনমত জরিপে যুক্ত সেফোলজিস্টরা আবার মনে করেন, ভোট বেশি পড়ল মানেই ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভ উগড়ে দিলেন, ব্যাপারটা সব সময় তা নয়।

ভারতের অগ্রণী সেফোলজি প্রতিষ্ঠান সিএসডিএসের ডিরেক্টর সঞ্জয় কুমার বলছিলেন, ‘‘আমরা বহু নির্বাচন দেখেছি যেখানে খুব কম ভোট পড়লেও মানুষ সরকারকে হঠিয়ে দিয়েছে, আবার কম ভোটে সরকার ফের জিতেও এসেছে।’’

তিনি সেই সঙ্গেই যোগ করেন, ‘‘যদি ভারতের সব বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের ফল দেখা যায়, তাহলে বলতেই হবে বেশি ভোট পড়া মানেই সরকার বদলানোর ইঙ্গিত, এই দুয়ের মধ্যে আদৌ কিন্তু তেমন কোনও সম্পর্ক নেই।’’

বস্তুত এর আগে ১৯৮৪ সালের যে ভোটে ভারতে ৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল, তাতে কংগ্রেসই জিতে আবার ক্ষমতায় আসে, যদিও ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর সেই ভোটকে অনেকেই বিপুল সহানুভূতির ভোট বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এম জে আকবর অবশ্য দাবি করছেন, ১৯৮৪ সালে ও এখন এই ২০১৪ সালে বেশি ভোট পড়ার পরিপ্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘চাকরিবাকরি না-পেয়ে, সরকারের দুর্নীতিতে বা উদাসীনতায় মানুষ অসম্ভব রেগে আছেন – আর সেই রাগের প্রতিফলন হয়েছে ভোটে।’’

কিন্তু শুধু রাগে এতটা ভোট পড়ে না, সেই সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী একটা নতুন আশার সঞ্চার করতে পেরেছেন বলেই মানুষ এত বেশি সংখ্যায় ভোট দিয়েছে,’’ বলছেন মি আকবর।

এই বিপুল ভোটের ফায়দা পাবে কোন্‌ জোট, সেটা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৬ই মে পর্যন্ত।

কিন্তু সেই ফলাফল যাই হোক, ভারতীয়রা যে আবার নির্বাচনী গণতন্ত্রে প্রবল ভরসা রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, দেশের নির্বাচন কমিশন সেটাকেই একটা বিরাট সাফল্য বলে মনে করছে।

You Might Also Like