সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির যৌক্তিকতা

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

কর্মসংস্থানের তুলনায় বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা অনেক বেশি। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভ করে চাকরির বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হন। খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভের পর কর্মস্থলে প্রবেশ করতে পারেন। নানাবিধ কারণে বেশির ভাগই সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকৃত চাকরিপ্রত্যাশী সর্বোচ্চ বয়সসীমা অতিক্রম করায় একটি বা দুটি বিসিএস পরীক্ষার বেশি অংশগ্রহণ করতেও পারেন না। অন্যান্য সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কারণ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর। বয়সসীমার বাধ্যবাধকতা থাকায় উপযুক্ত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী। বর্তমান শিক্ষা কাঠামোতে অনার্স কোর্স চার বছর ও ডিগ্রি (পাস) কোর্স তিন বছর মেয়াদে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী ৬+ বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে এবং সর্বশেষ স্নাতকোত্তর শিক্ষা পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ২৪-২৫ বছর বয়সে সমাপ্ত করতে পারে। কিন্তু দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো সেশনজটমুক্ত নয়। ফলে শিক্ষার্থীর জীবন থেকে সেশনজটে আরো চার-পাঁচটি বছর নষ্ট হয়। উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করতে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর বয়স ২৮-২৯ বছর হয়ে যায়। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৩০ বছর হওয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে দু-এক বছরের মধ্যে চাকরির সুযোগ করতে মরিয়া হয়ে উঠতে হয়। কিন্তু কর্মসংস্থানের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় সে আশা অনেকেরই পূরণ হয় না। বাংলাদেশের গড় আয়ু প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে লিঙ্গভেদে প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ১৯৯১ সালে পুরুষের ক্ষেত্রে ৫৬.৫ বছর, মহিলাদের ক্ষেত্রে ৫৫.৭ বছর এবং ২০০১ সালে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল পুরুষের ক্ষেত্রে ৬৪.০ বছর এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৬৪.৫ বছর ছিল। ২০১১ সালে পুরুষের ক্ষেত্রে ৬৭.৯ বছর এবং মহিলার ক্ষেত্রে ৭০.৩ বছর। বর্তমানে গড় আয়ু ৭১ বছর। গড় আয়ু যখন ৪৫ ছিল তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭, যখন ৫০ ছাড়াল তখন প্রবেশের বয়স ৩০ হলো। তাহলে চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা আগের মতো ৩০ বছর থাকা কোনোভাবেই কাম্য কি না, তা পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারবেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী কোটা ও উপজাতীয় প্রার্থীর চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি জুডিশিয়াল ও ডাক্তার ৩২ বছর পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। নার্স ৩৬ এবং বিভাগীয় প্রার্থীরা ৪০ বছর পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৫৫ শতাংশ কোটার মাধ্যমে নিয়োগ হয়। সাধারণদের কোনো কোটা নেই। আবার কোটাধারীরাই ৩২ বছর পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। তাহলে সাধারণদের জন্য কেন নয়? স্বাধীনতার পর সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা করা হয় ৫৭ বছর। দেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বরে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ বছরে উন্নীত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করা হয়। এ ছাড়া বিচারপতিদের ৬৫ থেকে ৬৭ বছর এবং বৈজ্ঞানিকদের ৫৯ থেকে ৬৭ বছর করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই সিদ্ধান্ত প্রশংসিত। কিন্তু সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমার কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি। এখনো তা আগের মতো ৩০ বছরেই রয়ে গেছে। বয়সসীমা অবসরের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হলেও প্রবেশে বয়সসীমা বৃদ্ধি পায়নি। সংগত কারণেই এখন প্রশ্ন উঠেছে, চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবসরের বয়সসীমা থাকলেও প্রবেশের কোনো সীমা নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ৪০, অন্যান্য প্রদেশে ৩৮-৪০, শ্রীলঙ্কায় ৪৫, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৫, ইতালিতে ৩৫, ফ্রান্সে ৪০, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯, কানাডায় ৫৯, সুইডেনে ৪৭, কাতারে ৩৫, নরওয়েতে ৩৫, অ্যাঙ্গোলায় ৪৫, তাইওয়ানে ৩৫, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত। আফ্রিকায় চাকরিপ্রার্থীদের বয়স বাংলাদেশের সরকারি চাকরির মতো সীমাবদ্ধ নেই। অর্থাৎ চাকরিপ্রার্থীদের বয়স সর্বনিম্ন ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বয়সে আবেদন করতে পারেন। রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যে যোগ্যতা থাকলে অবসরের আগের দিনও যে কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়। ২০১৫ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠকে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নবম জাতীয় সংসদের শেষ দিকে মহাজোট সরকারের চমক হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির ব্যাপারে ইতিবাচক নির্দেশনা ছিল। বিশেষ করে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি স্পিকার থাকাবস্থায় ৩১ জানুয়ারি ২০১২ সালে মহান জাতীয় সংসদে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। নবম জাতীয় সংসদে ১৪তম অধিবেশনে ৩৫ বছর এই প্রস্তাবটি প্রথম প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয়। বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অধিক। শিক্ষিত বেকার সমাজ ও দেশের বোঝাস্বরূপ। নানাভাবে জর্জরিত শিক্ষিত বেকার সমাজ অসহনীয়ভাবে দিন যাপন করছে। তাঁদের অনেকেরই প্রত্যাশা, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছরের পরিবর্তে ৩৫ বছর হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩৫ বছরে উন্নীত করলে শিক্ষার্থীদের মন থেকে হতাশা দূর হবে এবং শিক্ষা কার্যক্রমের মূলধারায় মনোনিবেশ বাড়বে। তা ছাড়া একাডেমিক পড়াশোনা শেষে কয়েক বছর সময় পেলে চাকরির জন্য নিজেকে উপযোগী করতে পারবেন। অষ্টম পে স্কেল অনুযায়ী সরকারি চাকরির বয়স পাঁচ বছর এবং তদূর্ধ্বদের নির্ধারিত হারে পেনশন সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের প্রবণতাও কিছুটা বাড়বে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে এবং বেকারত্ব কমবে। কাজেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বৃদ্ধি করলে শিক্ষার্থীদের হতাশা অনেকটা দূর হবে। কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান সেশনজটের ফলে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যে সময় নষ্ট হয়, তার দায়ভার নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। অন্যথায় কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাটি বাংলাদেশের জন্য যথাযথ হবে না।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

You Might Also Like