যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামাতঙ্ক

মঈনুল আলম

যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ১ শতাংশ মুসলিম। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমরা সংখ্যাগুরু শ্বেতাঙ্গ মার্কিনিদের সমাজের মধ্যে সম্পূর্ণ সুসংহতভাবে মিশে যেতে পেরেছে, অনেক পাশ্চাত্য দেশে মুসলিম অভিবাসীরা এখনো যা পারেনি। তবুও সদ্যবিদায়ী বছরটিতে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান ইসলামাতঙ্ক এবং মুসলিমদের প্রতি অন্যায় ও অবাঞ্ছিত আচরণ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিউ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’র ‘পাবলিক রিলিজিয়ন রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ ডিসেম্বরে যে পরিসংখ্যন প্রকাশ করেছে তাতে বোঝা যায়, মুসলিমরা ক্রমবর্ধমানভাবে শে^তাঙ্গ আমেরিকানদের অসহিষ্ণুতা, ভ্রান্ত ধারণা এবং প্রতিরোধমূলক আচরণের সম্মুখীন হচ্ছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদগুলোতে মুুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে ১ শতাংশের অর্ধেকেরও কম।
আমেরিকার জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ তাদের ভাষায় ‘ইসলামি সহিংসতা’ নিয়ে ‘দারুণভাবে’ উদ্বেগ প্রকাশ করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে ‘বহু মানুষের হত্যাকাণ্ড’ (মাস কিলিং) হয়েছে, তার ৯০ শতাংশ ঘটিয়েছে অমুসলিমরা।
জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ মনে করে যে, আমেরিকানদের যে সমাজ-জীবন তার সাথে ইসলাম সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির শতকরা ৭৬ জন সদস্য মনে করে, মার্কিনিদের জীবনধারার সাথে ইসলাম খাপ খায় না। জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ মনে করে, যেকোনো মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবে না। অবশ্য তাদের চোখের সামনে নিঃসন্দেহে এক মুসলিম পিতার সন্তান বারাক ওবামা দু-দু’বার বিপুল ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের দশটি অঙ্গরাজ্যে মুসলিম এবং ইসলামকে উদ্দেশ করে আইন পাস করা হয়েছে অথবা পাস করার জন্য খসড়া আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। যেহেতু কোনো ধর্মের প্রতি কটাক্ষ অথবা অসাম্য প্রকাশ করা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী, সেহেতু উপর্যুক্ত আইন এবং আইনের খসড়া যুক্তরাষ্ট্রের আদালতকে ‘বিদেশী প্রভাব বিস্তার থেকে রক্ষা করার জন্যই’ প্রণীত হয়েছে বলে কারণ দেখানো হয়েছে। ব্রুকলিনের আইনজীবী ডেভিড ইয়েরুশালমি প্রচার অভিযান চালান- ‘সরকারকে উৎখাত করার এক ইসলামি ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে শরিয়া এবং তাই শরিয়াকে নিষিদ্ধ করার জন্য তিনি কতকগুলো ‘মডেল আইনে’র মুসাবিদা প্রকাশ করেন। এই মুসাবিদাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই অঙ্গরাজ্যগুলোতে শরিয়া প্রতিরোধক আইনগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
আরিজোনা অঙ্গরাজ্যে ‘ফরেইন ডিসিশন অ্যাক্ট’ নামে প্রণীত আইনে শরিয়া এবং অন্যান্য বিদেশী আইনকে নিষিদ্ধ করেছে। ক্যানসাস অঙ্গরাজ্যে কোনো বিদেশী অথবা ধর্মীয় আইন ভিত্তিতে রায় প্রদান বিচারকদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাউথ ড্যাকোটা অঙ্গরাজ্যে কোনো বিদেশী আইন উল্লেখ করে তাদের আওতায় কোনো বিচারে রায় দেয়া বিচারপতিদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
টেনেসি অঙ্গরাজ্যে কোনো বিদেশী আইন উল্লেখ করে রায় দেয়া থেকে বিচারকদের বিরত করা হয়েছে এবং একটি আইন বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে, যার আওতায় কোন কোন এলাকাকে ‘গমন নিষিদ্ধ’ এলাকা বলে ঘোষণা করা যাবে, যা প্রকারান্তরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে।
মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে শরিয়াসহ কোনো বিদেশী আইন বিবেচনা করে রায় দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যে শরিয়া নিষিদ্ধ করার জন্য রাজ্যের সংবিধান সংশোধন করা হয়। পরে একটি ফেডারেল কোর্ট এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন। লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে আদালতে ‘আন্তর্জাতিক আইন’ বিবেচনা নিষিদ্ধ করে আমেরিকায় এই প্রথম এ ধরনের একটি আইন পাস করা হয়েছে। নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যে ‘পারিবারিক আইন মোকদ্দমা’য় বিচারকদের শরিয়া বিবেচনা করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আলাবামা অঙ্গরাজ্যে শরিয়া নিষিদ্ধ করে রাজ্যের সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে আইন পাস করা হয়েছে, যার ফলে পারিবারিক আদালতে শরিয়া এবং কোনো বিদেশী আইন বিবেচনা ও প্রয়োগ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রবল বিতর্কের পর আইন থেকে ‘শরিয়া’ শব্দটি তুলে ফেলা হয়েছে।
‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (Council on American-Islamic Relations CAIR)-এর গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ম্যানেজার রবার্ট ম্যাকগ্র বলেন, ‘রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের তীব্র (মুসলিমবিরোধী) বক্তব্য সত্ত্বেও আইনপ্রণেতারা তাদের মুসলিম ভোটারদের অভাব-অভিযোগ ও বক্তব্যের প্রতি অধিকতর মনোযোগী হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘ইসলামাতঙ্ক আমাদের ঘিরে ধরেছে। কিন্তু আমি মনে করি, মুসলিমদের প্রতি বিরাট সমর্থন রয়েছে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘মুসলিমদের প্রতি এই না-বোধক মনোভাবকে আমেরিকা কাটিয়ে উঠতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাশাবাদী নই এবং এ কারণেই আমরা প্রতিদিন আমাদের প্রতিষ্ঠানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবাসী

You Might Also Like