মধ্যযুগ এতো রক্ত দেখেছে কখনো?

কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘মধ্যযুগ এতো রক্ত দেখেছে কখনো?’ মধ্যযুগ এত রক্ত দেখেছে কি না জানি না, কিন্তু একুশ শতকের এই প্রথম যুগ যে তা দেখছে, তার প্রমাণ বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের শেষদিকে ঢাকার সূর্য সেন হল থেকে সাতজন ছাত্রনেতাকে অপহরণ করে মুহসীন হলে এনে হত্যা করা হয়েছিল। তারপর ৪০ বছর কেটে গেছে। রক্তপাত থামেনি। বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, সাংবাদিক নির্বিশেষে হত্যাকাণ্ড চলেছে। চলেছে হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস। তারপর সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে সাত ব্যক্তিকে অপহরণ করে নির্মম হত্যা ও লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া। মধ্যযুগ অনেক রক্ত দেখেছে। কিন্তু সভ্য যুগের এই বর্বরতা দেখেছে কি?

অনেকে বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জের এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি। এটা ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের স্বার্থদ্বন্দ্বের নির্মম পরিণতি। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা হিসেবে যে নূর হোসেনের নামে অভিযোগ উঠেছে, তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা। যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদেরও অধিকাংশই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই অবস্থায় দুয়ে দুয়ে চার মেলানো যেমন সহজ, তেমনি এই হত্যাকাণ্ড ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের ফল বলে ধরে নেওয়াও সহজ। আমিও তাই ধরে নিয়েছিলাম এবং আমার দু-দুটি লেখায় (ঢাকার অন্য দুটি দৈনিকে প্রকাশিত) সেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম।

কিন্তু আমার এই অনুমান সম্পূর্ণভাবে সঠিক প্রমাণিত হয়নি। এখন অভিযোগ উঠেছে, র‌্যাবের একজন অফিসার ও কতিপয় কর্মকর্তা অভিযুক্ত নূর হোসেনের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা ঘুষ খেয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অভিযোগটি এসেছে নিহত সাত ব্যক্তির অন্যতম নজরুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে। র‌্যাব কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি অস্বীকার করেছে এবং এ ব্যাপারে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। পরে জানা যায়, র‌্যাব একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে র‌্যাবের মহাপরিচালক জানিয়েছেন। এখন গোটা ঘটনাটি সম্পর্কেই যা ভাবা হচ্ছিল, তার মোড় ঘুরে গেল। তবে ঘটনাটি সম্পর্কে মূল সন্দেহ দূর হয়নি।

এই সন্দেহ হলো, র‌্যাব যদি ক্ষমতাসীন দলের এক গ্রুপের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে অন্য গ্রুপের লোকদের ওপর হামলা করে থাকে, তাতে ক্ষমতাসীন দলের দুই গ্রুপের স্বার্থদ্বন্দ্বই এর পেছনের মূল কারণ বলে মনে হবে। নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছেন, নূর হোসেন এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অবৈধ কাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর স্বামী এসবের প্রতিবাদ করায় তাঁদের দুজনের মধ্যে বিবাদ ছিল। তাঁর স্বামীকে ইতিপূর্বে একাধিকবার হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে।

এই অভিযোগ কতটা সঠিক, তা এ মুহূর্তে বলা কঠিন। কিন্তু অভিযোগটি গুরুতর। এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আরো গুরুতর। র‌্যাবের মহাপরিচালক এই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেন। কিন্তু তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ একটি তদন্ত অনুষ্ঠান দ্বারা প্রমাণ করতে হবে, এ অভিযোগ সত্য নয়। তা না হলে সন্দেহের তীর র‌্যাবের দিকে থেকেই যাবে এবং দেশ-বিদেশে র‌্যাবের ক্রেডিবিলিটি ধ্বংস হবে।

বিএনপি-জামায়াতের গত সরকারের আমলে মূলত দেশে ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস ও গুরুতর অপরাধ দমনের জন্য যখন র‌্যাব গঠিত হয়, তখন দেশের মানুষের মনে এক ধরনের স্বস্তি ও সন্তোষ দেখা দিয়েছিল এই ভেবে যে যা হোক দেশময় সন্ত্রাসীদের অবাধ তৎপরতা বন্ধ করার জন্য শেষ পর্যন্ত একটি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলো। র‌্যাবের সন্ত্রাস দমন অভিযান যেমন প্রশংসিত, তেমনি বিতর্কিতও হয়েছে। ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসীদের নিহত হওয়া সব সময় সবাই সমর্থন করেননি। বলেছেন, তাদের বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করেছেন অনেকে। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও সে জন্য অভিযোগ উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনা সরকারের জন্য একটি বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ কতটা সঠিক, তা এখন বলা না গেলেও জনমনের ক্ষোভ ও সন্দেহ দূর করার জন্য সরকারকে নারায়ণগঞ্জ থেকে র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেককে অপসারণ করতে হয়েছে। দেশের বিশিষ্টজনদের একটি সংস্থার দাবি ছিল অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জ থেকে সম্পূর্ণভাবে র‌্যাব সরিয়ে নেওয়ার। এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর অরাজনৈতিকভাবে নারায়ণগঞ্জে যে হরতাল ডাকা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। তাতেও এ ঘটনায় জনমনের প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

সরকার এখন কী করবে? ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগটি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আদেশ দিয়েই দায়িত্ব পালন শেষ করবে; না এই ঘটনার উৎসমূলে হাত দেওয়ার সাহস দেখাবে? এই উৎসমূল হচ্ছে আওয়ামী লীগ দলের মধ্যেই আত্মঘাতী গ্রুপিং, দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংঘাত। এটা এখন প্রবল আকার ধারণ করেছে। বিএনপি-জামায়াতের কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার পর নানা ধরনের সামাজিক অপরাধী এ দলের ভেতর আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মধ্যে চাঁদাবাজ, অবৈধ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী যেমন আছে, তেমনি তাদের মধ্যে আছে প্রবল স্বার্থদ্বন্দ্বও। এই স্বার্থদ্বন্দ্বে নিত্যনতুন সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে দেশের বিভিন্নস্থানে।

গোঁদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো আওয়ামী লীগে এখন দলে দলে জামায়াতি যোগদান করছে এবং এক শ্রেণির প্রতিমন্ত্রী ও এমপি তাদের সাদরে দলে বরণ করে নিচ্ছেন। এরা কখনো প্রকৃত আওয়ামী লীগার হবে না, হবে ট্রয়ের ঘোড়া। বিএনপিকে জামায়াত যেমন গ্রাস করেছে, তেমনি আওয়ামী লীগকেও করতে চাইবে। ফলে যাচাই-বাছাই ও কোনো স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা না করে এই যে দলে দলে জামায়াতিদের আওয়ামী লীগে গ্রহণ করা হচ্ছে, তাতে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুরূহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। এই সংগঠনের সন্ত্রাসীরা যদি এখন বিপদ দেখে আওয়ামী লীগে ঢুকে আশ্রয় পেতে চায় এবং তাদের দুর্বৃত্তপনা দ্বারা আওয়ামী লীগের সুনামও ধ্বংস করে, তাহলে তাদের দোষ দেওয়া যাবে?

দেশে নারায়ণগঞ্জের মতো ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সর্বত্র এই সন্ত্রাস অব্যাহত না থাকে, সে জন্য সরকারকে দলের ভেতরে ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রশাসনেও শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পারবেন কি? যদি পারেন, তাহলে তাঁর সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য যে সামাজিক শান্তি ও জননিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার, তা তিনি করতে পারবেন। আর যদি তা না পারেন, তাহলে ভারতের মনমোহন সরকারের মতো দুর্নীতি, মহাদুর্নীতি ও অপশাসনের পর্বতপ্রমাণ অভিযোগ মাথায় নিয়ে ক্ষমতা থেকে তাঁদের বিদায় নিতে হবে। আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা তাঁদের জন্য দুঃসাধ্য হবে দেশের অনেক উন্নয়ন করা সত্ত্বেও।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনা আওয়ামী লীগ সরকারের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাদের আত্মসন্তোষ দূর হওয়া দরকার এবং বোঝা উচিত, দেশের মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নিরাপত্তা দিতে হলে সরকারকে এখন দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে। একটি দলের ভেতরে এবং অন্যটি প্রশাসনে। দলের ভেতরের যুদ্ধটিই হবে কষ্টকর। মার্গারেট থ্যাচারের ভাষায় এরা ‘এনিমি উইদিন’ (ভেতরের শত্রু)। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বড়ই শক্ত। ইতালির এক প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ‘মাফিয়াতন্ত্রের অত্যাচার থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য আমাকে বলা হচ্ছে। আমি তা করতে চাই। কিন্তু আমার দলের ভেতরেই যে মাফিয়াতন্ত্র এসে ঘাঁটি গেড়েছে, তাদের আমি কী করে তাড়াব?’

দেশের মানুষকে শান্তি ও স্বস্তি দিতে হলে শেখ হাসিনাকে প্রথম দলের ভেতরে ঘাঁটি গেড়ে বসা ও ভয়াবহ স্বার্থদ্বন্দ্বে লিপ্ত এই মাফিয়া গ্রুপগুলোকে দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। তাদের অপরাধের বিচার ও কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে কিবরিয়া হত্যা, ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া বা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো নারায়ণগঞ্জের এই সাত ব্যক্তির নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে দেশে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসবে না। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও রোধ করা যাবে না।

সরকারকে র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগটিও কঠোর নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত করে দেখতে হবে। তদন্তে যদি দেখা যায় অভিযোগটি সত্য, তাহলে দোষী কর্মকর্তাদের শুধু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া নয়; গোটা র‌্যাবকেই পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। র‌্যাবের কাঁধেই এখন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খণ্ডন ও মিথ্যা প্রমাণ করার। নইলে দেশবাসীর সমর্থন ও আস্থা তারা হারাবে। শুরু থেকেই র‌্যাবের বিরুদ্ধে অনেক বিতর্কমূলক কাজের অভিযোগ উঠলেও সাধারণভাবে র‌্যাবের অনেক কাজ দেশের মানুষের কাছে প্রশংসিত। র‌্যাব দেশে সন্ত্রাস দমনে ও দেশের মানুষের জীবনে স্বস্তি ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখন যদি দেখা যায়, তারাই সেই জনজীবনের শান্তি ও নিরাপত্তার বিঘ্ন উৎপাদনকারী দল, তাহলে মানুষের আশা ও ভরসার স্থলটি ধ্বংস হবে এবং সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেবে।

উৎকোচ নিয়ে র‌্যাব মানুষ হত্যা করেছে, এই অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক জীবনের অবক্ষয় ও পচন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সে জন্যই র‌্যাব কর্তৃপক্ষকে বিনীত অনুরোধ জানাই, তারা এই অভিযোগ যে সত্য নয়, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করুক। আর অভিযোগটি প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের এমন শাস্তি দিন যাতে র‌্যাবের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায়।

নারায়ণগঞ্জের হত্যাকাণ্ড থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করা কোনো মহলেরই উচিত নয়। বরং সব মহল সমবেতভাবে এই অপরাধের সঠিক তদন্ত ও তদন্ত শেষে অপরাধীদের কঠোর শাস্তিদানের আওয়াজ তুলুক। শেখ হাসিনা দেশে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার জন্য সব দলমতের মানুষের গোলটেবিল বৈঠক ডাকুন এবং উপায় নির্ধারণ করুন।

You Might Also Like