মার্কিন দূতাবাস ও সু চির মুখে ‘রোহিঙ্গা’ নেই

নিকোলাস ক্রিসটফ

বিশ্ব শিগগিরই দেখবে স্মরণীয় একটি দৃশ্য : সবার প্রিয় একজন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী একুশ শতকের পাঁচ ডজনেরও বেশি বন্দিশিবির পরিচালনা করছেন। বিশ্বের সত্যিকারের বীরদের অন্যতম অং সান সু চি গত নভেম্বরের নির্বাচনে জিতে দেশের জন্য গণতন্ত্র ছিনিয়ে আনেন। তবে আপনাদের অনেকেরই অজানা, সু চি মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার কাজটিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, দেশটিতে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার ওপর যে নিপীড়ন চলছে তা গণহত্যার শামিল। নিরাপত্তা পরিষদে পেশ করা জাতিসংঘের এক গোপন প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যা চলছে, ‘আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে’ তা মানবতাবিরোধী অপরাধ। আরেক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রেসিডেন্ট ওবামাও (২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর যিনি দু-দুবার মিয়ানমার বেড়িয়ে এসেছেন) নির্বিকার এ বিষয়ে; অথচ মিয়ানমারের ওপর তাঁর রয়েছে অসীম প্রভাব। ওবামা ও হিলারি ক্লিনটন মিয়ানমারকে গণতন্ত্র আর পশ্চিমা বলয়ের দিকে প্রলুব্ধ করেছেন। কিন্তু তাতে রোহিঙ্গাদের কী লাভ হলো? করিমসহ অসংখ্য শিশু-কিশোরকে তো আজও ক্ষুধায়, বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাতে হচ্ছে। মিয়ানমারে যে ৬৭টি শিবিরে রোহিঙ্গাদের রাখা হয়েছে সেগুলো আদতে একেকটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এমনই এক শিবিরের বাসিন্দা ছিল ১৪ বছর বয়সী মুহাম্মদ করিম। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিক্রমায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের রাষ্ট্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে। স্বাধীন চলাচলের অধিকার আর তাদের নেই। ফলে দলে দলে রোহিঙ্গারা পালানোর চেষ্টা করছে। করিমের মা সারা হাতু বলেন, তাঁর ছেলে মানবপাচারকারীদের অর্থ দিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়া পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু গোড়ালিতে আঁচড়ের এক ঘটনায় ধনুষ্টঙ্কারে তাঁর মুখ বেঁকে আসে। কারণ শিবিরের আরো অনেক শিশুর মতো করিমেরও টিটেনাস টিকা লাভের অধিকার মেলেনি। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা যখন কাজে এলো না, হাসপাতালে ভর্তির জন্য কর্তৃপক্ষ থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হলো। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দুই দিন পর সারা হাতু শিবিরে ফেরেন সন্তানের লাশ নিয়ে। মৃত্যুর শোক তাদের কুঁড়েঘরের শখানেক গজ দূরে আরেক ঘরেও। ২০ বছর বয়সী বিলদার বেগমের হেপাটাইটিস-এ হয়েছিল। অসুখটি মোটেও প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা না পেয়ে মারা গেছেন বিলদার। আর দুই বছর বয়সেই মাতৃহারা হয় হিরল। স্থানীয় সমাজ নেতা ইউনুস মুনির বলেন, ‘আমরা শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, রোহিঙ্গা না হলে বিলদার বেগমকে মরতে হতো না।’ এখন শিশু হিরলেরও না খেয়ে মরার জোগাড় হয়েছে। আড়াই বছর বয়সে তার ওজন মাত্র ১৯ পাউন্ড। কোনো কোনো রোহিঙ্গা পরিবারের ব্যাংকে কমবেশি অর্থও জমা আছে। তবে ২০১২ সাল থেকে শিবিরে আটকে রাখায় তারা ব্যাংকেও যেতে পারছে না। এর পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাশে পাচ্ছে না রোহিঙ্গারা। তার একটা কারণ হচ্ছে, মানবাধিকারকর্মী বা সাংবাদিকরাও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা সরেজমিন দেখার অনুমতি পান না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপে দু-একটি রোহিঙ্গা শিবিরে মানবাধিকারকর্মীদের যাওয়ার সুযোগ ঘটে। নৌকায় চেপে আমি নিজেও একটি শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখেছি। জাতিসংঘও মিয়ানমারে অকার্যকর। আমার হাতে আসা জাতিসংঘের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংস্থাটির লোকজন মিয়ানমারে পারস্পরিক বিরোধে লিপ্ত। প্রতিবেদনে সন্দেহ ব্যক্ত করে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জাতিসংঘেরও কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে না তো? মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীকেই অস্তিত্বহীন করার চেষ্টা করছে। এ ষড়যন্ত্র থেকেই কর্তৃপক্ষ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে না। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী (যা নির্জলা মিথ্যা; ঐতিহাসিক নথিপত্রেও রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব রয়েছে)। এই নভেম্বরে সরকার ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ২০১৬ সালের ক্যালেন্ডারে রোহিঙ্গাকে একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করার অপরাধে। এমনকি সু চি ব্যক্তিগতভাবে ‘রোহিঙ্গা’ কথাটি কখনো মুখে আনেন না। মিয়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও তাদের নথিপত্রে ‘রোহিঙ্গা’ লেখা এড়িয়ে চলে। মানবাধিকার ফরটিফাই রাইটসের কর্মকর্তা ম্যাথিও স্মিথ বলেন, এ ক্ষেত্রে ‘ওবামা প্রশাসনের দায়টা অনেক বড়’। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক তদন্ত পরিচালনা ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার অবস্থানটি সমর্থন করতে পারে। আমি মনি করি, কোনো সরকার বা কর্তৃপক্ষ একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে যাবে, এ হতে পারে না। শুধু ভিন্ন জাতিসত্তার কারণে শিশুদের আটকে রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া। লেখক : খ্যাতনামা মার্কিন সাংবাদিক, কলামিস্ট; নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিবন্ধটি লেখা হয়

You Might Also Like