গুমপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

‘গুমপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’- এটাই বোধহয় আমাদের সরকারের এখন প্রধান পরিচয় হতে চলেছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সুরক্ষা প্রদানের সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু সেই অধিকারের হরণকর্তাও রাষ্ট্র আজ স্বয়ং! দেশের নাগরিকের যদি স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা না থাকে তাহলে তার দায় অবশ্যই সরকারের ওপরই বর্তাবে। রাষ্ট্র তার এই সাংবিধানিক দায় কোনো অজুহাতেই এড়াতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউই আইন বা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। সে যে পর্যায়েরই হোক। এটাই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূলমন্ত্র।

মানুষ এক সময় নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে গুহায় বাস করত। নিরাপত্তার প্রয়োজনেই মানুষ গুহা থেকে বের হয়ে রাষ্ট্র বানিয়েছে। কিন্তু যখন এই রাষ্ট্রই মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তখন মানুষ নিজেকে বাঁচাতে অন্য কোনো বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়। শঙ্কিত মানুষ প্রতিকার পাচ্ছে না নিত্যদিনের প্রতিযোগিতাময় গুপ্তহত্যায়। গুপ্তঘাতক যেন ছায়ার মতো ঘুরছে আমাদের চতুর পাশে। সর্বস্তরের মানুষ আজ আতঙ্কিত। দিন যতই যাচ্ছে পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অথচ দেখা যাচ্ছে তাদের হাতেই গুম-খুন হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

মৃত ব্যক্তির লাশ পাওয়ার অধিকারটা পর্যন্ত মানুষ এখন হারাতে চলেছে। এক সময় মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েছে। আর এখন লাশ ফেরতের গ্যারান্টি চাচ্ছে। বছরের পর বছর প্রিয়জন বেঁচে আছে কি না সেই উৎকণ্ঠায় দুর্বিষহ দিন কাটছে পরিবারের। অপেক্ষার পালা যেন আর ফুরাচ্ছে না কোনোভাবেই। আপনজনের লাশটা সৎকার করার অধিকারটা পর্যন্ত আজ এদেশের মানুষের নেই।

আইন লঙ্ঘনের পরও সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি না করে রক্ষা করে চলেছে। গুম ও হত্যার তদন্ত করতেও সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলের কর্মীদের গুম-হত্যা যেন র“টিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর চাপ ও হয়রানি বৃদ্ধির কারণে মানুষ আজ মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছে। দেশে এখন আইনের শাসন বলবৎ রয়েছে- এ কথা আজ মহাহাস্যরসে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তির শাসন কখনো আইনের শাসনের পরিপূরক হতে পারে না। যে দেশে তুচ্ছ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের প্রয়োজন হয়, সেখানে গণহারে গুম-হত্যার নির্দেশ কে দিচ্ছে তা খতিয়ে বের করা জরুরি। কে বা কারা রাষ্ট্রকে এভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে সেটাও খুঁজে দেখতে হবে।

সোনার বাংলায় বিমানবন্দরগুলো আজ সোনা দিয়ে আর নদী-নালা-খাল-বিলগুলো লাশ দিয়ে ভরে গেছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের লাশ আর ঢাকার উত্তরা থেকে প্রকাশ্যে অপহৃত যুবদল নেতার লাশ লক্ষ্মীপুরে ভেসে ওঠার ঘটনাসহ সব ঘটনাতেই পরিবারের অভিযোগ কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকেই গেছে। যত্রতত্র প্রকাশ্যেই সাদা পোশাকের লোকজন এভাবে গণহারে নির্বিচারে যাকে খুশি তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির সময়ও পুলিশ ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সাদা পোশাকের লোকজনকে প্রকাশ্যে গুলি ছুড়তে আমরা দেখেছি। রাষ্ট্রই যেন তাদের এই ইনডেমনিটি দিয়ে রেখেছে। অথচ আজ তারাই এই ইনডেমনিটির কারণে আরাধ্য হয়ে পড়েছে। সে কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মুখেও শুনতে হয় ‘সরকারের পেছনের সরকারকে আজ থামাতে হবে।’

সাদা পোশাকের অভিযান শুধু বন্ধ করলেই হবে না, সরকারের কালো কাজগুলোকেও বন্ধ করতে হবে। গাড়িতে স্বচ্ছ কাচ ব্যবহারের নির্দেশ দিলেই চলবে না, সরকারের মধ্যেও স্বচ্ছতা আনতে হবে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম গত ১৩ মাসে শুধু রাজধানীতেই ৫৩০টি পরিচয়হীন লাশ দাফন করেছে। আইন সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে গত বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ হওয়া মানুষের সংখ্যা ৬৮। অথচ এ বছর ৪ মাসেই এই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে চলেছে। পুরো দেশ আজ যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। গত এক বছরে শুধু নারায়ণগঞ্জেই ৪৩টি লাশ পড়েছে। রিজওয়ানার স্বামী সিদ্দিকীর ঘটনা থেকে শুরু করে সেভেন মার্ডার কেনোটারই কোনো রকম সূত্র যখন মানুষ খুঁজে পায় না তখন মানুষের সন্দেহ প্রবল এক বিশ্বাসে পরিণত হয়।

ঝালকাঠির যুবদল নেতা মিজানুর রহমান জমাদ্দার এবং তার দুই সহযোগী মুরাদ ও ফোরকান, মোহাম্মদপুরের যুবদল নেতা মনজুর মোর্শেদ শিপু, মিরপুর এলাকার ব্যবসায়ী মাসুম হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল সম্পাদক শামীম হাসান ওরফে সোহেল, ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ইসমাইল হোসেন, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আল মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহ, সিলেট জেলা ছাত্রদলের দিনার ও জুনায়েদ, চট্টগ্রাম বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া, রাজশাহী ভাটাপা জামে মসজিদের ইমাম আমিনুল ইসলাম, মিরপুর থেকে অপহৃত ছাত্রদল নেতা মফিজুল ইসলাম রাশেদ, রাজশাহী মহানগর শিবিরের দফতর সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম মাসুম, জয়পুরহাট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নজরুল ইসলাম- এদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে অপহরণ করা হয়। আজ অবধি নিখোঁজ রয়েছেন এরা। শ্রমিক নেতা আমিনুল বা বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার বা প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এদের খবরের পেছনে চাপা পড়ে থাকে আরও অসংখ্য ইলিয়াস আলীর ড্রাইভার আর নজর“লের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের পরিবারের কান্না।

রাষ্ট্র তখনই ব্যর্থ হয় যখন খুন হয়ে যাওয়া সন্তানের মা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে টেলিফোনে বলেন- ‘বাবা, পারলেন না, আমার ছেলেকে বাঁচাতে!’ এই আর্তনাদ যেন গোটা দেশের। এই আর্তনাদ আজ স্বয়ং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের। অসহায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে তাই তো এতটা অসহায় লাগে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এত অসহায় প্রতিমন্ত্রী কেন নিয়োগ দিতে হয় আমাদের? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকলেও তার দায়ভার প্রধানমন্ত্রীকে কেন নিতে হয় না? তাহলে এই দায় কার?

দেশে যে একটা মানবাধিকার কমিশন আছে সেটাও আজকে গুম হতে চলেছে। মানুষ যাবেটা কোথায়? গুম হওয়ার আশঙ্কায় কেউ কোনো কথা বলতে নারাজ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণমানুষের পক্ষে কথা বলার মানুষগুলো আজ কোথায়? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি অক্ষুন্ন রাখতে হলে অবশ্যই সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গুম, খুনকে বন্ধ করতে হবে।

সরকারকে আইনের শাসনের রক্ষাকল্পে আইনকে নিজ হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থেকেও দূরে থাকতে হবে। গুম খুন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব খোদ সরকারের ওপরই ন্যস্ত। আর এক্ষেত্রে অভিযোগ যদি খোদ সরকারের বিরুদ্ধেই ওঠে তবে তো আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো আজ এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখে নিপতিত!

গুপ্তহত্যা নামক এই ভয়ঙ্কর খেলা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আইনের শাসন, সংবিধান ও মানুষের সব অধিকারটুকু হয়তো এভাবেই একদিন গুম হয়ে যাবে। আমরা চাই না আমাদের সরকার ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’র বদলে ‘গুমপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ নামে পরিচিতি লাভ করুক।

লেখক : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

You Might Also Like