ফ্রি বইয়ের চমক ও ডাবল বেতনের চাপ

মীযানুল করীম

গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো ইংরেজি বছর শুরু হলো স্কুলে নতুন পাঠ্যবই ফ্রি বিতরণের ‘চমক’ লাগিয়ে। কিন্তু এরপরই হঠাৎ বেতন-ফি অনেক বাড়ানোর ‘ধাক্কা’ খেতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। এ দিকে পাঠ্যপুস্তক উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে কোনো কোনো স্থানে বিনামূল্যের বই মূল্য দিয়ে কিনে। কোথাও বা নষ্ট বই বিলিয়ে কচি-কিশোর শিক্ষার্থীদের মনে নিদারুণ কষ্ট দেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর স্কুলপর্যায়ে বিনামূল্যে বই দেয়াকে সরকারের একটা বড় কাজ হিসেবে গ্রহণ করেছে। সে মোতাবেক ব্যাপক প্রচারণার মাঝে প্রতি বছর পয়লা জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসবের তোড়জোড় চলে। দৃশ্যত এটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ- বিশেষ করে যেখানে আমাদের দেশের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের একটা বিরাট অংশ (হয়তো আজো বেশির ভাগই) নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে কিছু বিষয়। এগুলো ত্রুটি বা ব্যর্থতা হিসেবে একেবারে ছোট নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই ফ্রি বই বিলির কর্মসূচি চলে আসছে। তবুও কেন এতে বড় বড় গলদ ও ব্যর্থতা থেকে যাচ্ছে, এটাই প্রশ্ন।
গত কয়েক বছরের মতো এবারো দেশের অনেক জায়গায় নির্ধারিত সময়ে স্কুলে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছেনি। ফলে ‘উৎসব’ হয়নি, শিক্ষার্থীদের বিষণ্ন মুখে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ‘মূল্য’ ছাড়া বিনামূল্যের বই দেয়া হয়নি। আর নিম্নমানের বই বিলি তো আমাদের দেশে ‘ঐতিহ্যে’ পরিণত হচ্ছে। এসব খবর গত কয়েক দিনে পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়েছে। সরকার এর প্রতিবাদ জানায়নি বলে নিশ্চিত হওয়া যায় এ খবরগুলোর সত্যতা সম্পর্কে।
সম্ভবত পাঠ্যপুস্তক উৎসবের পরদিনই টিভিতে দেখানো হচ্ছিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি প্রাইমারি স্কুলে টাকার বিনিময়ে বই দেয়ার ছবি। দেখা গেল, কচি-কিশোর ছাত্রছাত্রীরা একে একে এগিয়ে এসে টাকা দিচ্ছে। কেবল তারপরই তারা পাচ্ছে নতুন পাঠ্যবই। তখন সেখানে উপস্থিত অভিভাবকদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের দৃশ্যও দেখা গেছে। টিভিতে এ ঘটনা প্রচার করা হলে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। ওই স্কুলটির প্রধান শিক্ষককে বরখাস্ত করা হলো। রাজধানীর পাশে প্রকাশ্যেই যদি বিনামূল্যের বই বিতরণে এমন মারাত্মক অনিয়ম করা হয়, তাহলে দূরবর্তী মফস্বলের অবস্থা কেমন, অনুমান করা কঠিন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আলোচ্য স্কুলটির প্রধান শিক্ষক কি একক সিদ্ধান্তে মূল্য নিয়ে বিনামূল্যের বই বিলিয়েছেন? টিভিতে কিন্তু স্কুল কমিটির প্রধানের ছবি ও বক্তব্যও এসেছে। জানানো হয়েছে, কমিটির সম্মতি রয়েছে এই অন্যায় কাজে।
জানুয়ারির ১ তারিখে সরকার ‘পাঠ্যবই উৎসব’ উদযাপনের পর গত ক’দিনে পত্রপত্রিকা অনেক খবর দিয়েছে উৎসবের উল্টো পিঠ দেখিয়ে। যেমন- কোথাও বই পৌঁছেনি, কোথাও বই সব দেয়া হয়নি, কোথাও বা বইগুলোর মান বাজে, আর কোনো কোনো স্থানে টাকা না দিলে মেলেনি ‘ফ্রি’ বই! বিশেষ করে ঢাকার অদূরে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া বই পেয়ে শিক্ষার্থীদের মনে কষ্ট অনুভূত না হয়ে পারেনি। গত বুধবার নয়া দিগন্তের সংবাদ শিরোনাম- ‘গাজীপুরে বই উৎসবের ১১ দিন পরও সব বই পায়নি প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা।’ এর ঠিক নিচেই উপশিরোনাম : ‘সিদ্ধিরগঞ্জে বই বিতরণে টাকা গ্রহণের ঘটনায় শিক্ষককে পুনর্বহাল, দোষীদের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর।’ সর্বশেষ দৈনিক যুগান্তরে গত শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের একটি খবর। শিরোনাম- টাকা দিয়ে বিনামূল্যের বই পেল শিক্ষার্থীরা। ঘটনাটি পাকুন্দিয়ার একটি হাইস্কুলের।
১৪ জানুয়ারি প্রথম আলোর লিড রিপোর্টের শিরোনাম : ‘শিক্ষার্থীদের হাতে নিম্নমানের বই।’ ফ্রি বিলানো পাঠ্যবইয়ের পরিমাণ নিয়ে প্রপাগান্ডার অন্ত নেই সরকারের। কিন্তু কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটি যে গুরুত্বের দিক দিয়ে কম নয়, বরং বেশি- তা সংশ্লিষ্ট বড় কর্তারা বোধহয় বোঝেন না।
প্রথম আলোর আলোচ্য প্রতিবেদনে শুরুতেই জানানো হয়েছে, ‘এবার স্কুলে স্কুলে বিলি করা পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’ পত্রিকাটির ভাষায়- ‘প্রাথমিকের বইয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করায় অনেক ক্ষেত্রে ছাপা অস্পষ্ট হয়েছে। বাঁধাইয়ের কাজটাও যথাযথ হয়নি। ফলে এ বই কত দিন টিকবে, তা নিয়ে শঙ্কিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।’ আরো জানানো হয়, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত ১০০ উপজেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিম্নমানের কাগজে ঝাপসা বই ছাপার প্রমাণ পেয়েছে। … বিভিন্ন শ্রেনীর ১১টি নতুন বই সংগ্রহ করে দেখা যায়, এগুলোর কাগজ ও ছাপার মান খারাপ। কোনো কোনো ছবি থেকে কালি উঠছে। ছবির ব্যক্তিদের চেহারা অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে না। প্রাথমিকের কাগজ, ছাপা ও বাঁধাই খারাপ, মাধ্যমিক স্তরে ছাপা ও বাঁধাই খারাপ।’ উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বইয়ের কাগজ ও ছাপার মান গত বছরের চেয়ে অনেক খারাপ। মাধ্যমিক পর্যায়ের বই এমনভাবে বাঁধাই করা হয়েছে যে, মেলাতে গেলেই সুতা ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিম্নমানের বাঁধাইয়ের দরুন বইগুলো শিগগিরই পড়ার অযোগ্য হয়ে পড়বে।
রাজধানীতে বিভিন্ন জায়গায় কয়েক দিন আগে সরকারের আত্মপ্রশংসামূলক বিলবোর্ডে লেখা ছিল, দেশ অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে। কিন্তু কোটি কোটি টাকার পাঠ্যবইয়ের এমন বেহাল দশা কি সেই ‘ডিজিটাল’ অগ্রগতির নমুনা? বেশ কয়েক বছর ধরে পয়লা জানুয়ারি ফ্রি পাঠ্যবই বিতরণ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রথম দিকে কিছু ছোট গলদ থাকা না হয় স্বাভাবিক; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো না কমে কেন এভাবে বেড়ে যাচ্ছে? এখনো চোখে পড়ছে বড় বড় গলদ। পাঠ্যবই রচনা-সম্পাদনা, ছাপা-বাঁধাই, বিলিবণ্টন- মোটকথা প্রায় সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি ও ব্যর্থতা সাক্ষ্য দেয় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের গাফিলতি ও অযোগ্যতার। বইপত্রের ছাপা-বাঁধাইয়ের মান ভালো হয় না তাড়াহুড়া করা কিংবা বাজে প্রতিষ্ঠানকে এ কাজ দেয়ার কারণে। স্কুলের পাঠ্যবই ছাপানোর টেন্ডার নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অনেক কথাই পত্রিকায় ফিবছর ছাপা হচ্ছে। তবে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার কথা যাদের, তারা শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয় না।
টেক্সট বুক বোর্ড একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে স্কুলের পাঠ্যবইগুলোর মান জরিপের জন্য। বোর্ড যদি শুরু থেকে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করত, তাহলে অবস্থা এ পর্যায়ে আসত না। জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেক্সট বুক বোর্ড যথাযথ ভূমিকা রাখায় ব্যর্থ হচ্ছে বলে সুধীজনের অভিমত। যা হোক, তবুও ভালো যে, এবার বিতরণের পর এর মান যাচাই করা হচ্ছে। অবশ্য ভবিষ্যতে যে পাঠ্যবইয়ের মান উন্নত হবে, অভিভাবকেরা সে আশা বেশি করার কারণ নেই।
বইয়ের মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত মানা হয়নি। অপর দিকে দরপত্রের শর্ত মোতাবেক মুদ্রাকরদের বিলের শতকরা ৮০ ভাগই এখন দিতে হচ্ছে। এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা। জানা গেছে, স্কুল পাঠ্যবইয়ের মুদ্রাকররা ‘অস্বাভাবিক কম’ দরে এ কাজটি নেয়ার সময়েই আপত্তি তুলেছিল বিশ্বব্যাংক। প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের খরচের একাংশ প্রদান করে বিশ্বব্যাংকসহ একটি কনসোর্টিয়াম।
পাঠ্যবইয়ের বাঁধাই, কাগজ, ছাপা মোটামুটি মানসম্মত হলে একই বই পরপর কমপক্ষে তিন কী চার বছরও ব্যবহার করা সম্ভব। আমরা স্কুলজীবনে দেখেছি, সচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরাও এক ভাই বা এক বোনের বই দিয়ে ছোট ভাইবোন পড়াশোনা করেছে। অন্য পরিবার কিংবা পড়শির কাছ থেকে পুরনো বই এনেও লেখাপড়ার কাজ চালানো হতো। স্কুলের পুরনো পাঠ্যবই বেচাকেনার দোকানও ছিল। সেগুলো কেনা হতো ক্লাসে পড়ার জন্য। এখন কেনা হয় ঠোঙা তৈরির জন্য। এ বিষয়টি পাঠ্যবইয়ের কেবল অপব্যবহার নয়, জাতির বড় মাপের অপচয়েরও নজির।
এ দিকে অন্য কারো (এমনকি সংবাদপত্র বা মিডিয়ারও) নজর পড়েনি পাঠ্যপুস্তক উৎসবের ডঙ্কানিনাদে। তবে দেশের শিক্ষাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ফ্রি পাঠ্যবইয়ের নামে বিপুল অপব্যয়ের দিকে।
১২ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোতে বুয়েটের যশস্বী এই শিক্ষকের একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। এতে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সরকার প্রতি বছর ৩০-৪০ কোটি পাঠ্যবই বিনামূল্যে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে বই আমরা বছরের পর বছর পালাক্রমে পড়তাম। পাঠ্যপুস্তক দিবস নিয়ে আমাদের জাতি গর্ববোধ করতেই পারে। তবে প্রতি বছরই এতগুলো বই ছাপানো হবে এবং তা পরবর্তী বছরে ব্যবহার করা হবে না, কাগজের জন্য বনজঙ্গল উজাড় হয়ে যাবে, তা-ও কাক্সিক্ষত নয়। এই বিলাসিতা করা আমাদের ঠিক নয়। কারণ, এখনো আমরা বৈদেশিক ঋণের দিকেই তাকিয়ে থাকি।’
উল্লেখ্য, অধ্যাপক কায়কোবাদের এই নিবন্ধের শিরোনাম- ‘ধনীর কৃচ্ছ্রসাধন আর নির্ধনের ভোগবিলাস।’
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, একে তো কোটি কোটি বই প্রতি বছর ছাপাতে দেশে কাগজের টান পড়ার শঙ্কা; তার ওপর এই চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে কাগজ আনতে হলে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। তদুপরি গত কয়েক বছরে এসব পাঠ্যবই বিপুলসংখ্যায় তড়িঘড়ি ছাপানোর জন্য দেশের রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বলের বিভিন্ন প্রেসে ছাপার কাজ দেয়া হয়েছে। এতে ছাপা ও বাঁধাইসহ বইয়ের মান অভিন্ন থাকেনি। অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নমানের বই সরবরাহ করা হয়েছে। সেগুলো নিতে বাধ্য হয়েছে কোমলমতি শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা। সস্তার যেখানে ‘তিন অবস্থা’, সেখানে মুফতে পাওয়া জিনিসের দুরবস্থা তো ঘটবেই- এ কথা বলে কর্তৃপক্ষ সান্ত্বনা যেমন দিতে পারে না, তেমনি দায়ও এড়ানোর উপায় নেই। শুধু বাংলাদেশের প্রেসে নয়, ভারতের উত্তরপ্রদেশ-মধ্যপ্রদেশের মতো দূর-দূরান্তের ঝাসিসহ কোনো কোনো শহরেও আমাদের স্কুলপাঠ্যবই ছাপতে দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া এই কোটি কোটি বই মুদ্রণ নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, দলবাজির মতো নানা কাণ্ডকীর্তির খবর পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এসব কেলেঙ্কারি শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়েছে কিংবা আগামীতে তা আর ঘটবে না- এই গ্যারান্টি কর্তৃপক্ষ দিতে পারে কি?

বই উৎসবের পর ব্যয়বৃদ্ধির উৎকণ্ঠা
স্কুলে স্কুলে বিনামূল্যে বই দেয়া হলো জানুয়ারির প্রথম দিকে। এরপর সবে ক্লাস শুরু হয়েছে (তা-ও পুরোদমে নয়), কিন্তু ফ্রি বই প্রাপ্তির আনন্দের রেশ মুছে দিচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের বেতন একলাফে ডাবল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সরকার বছর শুরুর দিনে মুফতে বই দিয়ে চমক লাগিয়েছে। এরপর এক সপ্তাহ না যেতেই বেতন দ্বিগুণ করার তুঘলকি সিদ্ধান্ত যে শুনতে হবে, তা অভিভাবকেরা কল্পনাও করেননি।
১৪ জানুয়ারি নয়া দিগন্তের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রধান ছবিটি হচ্ছেÑ দেশের একটি নামী স্কুলের অভিভাবকদের বিক্ষোভের দৃশ্য। আরো কয়েকটি নামীদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে এখানেও হঠাৎ টিউশন ফি বা বেতন প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়া হয়েছে। অভিভাবকেরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে না নেমে পারছেন না। বলা নেই, কওয়া নেই, অভিভাবকদের সাথে আলাপ-আলোচনার বালাই নেই- বেশ কয়েকটি স্কুল ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন, ভর্তি ফি ও বিভিন্ন চার্জ। ‘যুক্তি’ দেখানো হচ্ছে, নতুন বেতনস্কেলে শিক্ষকদের বেতন বেড়েছে, সে জন্য শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ছে।’ কথা হলো, সরকারের সিদ্ধান্তের মাশুল কেন সুদে-আসলে অভিভাবকদের দিতে হবে? নামকরা স্কুলগুলোর অভিভাবকদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের। তা ছাড়া এসব স্কুলে দরিদ্র কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়। বেতন বাড়লে তাদের কী দশা হবে? সব কিছুর একটা নিয়মনীতি ও ধারাবাহিকতা থাকে। অথচ এবার শিক্ষার্থীদের বেতন ও ফি বেলাগাম বাড়ানোর বেলায় এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। এমন অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক পদক্ষেপ কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
যখন অভিভাবকেরা সন্তানের স্কুলের বেতন দ্বিগুণ হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন কর্তৃপক্ষ চিঠি চালাচালি করছে। এতে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটছে। জানা গেছে, করণীয় জানতে বৃহস্পতিবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, যেখানে স্কুলগুলো সুস্পষ্টরূপে অন্যায় করছে বেতন অনেক বাড়িয়ে, সেখানে অধিদফতর কেন ত্বরিত হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে না? অথচ এর ডিজি ফাহিমা খাতুন বলেছেন, বিভিন্ন স্কুল বিভিন্ন ফন্দিফিকিরে টাকা আদায় করছে। কেউ ভর্তির সময় আদায় করছে বেশি, কেউ বেতন করেছে দ্বিগুণ। এভাবে চলতে পারে না।’
‘রাজধানীসমেত দেশের বড় শহরগুলোর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বছর ভর্তি ফি এবং বেতন ও অন্যান্য চার্জ লাগামহীনভাবে বাড়ানো হয়েছে।’ নয়া দিগন্তের লিড নিউজের সূচনা হয়েছে এভাবে। এতে আরো জানানো হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) ভর্তি নীতিমালায় ফি ধার্য করে দিলেও এই সিদ্ধান্তের কোনো তোয়াক্কা করছে না কেউ। স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছেমতো ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ফি আদায় করছে।’ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা ‘যুক্তি’ দেখিয়েছেন, ‘বছরের শুরুতেই নয়া বেতনস্কেল ঘোষণা দেয়ায় আমাদের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতনভাতা বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের বেতনভাতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এটা আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস।’
কয়েক দিন আগে টিভি চ্যানেলে বিভিন্ন স্কুলের বেতন-ফি বাড়ানোর বিষয়ে সচিত্র সংবাদ প্রচারিত হচ্ছিল। এতে কাকরাইলের একটি বড় স্কুলের ব্যাপারে জানানো হয়, তারা এবার ভর্তি ফি বাড়িয়ে দিয়েছেন অনেক। এমনকি ইংলিশ ভার্সনে ভর্তি হতে লাগবে ২৭ হাজার টাকা, যা গত বছরও ছিল এর অর্ধেক মাত্র। পরে আরেকটি সেরা স্কুলের খবর পেলাম, সেখানে ক্লাসের বেতন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বোধহয় কোনো প্রাণীই এত দূর যেতে পারে না এক লাফে। যেমন- যে ক্লাসে গত মাস পর্যন্ত মাসিক বেতন ছিল ৯০০ টাকা, তা এখন হবে ‘মাত্র’ এক হাজার ৮০০ টাকা! কাণ্ডজ্ঞান ও যুক্তির সীমালঙ্ঘনের জ্বলন্ত প্রমাণ আর কাকে বলে? মনে রাখা উচিত, অভিভাবকদের ওপর লাগামছাড়া বেতন বৃদ্ধির বোঝা চাপালে বিখ্যাত স্কুলগুলো তাদের খ্যাতি হারিয়ে শুধু ক্ষোভ ও সমালোচনাই কুড়াবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ কি ভেবে দেখেছে, অভিাভাবকেরা সন্তানের পড়াশোনার এই দ্বিগুণ ব্যয়ভার কিভাবে ও কোত্থেকে বহন করবেন?

You Might Also Like