ইসলাম মানবাধিকার ও পাশ্চাত্য আধুনিকতা

শাহ্ আব্দুল হান্নান

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত ‘আধুনিতার পথে ইসলাম’ তথা ‘ইসলাম’স পাথ টু মডার্নিটি’ শীর্ষক লেখাটি পড়লাম। এর লেখক মোহাম্মদ ফজল হাশেমি একজন বিখ্যাত ইরানিয়ান চিন্তাবিদ।
এ প্রবন্ধের মূল কথাগুলোর ওপর আমি এখানে মন্তব্য করব। লেখক বলছেন, ইসলামপন্থীরা জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদের শুরু থেকে সমালোচনা করে আসছে যে, এর মাধ্যমে পাশ্চাত্য তার ধ্যানধারণা মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। তাদের একটি অংশ বলছে, কোনো বিধানই শরিয়াকে বাতিল করতে পারে না।
তিনি আরো বলছেন, নতুন ইসলামি চিন্তাবিদেরা মনে করেন, কুরআনের বিষয়বস্তু পাঠের সময়ের পরিবর্তনের ফলে নতুন ব্যাখ্যা হতে পারে। কুরআন শক্তভাবে স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, সুবিচার ও মানুষের মর্যাদা ঘোষণা করেছে।
তিনি আয়াতুল্লাহ তাকি ফাজেলকে উদ্ধৃত করে বলেন, কুরআনের শাস্তিÍর বিধানগুলো তাওরাত থেকে নেয়া হয়েছে। তিনি ইরানিয়ান পণ্ডিত মোজাহেদ সাবেসতারিকে উল্লেখ করেছেন, তার মতে, সুবিচার এবং মানবাধিকারের ধারণাগুলো আজকাল যেভাবে দেখা হচ্ছে, এসব ধারণা আগে ছিল না। কিন্তু এসবকে উপেক্ষা করা যাবে না। সাবেসতারি আরো মনে করেন, কুরআনের বাণী হচ্ছে, ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নাই’ তা প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক আব্দুল করিম কোবাবারোসকে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, ইসলামের প্রাথমিক পণ্ডিতেরা মানবাধিকারের ব্যানারটি বুঝতে ব্যর্থ হন। তার মতে, মানবাধিকারকে অস্বীকার করা অপরাধ।
জুরগেন হাবেরমাস বলেছেন, কুরআনের নতুন অনুবাদে পরিবর্তনশীল চিন্তাগুলোকে যাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেভাবে অনুবাদ করা হয়েছে। লেখক আয়াতুল্লা মুন্তাজেরিকে উল্লেখ করে বলছেন, কাউকে স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য ধর্ম ত্যাগের বা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করা যায় না।
আমার মতে, তার লেখার অনেক কিছুই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সব নয়। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সনদ একটি ভালো দলিল। লক্ষণীয়, এ দলিলের বেশির ভাগ ধারা প্রায় দেশেই অনুসরণ করা হচ্ছে না।
এ দলিলের মূল ত্রুটি হচ্ছে, ধর্মের মতো ব্যাপক বিষয়কে, যার অনুসারী বেশির ভাগ মানুষ, যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এ জন্যই মুসলিম দেশগুলোর জন্য ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসি নতুন মানবাধিকার দলিল তৈরি করে ১৯৯০ সালে, যা জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দলিল থেকে উন্নততর। ওআইসির মানবাধিকার দলিল কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে রচিত। এতে স্পষ্ট হয়, ইসলামে মানবাধিকার পুরোপুরি স্বীকৃত। ইসলামে পুরুষ, নারী, অমুসলিমের মানবাধিকারে পার্থক্য নেই। ছোটখাটো পার্থক্য আছে অন্যান্য বিষয়ে।
কুরআন ও সুন্নাহ যে কয়টি হক শাস্তির কথা বলেছে, যেমন বেত্রাঘাত, হাত কাটা নিঃসন্দেহে কঠোর। কিন্তু এ কয়টি হচ্ছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের সংশোধন করা।
মানবাধিকার প্রশ্নে প্রথমদিকের পণ্ডিতেরাও কথা বলেছেন, তবে হয়তো আজকের মতো নয়। বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল মানবাধিকার রক্ষা করা। কুরআনের অনুবাদে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, তবে অন্য ভাষায় অনুবাদের সময় বিভিন্ন অনুবাদক কিছুটা বিভিন্নভাবে করতে পারেন।
কুরআনের শিক্ষা ব্যাপক আঙ্গিকে দেয়া হয়েছে তাকে পরবর্তীকালে বিস্তৃত করা প্রত্যেক যুগের পণ্ডিতদের কাজ এবং তা এরা করছেন। কুরআনের টেক্স্ট বা বিষয়বস্তু লঙ্ঘন না করলে সব নতুনকে ভালোমতোই মেনে নেয়া যায়।
আল্লাহ ও রাসূলকে গালিগালাজ করার বিষয়টি যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত (দ্রষ্টব্য : ইসলামে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ড. হাশিম কামালী, বিআইআইটি প্রকাশিত, রোড নং ২, হাউজ নং-৪, উত্তরা, সেক্টর-৯, ঢাকা)।
সব শেষে আমি বলব, ইসলামকে আধুনিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজন নেই। বরং পাশ্চাত্য আধুনিকতার সেকুলারিজম, ভোগবাদ, যৌন লিবারেলইজম ইত্যাদি ত্যাগ করা উচিত।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

You Might Also Like