হতাশা থেকে প্রত্যাশা হায়দার


আকবর খান রনো

সূর্য উদয়ের ঠিক আগের মুহূর্তটি নাকি সবচেয়ে বেশি অন্ধকার থাকে। এটা অবশ্য কথার কথা। বাস্তবে গাঢ় অন্ধকারের ঠিক পরপরই যে আলোর দেখা মিলবে, এমনটি বলা নাও যেতে পারে। তবু মানুষ আশা করে। আশা রাখে ভবিষ্যতের প্রতি। ২০১৫ সালটি ভালো যায়নি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প শোনানো হলেও তার মধ্যে ছিল বিশাল অঙ্কের শুভঙ্করের ফাঁকি। আর গণতন্ত্র, সে তো নির্বাসিত ছিল। নির্বাচন তো বহু আগেই প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। গণতন্ত্রের আরো যেসব উপাদান থাকা উচিত, তার কোনোটিই দেখতে পাইনি এই চলে যাওয়া বছরে। তার ওপর প্রথম দিকে পেট্রলবোমার সন্ত্রাস, পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় জঙ্গিদের নৃশংসতা মানুষের জীবনের নিরাপত্তাটুকুও কেড়ে নিয়েছিল। এমনই এক দুঃসময় অতিক্রম করে আমরা পা রাখছি নতুন বছরের দিকে। গাঢ় অন্ধকারের পর আলো প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে বলে যে সাধারণ ধারণা বা বিশ্বাস আছে, তেমনি দুঃসময়ের বছর অতিক্রান্তির পর সুসময়ের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বছরের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে চাই। হতাশা থেকে এই হলো প্রত্যাশা। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি ছিল সেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি। দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এই দিনটিকে দুভাবে পালন করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। শাসক আওয়ামী লীগ দিনটিকে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ বলে পালন করেছিল। বস্তুত এই দিনটিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস না বলে গণতন্ত্রের বিদায় দিবস বলাটাই বোধ হয় সংগত হতো। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি বলেছিল কালো দিবস। তারা জনসভা করতে চেয়েছিল। করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি খালেদা জিয়াকে ঘর থেকে বের হতে দেয়নি। খালেদা জিয়া তাঁর অফিসকক্ষে অবরুদ্ধ ছিলেন। সেই বাড়ির সামনে বালুর ট্রাক জড়ো করে পথ আটকানো হয়েছিল। জনৈক মন্ত্রী বলেছিলেন, ওটা নাকি বাড়ি মেরামতের জন্য আনা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন মিথ্যাচার করা হয়, তখন আমরা সাধারণ জনগণ বড় অসহায় বোধ করি। প্রায় তিন মাস খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ ছিলেন। বাড়ির দরজায় তালা মেরে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি একপর্যায়ে বাড়ির বিদ্যুত্ লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল পানির সরবরাহ। এমনকি বাইরে থেকে খাবারও আনতে দেওয়া হয়নি। এমন অসভ্য আচরণকে যদি গণতন্ত্রের বিজয় বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে তার চেয়ে বড় প্রহসন আর কী হতে পারে? খালেদা জিয়া সভা করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে অবরোধ ঘোষণা করেছিলেন। তিন মাস ধরে অবরোধ চলেছিল। বস্তুত এই অবরোধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত কোনো সমর্থন ছিল না। কারণ জনগণ যেমন সরকারের স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী আচরণকে মেনে নিতে পারেনি, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের পক্ষেও জান বাজি রেখে দাঁড়াতে চায়নি। কারণ বিএনপিও তো তাদের দেখা দল। তাদের আমলেও তারা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা নেয়নি। বস্তুত দুটি দলই স্বৈরশাসক ছিল। জনগণ ছিল বড় অসহায়, নিরুপায় ও রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষের বলি। খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতৃত্ব অবরোধকে কার্যকর করার জন্য সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছিলেন। পেট্রলবোমা দিয়ে বাস পুড়িয়ে, মানুষ মেরে তাঁরা আতঙ্ক সৃষ্টি করে অবরোধকে কার্যকর করতে চেয়েছিলেন। পেট্রলবোমা-সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল বিএনপির রাজনৈতিক সঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। তাদের নেতারা এখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝখান দিয়ে দেশে চরম সন্ত্রাসী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সেই নেতাদের বাঁচানো যায় কি না, সেটাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। বস্তুত বোমাবাজি, সন্ত্রাস—এসব প্রধানত তারাই করেছে। এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী তিন মাসে সারা দেশে পেট্রলবোমায় মারা যায় ৭০ জন। এ সুযোগেই সরকার ও পুলিশ-র্যাব হয়ে উঠেছিল চরম কর্তৃত্ববাদী। একই সময়ে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গণপিটুনির নামে পুলিশি হত্যায় মারা গেছে ৬১ জন। অবরোধ চলাকালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের সময় কয়েক যুবক হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন। জানা গেল, তাঁরা ছিলেন যুবলীগ কর্মী এবং তত্ক্ষণাত্ তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বিএনপির পেট্রলবোমা বস্তুত সরকারকেই শক্তিশালী করেছিল এবং পুলিশকে উদ্ধত হতে সাহায্য করেছিল। পুলিশের বড় কর্মকর্তারা এখন রাজনীতির ভাষায় কথা বলেন এবং সরকারি দলের রাজনৈতিক নেতারা পুলিশের ভূমিকা নিয়েছেন। যেকোনো অপরাধমূলক ঘটনায় পুলিশি তদন্তের আগেই তাঁরা আসামি বানিয়ে দেন বিএনপি নেতৃত্বকে। এ জন্য অধ্যাপক অনুপম সেন বলেছেন, ‘ব্লেম গেমে অপরাধীরা আড়ালে চলে যাচ্ছে।’ বিএনপির সন্ত্রাসী কাজকর্মের পরিণাম অবশ্য আজ বিএনপিকে ভোগ করতে হচ্ছে। বড় দল হয়েও আজ তারা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার নেতা ও কর্মীর নামে মামলা। তা ছাড়া সারা দেশে গুম, গুপ্তহত্যা এবং এককথায় বিচারবহির্ভূত হত্যা যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে গণতন্ত্রের অবশিষ্টটুকুও থাকছে না। এই দুই বড় দলের দুই ধরনের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ভয়াবহ নতুন উপাদান। তা হলো জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাস। এ বছরেই পাঁচজন মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক একই কায়দায় চাপাতির আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছেন। সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে, যে সন্ত্রাসী গ্রুপটি এই কাজ করছে, তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গি গ্রুপের যোগাযোগ আছে। কিন্তু সরকার জোরের সঙ্গে আইএসের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে এসেছে। কেন করছে, কী ভিত্তিতে করছে. তা আমার জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, ‘ওরা হামলে পড়বে’। অর্থাত্ আইএসের অস্তিত্ব আছে প্রমাণ পাওয়া গেলে বিদেশিরা সহজেই আইএস দমনের নামে আমাদের দেশের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। হয়তো কোনো কোনো দেশীয় শক্তিও চায় যে মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তিগুলো আমাদের দেশে এই সুযোগে আসুক এবং ‘গণতন্ত্র রক্ষা করুক’। হায়রে দুরাশা! ষড়যন্ত্র হয়তো আছে। কিন্তু এটাও তো বাস্তব সত্য যে বাংলাদেশে আইএস ধরনের কোনো ইসলামী জঙ্গিবাদী সংস্থা তো তত্পর রয়েছে। তারা বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করছে, খ্রিস্টান যাজককে হত্যাচেষ্টা করেছে, খ্রিস্টান, হিন্দু, শিয়া মুসলমান, আহমদিয়াপন্থী মুসলমান—সবাইকে হত্যা করে এক বীভত্স পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। এ পর্যন্ত যতটুকু হত্যা, বোমাবাজি করেছে তাতে উদ্বিগ্ন হতেই হয়। কিন্তু সরকারকে যেন বড় অসহায় মনে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার এই ভয়ংকর চক্রকে নির্মূল করার চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেই যেন ঘায়েল করতে অধিক আগ্রহী। তাই বিশিষ্ট লেখক হাসান আজিজুল হকও বলেছেন, ‘বড় দলগুলো পারিবারিক ঝগড়ার মতো করছে। ব্লেম গেম করছে। ফলে প্রকৃত অপরাধী আড়াল হয়ে যাচ্ছে।’ আরো দেখা যাচ্ছে, সরকার ও সরকারি দল ক্রমাগত মৌলবাদী মতাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করে যাচ্ছে। এটাও দেখা গেছে যে কয়েক হাজার জামায়াতকর্মী ও স্থানীয় জামায়াত নেতাকে সাদরে সরকারি দলে টেনে নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা তাঁদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছেন। তবে এই বছরের একটি বড় ঘটনা হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এগিয়ে চলেছে। এ পর্যন্ত চারজন অপরাধীর ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। ফাঁসি কার্যকর না করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই চাপকে উপেক্ষা করে বিচারপ্রক্রিয়ায় অনড় ছিলেন, সে জন্য তিনি অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এমনকি এ কথাও বলা চলে যে সম্ভবত শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না থাকলে এই বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত ধারায় চলত না। সরকারের এই কৃতিত্বের পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা, গণতন্ত্রের বিনাশ ঘটানো ও নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার দিকগুলোকে হালকা করে দেখা যাবে না। বহু বছর পর এ বছরই ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে যে মেয়র নির্বাচন হয়েছে, তাকে নির্বাচন না বলাই ভালো। পুলিশের সহায়তায় একতরফা ব্যালট পেপারে সিল মারার (কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের রাতেই সিল মারার কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল) যে নজির স্থাপন করেছিল এই সরকার, তাতে নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা উঠে গেছে। এসব কারণেই হত্যাশা। তবু প্রত্যাশা করব মানুষ জাগবে। সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ, দুর্নীতি, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠবে। একই সঙ্গে প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি ও জামায়াতকেও একইভাবে প্রত্যাখ্যান করবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, জঙ্গি ধর্মীয় মৌলবাদকে নির্মূল করে সুস্থ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি করবে। এটা না করতে পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়নও হবে না। এখন যে উন্নয়নের ফিরিস্তি দেওয়া হয়, তার মধ্যে কিন্তু বিরাট ফাঁকি আছে। কিছু লোকের সম্পত্তির অতিকায় বিস্তৃতি ঘটেছে। কিন্তু ধন-বৈষম্য বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। আধুনিক অর্থশাস্ত্রে একে স্বাস্থ্যকর মনে করা হয় না। আমি আশা করব, আগামী বছর দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ, যে মানুষ সামান্য চাকরির সন্ধানে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশের কবরস্থানে স্থান লাভ করে, সেই মানুষ সমাজতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসবে। এখনো হয়তো সেই শ্রেণিসংগ্রাম অতটা প্রবল হয়ে ওঠেনি, কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তা প্রবল থেকে প্রবলতর হবেই। তাই হতাশার মধ্যেই আমার আছে প্রত্যাশা।
লেখক : রাজনীতিবিদ
সূত্র : কালের কণ্ঠ

You Might Also Like