বাংলাদেশ এখনো হুমকিমুক্ত হয়নি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

থলের বিড়ালটি বেরিয়ে পড়েছিল বহু আগেই। এত দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটিকে আরো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করলেন। এটার প্রয়োজন ছিল। এসব চক্রান্ত এবং চক্রান্তের হোতারা চিহ্নিত না হলে দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্থ অনেক সময় গুরুতরভাবে বিপন্ন হয়। একটি ব্যাংকের কর্তৃত্ব নির্ধারণের মতো সম্পূর্ণভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সুপারপাওয়ার ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থে কিভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে, এমনকি দেশটির একটি বিরাট উন্নয়নমূলক প্রকল্পে (পদ্মা সেতু প্রকল্প) বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হতে পারে, তার চিত্রটি প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। সুপারপাওয়ারের এই হুমকির মুখে অস্তিত্ব সংকটেও পড়েছিল হাসিনা সরকার। সরকার অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সেই সংকটের মোকাবিলা করেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়নও বন্ধ হয়ে থাকেনি।
গত ১৬ জানুয়ারি শনিবার রাজধানী ঢাকায় শিল্পকলা মিলনায়তনে কাজী মাহবুব উল্লাহ স্মৃতিপদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দেশবিরোধী চক্রান্তের চিত্রটি স্পষ্টভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন এবং বিশ্বের একক সুপারপাওয়ারের হুমকির কথাও প্রকাশ করতে সাহসের অভাব দেখাননি। বস্তুত বর্তমান শতকের এই চক্রান্তের সঙ্গে ২০০ বছর আগের মুর্শিদাবাদের নবাব দরবারের একটি চক্রান্তের তুলনা করা যেতে পারে। সেই চক্রান্তেরও নায়ক ছিলেন তত্কালীন নবাবি বাংলার নব্য ধনীদের নেতা এবং সুদে অর্থ খাটানো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী জগৎ শেঠ।
জগৎ শেঠের পৃষ্ঠপোষক ছিল তখনকার ইংরেজ বেনিয়ারা এবং তাদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। পুত্র কৃষ্ণ দাসের মাধ্যমে জগৎ শেঠ কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতেন এবং প্রচুর টাকা সেখানে গোপনে পাচার করতেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা তা জানতে পেরে কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করেন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সঙ্গে জগৎ শেঠের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ফলে শুরু হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্র। পলাশীর যুদ্ধের ট্র্যাজেডির এভাবেই সূচনা। তখনকার উদীয়মান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল এ চক্রান্ত সফল করার পেছনে।
দুই শ-আড়াই শ বছর আগে ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি নবাবি বাংলায় যে ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, বর্তমান বাংলায় সেই একই ভূমিকা গ্রহণ করতে চেয়েছিল বিশ্বব্যাংক। বিশ্বের একমাত্র সুপারপাওয়ার তাতে যে সমর্থন জুগিয়েছে এ ব্যাপারে আজ আর কোনো লুকোছাপা নেই। তবে দুই যুগের দুই ইতিহাসের পার্থক্য এই যে মুর্শিদাবাদের তরুণ নবাব এই চক্রান্ত মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হন এবং ক্ষমতাচ্যুত হন। এ যুগে বাংলাদেশের হাসিনা সরকার গোড়াতেই সেই চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন হয়ে আটঘাট বেঁধে সাহসের সঙ্গে এর মোকাবিলা করেছে এবং একে ব্যর্থ করেছে। তাঁর সরকারের ওপর সুপারপাওয়ারের হুমকিটিও তিনি মোকাবিলা করেছেন এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটিয়েছেন। কিন্তু হুমকিটি এখনো নানা ছদ্মাবরণে রয়ে গেছে।
গত শনিবার শেখ হাসিনা দেশ ও তাঁর সরকারের ওপর সাম্প্রতিক অতীতে যে হুমকি সৃষ্টি হয়েছিল, তা দেশবাসীর জানা থাকলেও আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যে কথাটি বলা হয়তো তিনি প্রয়োজন বোধ করেননি, তা হলো এই দেশি-বিদেশি হুমকি নানা আবরণে তাঁর সরকারের মাথার ওপর এখনো বিরাজ করছে। এই হুমকি যেকোনো সময় বাংলাদেশের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে এবং হাসিনা সরকার এই বিপদ মোকাবিলায় অতি বেশি ব্যস্ত ও তত্পর।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শত্রু যে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ, তাদের সবচেয়ে বড় দলটিকে আমেরিকা সার্টিফিকেট ও সমর্থন দিয়েছিল মডারেট ইসলামী দল হিসেবে। তাদের ক্ষমতায় বসানোর ব্যাপারে অতীতের মার্কিন প্রশাসন মদদ জুগিয়েছে। এই জঙ্গিবাদী এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি বাধা সৃষ্টি করেছে আমেরিকার প্রশাসন ও প্রশাসনের বাইরের একটি শক্তিশালী মহল। মানবতা ও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতার নামে একাত্তরের মানবতার শত্রুদের বিচার ও দণ্ডদান নানাভাবে বিঘ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা এখনো চলছে।
যে পশ্চিমা দেশগুলো বিশ্বসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলে, বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের দ্বারা সৃষ্ট ভয়াবহ সন্ত্রাসের সময় দেখা গেল, তারা সেই সন্ত্রাসের সঙ্গে সংলাপে বসার জন্য হাসিনা সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে বাংলাদেশে আজ পাকিস্তানের, আরো খারাপভাবে হলে ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারত। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ অর্থায়নে বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির উচ্ছেদ, মুক্তবুদ্ধি ও বাক্স্বাধীনতার প্রসারের নামে যে কয়টি সংস্থা ও এনজিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের অধিকাংশের কথাবার্তা, সেমিনার অনুষ্ঠান ও কার্যকলাপ দেখলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, বিভিন্ন গালভরা বুলির আড়ালে হাসিনা সরকারের ক্রেডিবিলিটি ধ্বংস করা তাদের আসল লক্ষ্য। বর্তমান সরকারের জন্য এরাও একটি বড় থ্রেট।
বাংলাদেশে এককালে একটি সাহসী ও মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বা সুধীসমাজ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে যে সুধীসমাজটি গড়ে উঠেছে, প্রচ্ছন্নভাবে তাদের পৃষ্ঠপোষক বিগ এনজিও অথবা বিদেশি কোনো কোনো সংস্থা। এরা গণতন্ত্র ও মানবতার নামে মায়াকান্না কাঁদে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ট্রান্সপারেন্সির কথা বলে, সমাজে সুজনের ভূমিকা গ্রহণের আপ্তবাক্য আওড়ায়। কিন্তু তাদের আসল ভূমিকা হিজ মাস্টার্স ভয়েসের। অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সরকারের বিভিন্ন ভুলভ্রান্তিকে বড় করে তুলে ধরা এবং এর আড়ালে গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক জোটের সব অপকর্ম ঢাকা দেওয়া তাদের অধিকাংশের মূল লক্ষ্য।
একই লক্ষ্যে ‘নিরপেক্ষ মিডিয়া গোষ্ঠী’ নামে একটি মিডিয়াচক্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এদের লক্ষ্য প্রোপাগান্ডার সাহায্যে জনসাধারণকে বোঝানো, গণতন্ত্রের চেয়েও বেশি দরকার গুড গভর্ন্যান্স। রাজনীতিকরা সব দুর্নীতিপরায়ণ। তাই দেশে গুড গভর্ন্যান্সের জন্য অরাজনৈতিক সরকার দরকার। সেটি অনির্বাচিত সরকার হলেও ক্ষতি নেই। এ লক্ষ্যেই এক-এগারোর সময় মাইনাস টু থিওরি উদ্ভাবিত ও প্রচারিত হয়েছিল। তত্কালীন সামরিক নেতারা এই প্রচার করেছেন। কিন্তু এর পেছনে ছিল অসামরিক কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী নেতার ব্রেন। তাঁরা মুখে না বললেও দেশে বিগ এনজিওর দ্বারা চালিত সরকার চান। একটি ব্যাংকের কর্মকর্তার পদ নিয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যক্তিবিশেষের লড়াইয়ের মূল লক্ষ্যও ছিল এটাই। পেছনে ছিল শক্তিশালী বিদেশি সাহায্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সরকারের ওপর তাদের সৃষ্ট হুমকিটি এখনো রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে হেফাজতি অভ্যুত্থান, ভয়াবহ জামায়াতি সন্ত্রাসের সময়েও দেখা গেছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বই যখন বিপন্ন এবং এই অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হাসিনা সরকারকে কিছু কিছু অস্বাভাবিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে, তখন দেশের উল্লিখিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ও মিডিয়ার একটি অংশ সরকারের আপত্কালীন ব্যবস্থাগুলোকে কঠোর সমালোচনা দ্বারা প্রকারান্তরে গণবিরোধী চক্রগুলোকেই সাহায্য জুগিয়েছে। তাদের এই চেষ্টার ফলে যদি সরকারের পতন ঘটত, তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেহারা কী ভয়াবহ রূপ ধারণ করত তা কি এখন কল্পনাও করা যায়? এই বিপদের সময়েও আমাদের সুধীসমাজের বড় অংশ সম্রাট নিরোর মতো নিরপেক্ষতার বাঁশি বাজিয়েছেন।
শেখ হাসিনাকে আজ দশভুজার মতো দশটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ভয়াবহ জঙ্গিবাদের ফ্রন্ট। বিগ এনজিওর দ্বারা প্রতিপালিত একটি সুধীসমাজ ও ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়া গ্রুপের ফ্রন্ট। বিএনপি ও জামায়াতের অপপ্রচারের ফ্রন্ট। জামায়াত সমর্থক একটি আন্তর্জাতিক লবির শক্তিশালী বিরোধিতা ও প্রচারণা। পাকিস্তানের আবার বাংলাদেশবিরোধী প্রকাশ্য ভূমিকা গ্রহণ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আবার দেশি কোলাবরেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নানা ব্যাপারে পশ্চিমা জোটের এখনো অব্যাহত হস্তক্ষেপ। সরকারের ক্ষমতায় থাকার বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের চাপ। বিপর্যস্ত বিএনপিকে আবার খাড়া করার জন্য সরকারের ওপর দলটির সঙ্গে অন্য রকম সংলাপে বসার জন্য দেশি-বিদেশি কায়েমি স্বার্থের চাপ। দেশের দ্রুতগতির উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নে বাধাদানের জন্য প্রভাবশালী স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলগুলোর ক্রমাগত নানা ধরনের চেষ্টা। এ রকম অসংখ্য ফ্রন্টে হাসিনা সরকারকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে আইএস নেই। আইএসের নাম ভাঙিয়ে জামায়াতি উপদলগুলো চালাচ্ছে ব্লগার হত্যা, বোমাবাজিসহ নানা সন্ত্রাস। আমেরিকা এ কথা জেনেও বাংলাদেশে দুজন বিদেশি হত্যার পরই ঘোষণা করে, এটা আইএসের কাজ। উদ্দেশ্য ছিল, আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মধ্যপ্রাচ্যে তারা যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে, উপমহাদেশে তার সম্প্রসারণ। যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির বাজার দুটিরই উপমহাদেশে বিস্তারের ব্যবস্থা করা। হাসিনা সরকার এ অপচেষ্টা ঠেকিয়েছে। কিন্তু আইএসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নামে গঠিত সৌদি অ্যালায়েন্সে যোগ দিয়েছে। এই অ্যালায়েন্সে যোগদান বাংলাদেশের ওপর জঙ্গিদের হুমকি কমানোর বদলে বাড়াতে পারে। এটাও হাসিনা সরকারের জন্য একটা বড় হুমকি। চারদিকের এই হুমকির মধ্যে দাঁড়িয়েই হাসিনা সরকারকে দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষার জন্য লড়াই চালাতে হচ্ছে। দেশ এখনো দেশি-বিদেশি নানা চক্রের নানা ধরনের হুমকি থেকে মুক্ত নয়। এই সত্যটি জনসাধারণের কাছে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার।
আমেরিকার মতো একক সুপারপাওয়ার সম্পর্কে কথা বলা চাট্টিখানি সাহসের কথা নয়। শেখ হাসিনা গত শনিবার সেই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সরকার যে এখনো শুধু ছোট ছোট নয়, বড় বড় ধরনের হুমকির মোকাবিলা করছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত এখনো চলছে, এই সত্যটি দেশবাসীকে তিনি আরো ভালোভাবে অবহিত করুন। সচেতন দেশবাসীর ঐক্যই তাঁকে সব চক্রান্ত ও হুমকি মোকাবিলায় সাহায্য জোগাবে।

You Might Also Like