স্পর্শের দেয়াল

নূর কামরুন নাহার

পিজি হাসপাতাল সবসময়ই আমার কাছে অন্যরকম। আমার শৈশব, কৈশোর আর তরুণ জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে এই হাসপাতাল। ছোটবেলায় হাসপাতাল বিষয়টা বোঝার আগেই আম্মাকে দেখেছি এখানে। আম্মার সাথে তখন আমি দু একটা দিন পুরো কাটিয়েছি এখানে। তারপর আমার তরুনী জীবনের শুরুতে খুব সুন্দর একটা সময়ের কঠিন দুটো মাস আম্মার সাথে এখানে কাটিয়েছি দিন আর রাত। তখন আমি হাসপাতাল বুঝি, আম্মার সংকটময় অবস্থা বুঝি। বুঝি আমার জগৎ আর আমার বেড়ে ওঠার সৌন্দর্য। এই পিজিতেই আমি প্রথম মা হয়েছি। এভাবে এই হাসপাতাল যেন আমাকে বেধে রেখেছে স্মৃতি , উৎকন্ঠা আর বিমূর্ত বেদনায়।
পিজিতেই আবার রোজার মাসে আব্বাকে নিয়ে আসতে হবে ভাবিনি। দীর্ঘদিন আব্বা অসুস্থ কিন্তু আব্বার চিকিৎসা প্রায় পুরোটাই ল্যাব এইডে করা হয়। ল্যাব এইডে দশদিন রাখার পরও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। তাই নিয়ে আসতে হলো পিজিতে । ডি ব্লকের ষোলতলার মডিসিন বিভাগের মেইল ওর্য়াডের নয় নাম্বার পেইং বেডে আব্বার আজ ১৫ দিন । তার অবস্থা এখন খুব জটিল না হলেও ভালো বলা যায় না।
রোজার মাসে অফিস ছুটি সাড়ে তিনটায়। প্রতিদিন এ সময়টাতেই চলে আসি এখানে। হাসপাতালেই ইফতার করি। বাসায় ফিরি রাত দশটার দিকে। এই ষোল তলাটা খুব সুন্দর। এখানে জানালা দিয়ে দেখা যায় ঢাকা শহরের অনেকটা। যখন বিকেল হয় অদ্ভুত এক চাপা আলোয় আকাশটা ভরে থাকে। ওয়ার্ডের ভেতরটাও আলোয় সোনালী দেখায়। যখন সন্ধ্যা আসে। মেঘহীন ঝকঝকে আকাশটা এতো নীল হয়ে ওঠে যে চোখ ফেরানো যায় না। তারপর সূর্যডুবে লাল আর ধুসর রং নিয়ে। তারপর আকাশ কালো হয়ে যায় ঢাকা শহরের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। জানালা দিয়ে দুরের আরো দুরের বড় বড় বিল্ডিংগুলোর আলো বিন্দুর মতো দেখা । কালোর মধ্যে ওরা জ্বলতে থাকে। কোথাও দেখা যায় নিয়ন সাইনের আলো। লাল নীল বাতি জ্বলে নিভে। অদ্ভুত সুন্দর। ওর্য়াড থেকে বের হয়ে লিফ্টের সামনের যে জানালা ওটা আরো অদ্ভুত। পুরো রমনা, সোহ্রওয়ার্দীর সবুজ গাছগুলো দিয়ে ঢাকা জায়গাটা দেখা যায় এখান থেকে। বিশাল একটা জায়গা সবুজে ঢাকা। এখান দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় না ঢাকায় সবুজের বড় অভাব। এ যেন অন্য এক ঢাকা। সবুজে সবুজে মোড়ানো। অপরুপ এক দৃশ্য। গত পনের দিন ধরে আমি প্রায় প্রতিদিনই সময় পেলে এ জানালায় এসে দাঁড়াই। দেখি দিনের আর রাতের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রুপ। এখানে দাড়িয়ে শাহবাগের মোড় থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউটের দিকে বেঁকে যাওয়া রাস্তাটা বিলবোর্ডের ফাঁক দিয়ে দেখলে হঠাৎ মনে হবে নিচে যেন পাহাড়ী এক বাঁকা পথ কোথায় মিলিযে গেছে। বিকেলের রোদে অপূর্ব হয়ে ওঠে এই গাছগুলো, নিচের রাস্তার গাড়ি আর মানুষগুলো । তখন ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। এই অপরুপ বিকেল, এই সবুজ, নীচে ছোট ছোট গাড়ি মানুষ,সামনের বাঁকানো রাস্তাটা সব কেমন যেন এক রহস্যের আলোর ভেতর বন্দী মনে হয়। জীবনের কত কথা মনে পড়ে। মায়াবী আলোয় মুড়ে থাকা এই ঢাকা শহরটা বুকের ভেতর সযতেœ মুড়িয়ে রাখা স্মৃতিগুলো সেলুলয়েডের দৃশ্যের মতো চোখের সামনে নিয়ে আসে। ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে, অদ্ভুত এক হাহাকার তোলে । এখানে দাঁড়ালে সুন্দরের প্রতি নিমগ্নতা স্মৃতি আর অদ্ভুত বেদনা অনুভত হয় ।
শনিবারে আমার অফিস বন্ধ থাকে কিন্তু হাসপাতাল খোলা থাকে। শনিবারে আমি তাই সকালেই হাসপাতালে আসি। আব্বার অবস্থা নিয়ে অধ্যাপক ও ডিউটি ডাক্তারদের সাথে কথা বলি। গত দু তিন দিনে আব্বার অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে। এখন কথা বলতে পারছেন। নিজের শারীরিক সমস্যাগুলো জানাতে পারছেন। ডাক্তাররা এখন আশাবাদী। ডান কানে আব্বা ব্যথা অনুভব করছেন। সমস্যাটি গলা ও কান বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করা হয়েছে। ডিউটি ডাক্তার একটু আগে আমার কাছে টিটমেন্ট ফাইলটি দিয়ে গেছেন। গলা ও কানের বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে। ঐ বিভাগটি পিজির সি ব্লকে।
পিজির সি ব্লকের পাঁচ তলার নিউরোলজি বিভাগের ফিমেল ওয়ার্ডেই সাতাশি সালে আম্মা ভর্তি হয়েছিলেন। উনআশি সালেই প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে আম্মার ডান সাইড অবশ হয়ে গিয়েছিলো। সাতাশি সালে আম্মা আবার স্ট্রোক করেন। তখন এখানে দুই মাস ভর্তি ছিলেন। আম্মার সাথে আমিও রাত দিন দুইমাস এখানে থেকেছি। তখন আমি ষোড়শী। পড়ছি সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে, ইন্টারমিডিয়েট র্ফাস্ট ইয়ারে। ওই দুই মাস সময়টা আমার জন্য অন্য রকম অভিজ্ঞতর। সময়টা আমার মনের এবং শরীরের আমূল পরিবর্তনের। তখন আমি অদ্ভুত এক ঘোর আর কুয়াশার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। জীবনের সবকিছুই আমার চোখে রঙিন, রহস্যময় আবার ভয়ের। ভেতরে সারাদিন কি এক কলকল গান। কিন্তু এই গান অপ্রকাশ্য। নিজের ভেতর নিজের ভেঙ্গেচুরে পড়া আর ভালোলাগার অদ্ভ’ত এক খেলা। নিজেকেই নিজের অচেনা লাগা ঘোরলাগা এই সময়টায় আমি হাসপাতালে আম্মার পাশে। এখানে আবার চোখের সামনে দেখছি নতুন এক জগৎ। জীবন আর মৃত’্যর দোলাচল। প্রতি মুহূর্তে জীবনের জন্য হাহাকার। জীবনের জন্য লড়াই। সুস্থতার জন্য আকুলতা। জীবনের অন্য এক বাসর।
এই নিউরোলজী বিভাগে যারাই রোগী হয়ে আসেন তাদের প্রায় সবাইকেই দীর্ঘদিন থাকতে হয়। তাই ওয়ার্ডের রোগীরা পরষ্পরের কেমন আপন হয়ে যায়। এটেনডেন্টরাও আপন হয়ে যায়। ঘর সংসার ফেলে আসা মানুষগুলোর সাথে এখানে গড়ে ওঠে আরেক মায়ার জগৎ। এখানে অনেকের সাথেই আমারও খুব আন্তরিকতার সম্পর্ক। আমি খুব স্বল্পভাষী তবু কেমন করে সবার খুব আপন হয়ে যাই। আম্মার ঠিক উল্টোদিকের বেডের রোগী একজন নার্স। কোমরে টিউমার হয়ে নিচের দুই পা অবশ হয়ে গেছে। মাত্র একবছর হয় বিয়ে হয়েছে। ওর বর এই হাসপাতালেরই ওর্য়াড মাস্টারের ভাই। ওদের বাড়ি যশোরে। রাগীর সাথে রোগীর বোন থাকেন। যশোর থেকে এসেছেন। দুই বোনই বেশ আলাপী, মিশুক। তবে মাঝে মাঝেই রোগীর বেশ ব্যথা হয়। তখন ঝিম মেরে ব্যথা সহ্য করেন তিনি। নার্স বলে কি না জানি না। অনেক ধৈর্য ওনার। তরুণ ওর্যাড মাস্টারও প্রায় আসেন ভাবীকে দেখতে। আমাকে দেখেন আড়ে আড়ে। চোখে মুখে মুগ্ধতার ঘোর। সামনাসামনি বেড বলে মাঝে মাঝেই আমার চোখ পড়ে যায়। রোগী আর রোগীর বোন আমাকে ডেকে নেন ওদের মধ্যে। আমার সাথে ওরা গল্প করতে চায়। আমি লাজুক বলে গল্প করতে পারি না। ওরা তিনজনে মিলে নানা কথা বলেন। আমি শুনি , মাঝে মাঝে সামান্য কিছু বলি। এভাবে ওদের সাথে আমার একটা অন্যরকম সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো দিন দুপুরে আমাকে চাচার বাসায় যেতে হয় । আম্মার জন্য ঔষধ আনতেও প্রায়ই বাইরে যেতে হয়। ভিজিটিং আওয়ার ছাড়া হাসপাতালে ঢোকার বিষয়ে বেশ কড়াকড়ি আছে। কিন্তু ভিজিটিং আওয়ার ছাড়াও আমার যাওয়া আসায় কোনো সমস্যা হয় না। আমি গেটে আসলেই ওয়ার্ড মাস্টার মিষ্টি হেসে আড়ে আড়ে তাকান। আমার কুশল জিজ্ঞেস করেন। তারপর গেট ছেড়ে দেবার নির্দেশ দেন। এভাবে বেশ কয়েকবার আসা যাওয়ায় গেটের দারোয়ানরাও আমাকে চিনে ফেলেছে। আমাকে এখন প্রায়ই গেটে আর কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না।
একবারে কোনার দিকের রোগীর বয়স আম্মার মতোই। আম্মার মতোই এক হাত এক পা অবশ। আম্মার ডান সাইড ,ওনার বাম সাইড। ওনিও পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ। এসেছেন খুলনা থেকে। ওনার মেয়ে এ্যানি আপার সাথে আমার বেশ ভাব হয়েছে। যদিও উনি আমার থেকে বয়সে বড় তবু আমরা বন্ধুর মতোই কথা বলি। রাতে এ্যানি আপা থাকেন না। তখন খালাম্মাকে আমি দেখি। কিছু প্রয়োজন হলে খলাম্মাও আমাকে ডাকেন। মাঝে মাঝেই তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন। রাতে দেখি বলে অনেক দোয়া করেন। আম্মার দুই বেড পরের রোগীর বয়স আবার খুব কম। আমার চেয়ে সামান্য বড় হবে। নাম জোৎ¯œা। জোৎ¯œার মতই রুপ। দুধে আলতায় গায়ের রং,একবারে গোলাপী। বিয়ে হয়েছে চার মাস। ম্বামী বিদেশে থাকে। হঠাৎ অবশ হয়ে গেছে কোমরের নিচের অংশ। বিয়ের পর স্বামী মাত্র একমাস ছিলো। তারপরই বিদেশে চলে গেছে। আসবে সামনের বছর। প্রতিদিন উৎকন্ঠায় থাকে জোৎ¯œা সেই কষ্ট আমাকে বলেÑযদি ভালো না হয় তাহলে? স্বামী কি তাকে মেনে নেবে? জোৎ¯œা এখন একটু ভালোর দিকে। আমি ওকে অনেক প্রবোধ দেই, আশা দেই। জানি না মিথ্যে স্বান্ত¦না দেই কি না কিন্তু মনে প্রাণে চাই জোৎ¯œার মতো মেয়েটা ভালো হয়ে যাক। ও সুন্দর করে সংসার করুক।
আমরা এই সব ভাগ্যহীন সমব্যথী মানুষ গুলোই শুধু হৃদ্যতার বন্ধনে বাঁধা নই। এখানের ওর্য়াড বয় আয়া , নার্স ,ডিউটি ডাক্তার, পাশের মেল ওয়ার্ডের মহিলা এটেনডেন্ট সবার সাথেই আমাদের মায়ার আর আন্তরিকতার সম্পর্র্ক। এখানে আমরা সবাই এসেছি প্রিয়জনদের নিয়ে । আমাদের একটাই কামনা কবে হাসপাতাল ছেড়ে যাবো, কবে আমাদের প্রিয় মানুষগুলো সুস্থ হবে। আমাদের কষ্ট , লক্ষ্য , আশা আর স্বপ্ন অভিন্ন। আমরা তাই খুব স্বল্প সময়েই ষ্পরষ্পরের খুব কাছাকাছি এসে গেছি।
এই রকম একটা মায়া এবং অন্তরঙ্গতার বন্ধন ছাড়াও আমার বিশেষ বয়সটার কারণে আরো কিছু মানুষের সাথে আমার অভিনব ও অদ্ভুত একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আম্মার অসুস্থতা আমাকে খুব চিন্তিত রাখে। আম্মাও আমার এক মুহুর্তের অনুপস্থিতি সহ্য করতে পারেন না। অস্থির হয়ে ওঠেন। বলা যায় সারদিন আম্মার শিয়রের কাছেই বসে থাকি। আম্মাকে আমি খুব ভালোবাসি। আম্মার অসুস্থতার উৎকন্ঠা আর আম্মার সুস্থতার চিন্তা ছাড়া পৃথিবীর আর কিছুই আমি এখন ভাবি না। অন্য কোনো দিকে লক্ষ্যও করি না। আমার যৌবনের জেগে ওঠা মনের কোনো শব্দও শুনতে পাই না। কিন্তু আশেপাশের জগৎ আমাকে দেখে, দেখে একটা ষোড়শী মেয়েকে। মেল ওয়ার্ডের এটেনডেন্ট, ফিমেল ওয়ার্ডের নিয়মিত দর্শনার্থী,এটেনডেন্টরা আমাকে দেখে, চারপাশে হেঁটে চলা তরুণরা আমাকে দেখে । মাঝে মাঝে আমি টুকরো টুকরো কাগজে নামহীন প্রেমপত্র পাই। কোনো কোনো চিঠির ভেতর থাকে তাজা ফুলের পাপড়ি, কেউ কেউ আমার যাতায়াত পথে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি আর্কষণের চেষ্টা করে। কেউ কথা বলতে চায়। যতই নির্লিপ্ত থাকি। আমার অসুস্থতা যতই আমাকে গ্রাস করে রাখুক। আমি বয়েসের স্বাভাবিক ধর্মকে অস্বীকার করতে পারি না। এইসব চিঠি আমি খুব ভীরু ভীরু হাতে খুলি। দুরু দুরু বুকে পড়ি। এইসব চিাঠর উত্তর দেবার প্রশ্নই ওঠে না। এগুলো সংগ্রহে রাখারও কোনো যুক্তি নেই। তবু কিছু চিঠি আমি লুকিয়ে রাখি। গোপনে পড়ি। অদ্ভুত এক অনুভূতি আমার বুকে এসে ধাক্কা দেয়। আমি সেইসব ঢেউ আর নুতন প্রাপ্ত গোপনীয়তার আনন্দ ও শিহরণ নিয়ে আরো ভীরু বুকে আরো জমে বসে থাকি আম্মার শিথানের কাছে।
সাতাশি সালে যথেষ্ট খারাপ রোগী হওয়া সত্ত্বেও আম্মা ধীরে ধীরে অনেকটাই সেরে উঠেছিলেন। যখন ভর্তি হয়েছিলেন তখন বসতে পারতেন না , কথাও বলতে পারতেন না। আম্মার বেড নম্বর ছিলো এক। বেডটা কোনার দিকে দেয়ালের সাথে লাগানো ছিলো। প্রায় একমাস চিকিৎসার পর আম্মা সেই দেয়ালে হেলান দিয়ে বসতে পারতেন। তার কিছুদিন পর অষ্পষ্ট স্বরে কথাও বলতে পারতেন। বসতে আর কথা বলতে পেরে আম্মার সে কি উচ্ছ্বাস। দুটো চোখ খুশিতে চকচক করতো। অস্ফুট সেই সব কথার বেশির ভাগ আম্মা আমার সাথেই বলতেন, যখন দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকতেন তখন নির্ভরতার জন্য আম্মা আমার একটা হাত ধরে রাখতেন।
ধীরে ধীরে অনেকটা সেরে ওঠার পর দুই মাস অতিক্রান্ত হলে আমরা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাই। হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার দিনটি ছিলো মিশ্র প্রতিক্রিয়ার। আম্মাকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি সেই খুশি,আবার এতাদিনের পরিচিত জনদের ছেড়ে যাচ্ছি তাদের সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা সে বেদনার ভার দুটোই আমাকে খুব বিহ্বল করে রেখেছিলো। যেদিন হাসপাতাল থেকে চলে আসি সেদিন অনেকেই আমাদের বেড এর কাছে সকাল থেকে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকের সাথেই আমরা ঠিকানা বিনিময় করেছিলাম। যে সব তরুণেরা আমাকে দেখতেন তারাও বোধহয় অন্তরে ব্যথা পাচ্ছিলেন। তাদের সাথে আমার সরাসরি কথা হয়নি । কিন্তু চোখে চোখ পড়েছে বহুবার। আমাদের বেডের সামনের জানালায় সকাল থেকেই তাদেরও আমি দেখছিলাম। আমাদের এগিয়ে দিতে লিফ্ট পর্যন্ত অনেকেই এসেছিলেন। সেই সব যুবক ও তরুণেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো লিফ্ট বরাবর সামনের বারান্দায়। লিফ্ট বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সবাই তাকিয়েছিলো। আমিও তাকিয়ে ছিলাম চোখের সামনে থেকে সব কিছু মুছে যাওয়া পর্যন্ত। কাদের যেন চিরজীবনের জন্য এখানে রেখে যাচ্ছি। ওরা যেন আমার কে ছিলো? হৃদয়ের খুব নিভৃতের, খুব কাছের কিছু সঞ্চয় ফেলে যাচ্ছি। আম্মাকে বাসায় নিয়ে আসার আনন্দ ছিলো অপরিসীম। তারপরও বেশ অনেকদিন আমি হাসপাতালের দিনগুলোকে খুব গভীরভাবে অনুভব করেছিলম। ওই দুইমাস আমি জীবনে কোনোদিনই ভুলতে পারিনি।
আব্বার ফাইল নিয়ে বহুদিন পর আসতে হলো সি ব্লকের গেটে। স্মৃতি যেন আমাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরলো । থরথর করে কেঁপে ওঠলো আমার সমস্ত শরীর। যেন এখুনি জীবন্ত হয়ে ওঠবে চব্বিশ বছর আগের সেই অতীত। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি ষোল বছরের আমি। গেটের পাশের টেবিলে বসা সেই ওর্য়াড মাস্টার । মুচকি হেসে মুগ্ধ নয়নে আড়ে আড়ে দেখছেন আমাকে। আমি হেঁটে যাচ্ছি। দেখা না দেখার ভান করে সিঁড়ির আশে পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু একজন যুবক। আমার সাথে দেখা হতেই ওরা চোখ নামিয়ে নেবে। লাজুক আমি মাথা নিচু করে দ্রুত পাশ কাটাচ্ছি। ভেতরে আমার ঢেউ খেলে যাচ্ছে জীবনের প্রথম প্রভাত, যৌবনের প্রথম অনুভ’তির ভালো লাগা, শিহরণ।
তিনতালায় আসি। ডাক্তারের কাছে আব্বার ফাইল দেখাই। তারপর ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙ্গে আসি পাঁচতলায়। বুকের ভেতরটা আবার প্রচন্ড কাঁপতে থাকে। সেই বারান্দা, বারান্দার সেই রেলিং, এইখানে কত দাঁড়িয়েছি। সামনের বারান্দায় এসে দাঁড়াই। যেখানে দাঁড়িয়ে দেখেছি সামনের রাস্তার মানুষ আর গাড়ি। না , এখন আর দেখা যায় না। ডি ব্লকের উঁচু মাথা ঢেকে দিয়েছে সেই রাস্তা। বারান্দা পেরিয়ে আস্তে আস্তে আসি ওয়ার্ডের দিকে। সেই ডিউটি রুম তেমনি আছে। নার্স ডাক্তারদের ছুটোছুটি। সব একই রকম আছে। আমার বুক ধপধপ করতে থাকে। আম্মা কি দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে বসে আছেন? আমাকে দেখে অল্প অল্প হাসবেন এখন। আমি চারপাশে গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকি। সেই নতুন বিবাহিতা নার্স, খালাম্মা ,সেই এ্যানী আপা, জোৎ¯œাকে খুঁজি। ওরা সবাই কি যার যার বেডের কাছে? আমাকে ওয়ার্ডের চারপাশে এভাবে তাকাতে দেখে একজন নার্স এগিয়ে আসে
কাউকে খুঁজছেন?
এটা আগে নিউরোলজি বিভাগের মহিলা ওর্য়াড ছিলো না?
এটা? না তো?
হ্যাঁ ছিলো।
এটা তো নিউরোসার্জারি বিভাগের পুরুষ ওর্য়াড। আমি তো দশবছর তাই দেখে আসছি।
এখানে এক সময় আমার আম্মা ভর্তি হয়েছিলেন?
কবে বলুন তো?
চব্বিশ বছর আগে।
নার্স আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
আমি একটু এগিয়ে যাই । আম্মার বেডের কাছে দাঁড়াই।
বেডে একজন রোগী ঘুমিয়ে আছে। নিউরোসার্জারির রোগী। ঘুম নিশ্চয় খুব প্রয়োজন। তাকে কোনোভাবেই বিরক্ত করা চলে না । টুলে বসে আছে একজন মহিলা । উনি মুখ তুলে আমার দিকে তাকান।
আমি প্রায় ফিসফিস করে বলিÑএই বেডেই আমার আম্মা ছিলেন। আমি এখানে একটু দাঁড়াতে চাই। আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে?
মহিলা একটু নরম করে বলে-
না না ঠিক আছে ।
বেডের পাশের সেই মোজাইক করা কেবিনেট ঠিক তেমনি আছে। এই কেবিনেটের ভেতরে আম্মার জন্য হরলিকস, দুধ, গ্লাস বাটি , প্লেট,আমার চায়ের কাপ রাখতাম। ওরাও নিশ্চয়ই রেখেছে। দেখেই বুঝতে পারি এ বেডগুলো নতুন আধুনিক। চব্বিশ বছর আগের বেড না থাকারই কথা। তবু আমি বেডটায় গাাঁ ঘেষে দাঁড়াই। শ্বাস টেনে গন্ধ নেই। ডেটল মিশ্রিত গন্ধটা আগের মতোই।
আম্মা দেয়ালটার যেখানে ঠেস দিয়ে বসতেন আমার একটা হাত ধরে রাখতেন সেখানে চোখ রাখি। বুঝতে পারি এ দেয়ালটা বহুবার রঙ করা হয়েছে। এখানে আম্মার ষ্পর্শ আর গন্ধ থাকার আর কোনো সম্ভবনাই নেই। তবু যে জায়গায় আম্মা পিঠ ঠেকাতেন। তারপর গলা টান করে মাথাটাকে উঁচু করে দেয়ালে ঠেকিয়ে বসতে পারার আমার দিকে তাকিয়ে আনন্দে হাসতেন। সেই জায়গাটায় আমি হাত বুলাই। গভীর ষ্পর্শ রাখি। আমি আমার স্মৃতির মিনার ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। ষ্পর্শের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি।

You Might Also Like