রাসূল সা:কে নিবেদিত নজরুল-এর গীতিগুচ্ছ

শায়লা আহমেদ

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা আধুনিক ইসলামি সঙ্গীতের প্রবর্তক। কাজী নজরুল ইসলামের আগে আধুনিক সঙ্গীতমনস্ক মুসলমানের আত্ম-আকাঙ্ক্ষার উপযোগী কোনো ইসলামি সঙ্গীত বাংলায় ছিল না। নজরুল প্রথম বাংলায় আধুনিক সুর এবং উঁচু মার্গের বাণীর মাধ্যমে ইসলামি সঙ্গীতের সঙ্গে শ্রোতার পরিচয় ঘটান।

‘নজরুল ইসলামের শিল্পোত্তীর্ণ ইসলামি গান ও গজল সমৃদ্ধ হয়েছে বিশেষত পয়গম্বর-প্রীতি এবং আল্লাহর সঙ্গে শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মোহাম্মদ সা:-এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে। তাঁর মানবিক রূপ, গুণ, দেহাবয়ব এবং পার্থিব ও পারলৌকিক যেসব চেতনার উন্মেষ ঘটানো হয়েছে তা অতীতের ইসলাম-মানস-চৈতন্যে উজ্জীবিত ও সমৃদ্ধ।’
নজরুল-মানসে ইসলাম আল্লাহ রসূল বিভিন্ন মাতৃকতায় ধরা দিয়েছিল। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বাস-বোধ-চেতনা এবং প্রকাশ ছিল সত্য-সহজ-সুন্দর ও শিল্পীত। নজরুলের সঙ্গীত রচনার তৃতীয় পর্বে ইসলামি গানের সৃষ্টি। বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নজরুলের রচিত ‘নাত-এ-রসূল’। হজরত মোহাম্মদ সা: যেমন বর্তমান ও অতীত বিশ্বে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়, স্মরণীয়, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব, তেমনি কাজী নজরুল ইসলামের কাছেও ছিল হযরত মোহাম্মদ সা:-এর সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা।
রাসূল সা:-এর রূপ, গুণ, কর্মজীবন, শিষ্টাচার নজরুলের শেষ আশ্রয়স্থল এবং হজরত মোহাম্মদ সা:-এর আদর্শের বাস্তবায়নসহ বহুবিধ বিষয়কে মূল্য করে তিনি ‘নাত-এ-রসূল’ রচনা করেছেন।
স্বভাবকবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রকৃতির সৌন্দর্যে মোহাম্মদ সা:কে নিবেদন করে লিখেছেন অসাধারণ কিছু সঙ্গীত। এ সঙ্গীতের প্রথম দুই লাইন করে দেয়া হলো :
ক. নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহাম্মদ বোল,
যে নাম নিয়ে চাঁদ-সেতারা আসমানে খায় দোল।
খ. মরু সাহারা আজি মাতোয়ারা হলেন নাজেল
তাহার দেশে খোদার রসূল।
যাহার নামে যাঁহার ধ্যানে সারা দুনিয়া দিওয়ানা
প্রেমে মশগুল।।
গ. মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান এমন মধুর লাগে
ঘ. হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়-
ঙ. ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়।
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।।
চ. আসিছেন হাবিয়া খোদা আরশ পাকে তাই উঠেছে শোর
চাঁদ পিয়াসে ছুটে আসে আকাশ পানে যেমন চকোর
ছ. সাহারাতে ডেকেছে আজ বান দেখে যা
মরুভূমি হল গুলিস্তান, দেখে যা।।
জ. ওরে ও চাঁদ উদয় হলি কোন জোছনা দিতে
দেয় অনেক বেশি আলো আমার নবীর পেশানীতে।।
ঝ. সাহারাতে ফুটল রে ফুল রঙিন গুলে লালা
সেই ফুলেরি খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা।।
ঞ. হে মদিনার বুলবুলি গো গাইলে তুমি কোন গজল
মরুর বুকে উঠল ফুটে প্রেমের রঙিন গোলাব দল।।
ট. মরুর ধূলি উঠল রেঙে রঙিন গোলাব রাগে
বুলবুলিরা উঠল গেয়ে মক্কার গুলবাগে।।
ঠ. উঠুক তুফান পাপ-দরিয়ায় ও ভাই আমি কি তায় ভয় করি
পাক্কা ঈমান তক্তা দিয়ে গড়া যে আমার তরী।।
হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বিচিত্র, ব্যাপ্ত উপস্থিতি প্রকাশে কাজী নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেছেন প্রকৃতির অনুষঙ্গ। কখনো আসমান, বাতাস, চাঁদ, জ্যোৎস্না কখনো ফুল, ফল, পাখি কখনো ঝরনা, নদী, সাগর, পাহাড়, সাহারা মরুভূমি। পাখির বর্ণনায় সুরের পাখির প্রাধান্য যেমন বুলবুলি, দোয়েল, চকোর, কোকিল এসব পাখি তাদের সুমিষ্ট কণ্ঠের সুরে হজরত মোহাম্মদ সা:-এর গুণগান বর্ণনা করেছে। গোলাব ফুলের অনুষঙ্গ সৌন্দর্য সুবাসের কারণে উঠে এসেছে বারবার। খোরমা, খেজুর, বাদাম, জাফরান ফল অর্থাৎ আরব দেশের প্রচলিত ফল নবীর উপস্থিতির জানান দিয়েছে।
নজরুলের চেতনায় সাহারা মরুভূমিতে গুলিস্তানের আবাদ হয়েছে নবীজীর আবির্ভাবে। সাহারার ধূলিপথের ওপর দিয়ে যখন সে মহাপুরুষের পদচারণা হতো সে খবর বুলবুলি তাঁর সুরে সুরে পৌঁছে দিত সাহারায় হজরত মোহাম্মদ সা: সাহারাতে ফোটা সেই ‘রঙিন গুলে লালা’। যে ফুলের খুশবুতে সূর্য, আকাশ, বাতাস, সাগর, নদী, তারকাসহ সমগ্র প্রকৃতি আচ্ছন্ন, কাজী নজরুল ইসলামের মায়াবী বর্ণনায় রাসূল সা:-এর আবির্ভাব ও তাঁর পবিত্র উপস্থিতি প্রকৃতির রূপকল্পে উঠে এসছে। যা নিঃসন্দেহে বিচিত্র, বর্ণিল, প্রাণময় আন্তরিক সৌন্দর্যে ভরপুর। স্বীকার না করে উপায় নেই ‘নাত-এ-রসূল’গুলো তার অধ্যাত্মচিন্তা প্রকাশের পাশাপাশি উঁচুমানের সাহিত্যেরও প্রকাশ। হজরত মোহাম্মদ সা: নজরুলের মনে যতভাবে আন্দোলন ঘটিয়েছেন তার প্রায় সব রকম প্রকাশ আমরা তার নাতগুলোর রূপবৈচিত্র্যে শোভামাধুর্যে লক্ষ করি।
কাজী নজরুল ইসলাম হজরত মোহাম্মদ সা:কে সচক্ষে দর্শন না করেও যে রূপ বর্ণনা করেছেন তা অতুলনীয় সৌন্দর্যে ভাস্বর। নানা রূপে, রঙে, চিত্রকল্পে, উপমায় নবীকান্তি উপস্থাপিত হয়েছে :
ক. তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।।
খ. নূরের দরিয়ায় সিনান করিয়া কে এলো মক্কায় আমিনার কোলে
ফাগুন পূর্ণিমা নিশীথে যেমন আসমানের কোলে রাঙা চাঁদ দোলে
গ. ওকি ঈদের চাঁদ গো চলে মদিনারই পথে গো।
যেন হাসিন য়ুসোফ ফিরে এলো ফিরদৌস হতে গো।।
ঘ. মদিনাতে এসেছে সই নবীন সওদাগর
সে হীরা জহরতের চেয়ে অধিক মনোহর।।
ঙ. ওরে ও চাঁদ উদয় হ’লি কোন জোছনা দিতে
দেয় অনেক বেশি আলো আমার নবীর পেশানীতে।।
চ. রসূল নামের ফুল এনেছি রে (আয়. গাঁথবি মালা কে
এই মালা নিয়ে রাখবি বেঁধে আল্লা তালাকে।।
ছ. মদিনার শাহানশাহ কোহ-ই-তুরবিহারী
মোহাম্মদ মোস্তফা নবুয়তধারী।।
হজরত মোহাম্মদ সা:-এর রূপে বিভোর সমগ্র পৃথিবী। সে রূপকে রূপায়িত করার সার্থক রূপকার নজরুল। হাজারো রূপে হাজারো রঙে কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে নবীর রূপ বর্ণনা। যাঁকে স্বপ্নে দেখে ধন্য হয় মানুষ তাঁকে নাতের মধ্যে নতুন করে আবিষ্কার করা হয়। কাজী নজরুল ইসলাম কবি হিসেবে ছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। আর তার সঙ্গীতপ্রতিভা ছিল বিস্ময়কর। কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি চেতনা ছিল প্রাগ্রসর। আধুনিক ইসলামি চিন্তাচেতনাবোধকে আশ্রয় করে প্রকৃত ইসলামকে তুলে ধরার মতো শ্রেষ্ঠত্ব ছিল নজরুলের। তাই তার হৃদকলমের টানে রূপায়িত হয়েছে রসূলের সৌন্দর্যে আকীর্ণ রূপাশ্বৈর্য। মোহাম্মদ সা:-এর রূপে পৃথিবী যেমনভাবে আমোদিত, রোমাঞ্চিত উদ্বেলিত এবং বিলীন হয়েছে নজরুল তারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন যথার্থ শব্দে, ধ্বনি, ছন্দে অলঙ্কারে। এত বিরাট রূপকে বর্ণনা করতে যে প্রতিভার প্রয়োজন নজরুল ইসলাম তার গানে প্রমাণ করেছেন যে, সে প্রতিভা তার রয়েছে।
এ কোন মধুর শারাব দিলে আর আরাবি সাকী,
নেশায় হলেম দিওয়ানা যে রঙিন হল আঁখি।।
তৌহিদেরি শিরাজি নিয়ে
ডাকলে সবায় যারে পিয়ে,
নিখিল জগৎ ছুটে এলো রইল না কেউ বাকি।।
বসল তোমার মহফিল দূর মক্কা-মদিনাতে,
আল-কোরানের গাইলে গজল শবে কদর রাতে।।
নরনারী বাদশা ফকির
তোমার রূপে হয়ে অধীর
যা ছিল নজরানা দিল রাঙা পায়ে রাখী।।

ক. তৌহিদের মুর্শিদ আমার মোহাম্মাদের নাম।
ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারে খোদায়ী কালাম-
মুর্শিদ মোহাম্মদের নাম।।
খ. মরু সাহারা আজি মাতোয়ার- হলেন নাজেল
তাহার দেশে খোদার রসুল।
যাঁহার নামে যাঁহার ধ্যানে সারা দুনিয়া
দিওয়ানা, প্রেমে মশগুল।।
গ. মদিনার শাহান শাহ কোহ-ই-তুরবিহারী
মোহাম্মদ মোস্তফা নবুয়ত ধারী।।
ঘ. আজি আল কোরায়েশী প্রিয় নবী এলেন ধরাধাম
তাঁর কদম মোবারকে লাখো হাজারো সালাম।
ঙ. উম্মত আমি গুনাহগার তবু ভয় নেই রে আমার
আহমদ আমার নবী যিনি খোদ হাবিব খোদার।
চ. খোদার রহম চাহ যদি নবীজীরে ধর
নবীজীরে মুর্শিদ কর নবীর কলমা পড়।।
ছ. লহ সালাম লহ দ্বীনের বাদশাহ জয় আখেরি নবী
পীড়িত জনগণে মুক্তি দিতে এলে হে নবীকুলের রবি।।
জ. ওগো আমিনা তোমার দুলালে আনিয়া আমি ভয়ে ভয়ে মরি
এ নহে মানুষ বুঝি ফেরেশতা আসিয়াছে রূপ ধরি।।
ঝ. মোহাম্মদ নাম যত জপি, তত মধুর লাগে
নামে এত মধু থাকে, কে জানিত আগে।।
ঞ. হে মদিনার বুলবুলি গো গাইলে তুমি কোন গজল।
মরুর বুকে উঠল ফুটে প্রেমের রঙিন গোলাব দল।।
ট. নবীর মাঝে রবির সম আমার মোহাম্মদ রসূল
খোদার হাবিব দ্বীনের নকিব বিশ্বে নাই যাঁর সমতুল।।
ঠ. তোমার নামে একি নেশা হে প্রিয় হজরত
যত চাহি তত কাঁদি আমার মেটে না হসরত।।
ড. এ কোন মধুর শারাব দিলে আল-আরাবি সাকী,
নেশায় হলাম দিওয়ানা যে রঙিন হল আঁখি।।
ঢ. আমার মোহাম্মদের ধেয়ান হৃদয়ে যার রয়
ওগো হৃদয়ে যার রয়।
খোদার সাথে রয়েছে তার গোপন পরিচয়।
রূপের তৃষ্ণায় উম্মত কবি তার প্রতি অঙ্গে অনুভব করেছেন মহানবীর উপস্থিতি। অর্থাৎ চৈতন্যে মিশে থাকা যে মহামানব তাঁরই যেন স্পর্শ সবখানে :
ক. মোহাম্মদ মোর নয়নমণি মোহাম্মদ নাম জপমালা।
ঐ নামে মিটাই পিয়াসা ও নাম কওসারের পিয়ালা।।
খ. হে প্রিয় নবী রসূল আমার
পরেছি আভরণ নামেরি তোমার।।
গ. নামাজ রোজা হজ জাকাতের পসারিণী আমি
নবীর কলমা হেঁকে ফিরি পথে দিবস যামী।।
ঘ. নাই হল বসনভূষণ এই ঈদে আমার
আল্লা আমার মাথার মুকুট রসূল গলার হার।।
ঙ. আমি যদি আরব হ’তাম মদিনারই পথ।
সেই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবী হজরত।।
চ. আল্লাহ থাকেন দূর আরশে নবীজী রয় প্রাণের কাছে
প্রাণের কাছে রয় যে প্রিয়, সেই নবীরে পরান যাচে।।
ছ. আমার ধ্যানের ছবি আমার হজরত।
ও নাম প্রাণে মিটায় পিয়াসা,
আমার তামান্না আমার আশা,
আমার গৌরব আমার ভরসা,
এ দীন গুনাহগার তাঁহারি উম্মত।।
জ. লহ সালাম লহ, দ্বীনের বাদশাহ, জয় আখেরি নবী।
পীড়িত জনগণে মুক্তি দিতে এলে হে নবীকুলের রবি।।
ঝ. মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা
তুমি বাদশারও বাদশাহ কমলীওয়ালা।।
ঞ. যে রসূল বলতে নয়ন ঝরে সেই রসূলের প্রেমিক আমি।
চাহে আমার হৃদয়-লায়লী সে মজনুরে দিবস-যামী।
ট. হে মোহাম্মদ এসো এসো আমার প্রাণে আমার মনে।
এসো সুখে এসো দুখে আমার বুকে মোর নয়নে।।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে রসূল সা: বিপুলভাবে আভাসিত। কত মাতৃকতায় চিত্রিত। কত মহিমায় রঙিনভাবে বর্ণিত। কতটা সাহিত্যিক মাত্রায় উত্তীর্ণ। কত না ভাবে ভঙ্গিমায় রূপকে নিবেদিত আর কত না ভাষার অলঙ্কারে সুসজ্জিত তা এসব নাত-এ-রসূল বিশ্লেষণ না করলে বোঝা যায় না।
৮ পৃষ্ঠার পর

‘উস্ওয়াতুন হাসানা’ বা ‘মানবচরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ’ হজরত মোহাম্মদ সা:-এর বিচিত্র, বর্ণিল, উন্নত, মহান, আদর্শিক গুণের যে চিত্তাকর্ষক। কারুকার্যময়, ঐশ্বর্যশালী হৃদ্-উদ্বেল বর্ণনা কাজী নজরুল ইসলাম তার উপর্যুক্ত নাতগুলোতে দিয়েছেন তা বাংলা ভাষায় এর আগে দুর্লক্ষ্য। কাজী নজরুল ইসলাম মহানবীকে ধারণ করতে চেয়েছেন প্রতি অঙ্গের রুধির ধারায়, মননে, বিশ্বাসে, প্রজ্ঞায়। তার হৃদয়কে আলোকিত করে মোহাম্মদ সা:-এর নামের আলো। এমন মহান, পুরুষোত্তম পুরুষকে কবি নিজের প্রতি অঙ্গে অনুভব করেছেন শিল্পিত উপস্থাপনে। ‘মোহাম্মদ মোর নয়নমণি’ ‘মোহাম্মদ নাম শিরে ধরি’ অথবা ‘মোহাম্মদ নাম গলায় পরি’। অর্থাৎ প্রতি অঙ্গের পরতে পরতে নবীজীকে অনুভব করে তিনি রচনা করেছেন অসাধারণ কিছু না’ত। যে না’ত এখন সময়োত্তীর্ণ, জনপ্রিয় এবং শিল্পোত্তীর্ণ।
কাজী নজরুল ইসলাম এমন একজন ইসলামি পুনর্জাগরণের কবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি হজরত মোহাম্মদ সা:-এর রওজা মোবারক দেখতে পারেননি। মনে ছিল তার নিদারুণ আকাঙ্ক্ষা তিনি নবীর মদিনায় যাবেন এবং নবীর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখে মনে শান্তি পাবেন। যেমন :
ক. ওরে ও দরিয়ার মাঝি মোরে নিয়ে যারে মদিনা
তুমি মুর্শিদ হয়ে পথ দেখাও ভাই আমি যে পথ চিনি না।।
খ. চলরে কাবার জিয়ারতে, চল নবীজীর দেশ।
দুনিয়াদারীর লেবাস খুলে পর রে হাজির বেশ।।
গ. দূর আরবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে
বেহুঁশ হয়ে চলেছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে।।
ঘ. আয় মরু পারের হাওয়া নিয়ে যা রে মদিনায়-
জাত-পাক মুস্তাফার রওজা মুবারক যেথায়।।
ঙ. কাবার জিয়ারতে তুমি কে যাও মদিনায়।
আমার সালাম পৌঁছে দিও নবীজীর রওজায়।।
চ. আন্ গোলাব পানি, আন্ আতরদানি গুলবাগে।
সহেলিগো কিছু নাহি ভালো লাগে
বেদুঈন ছেলের বাঁশী কারে ডাকে।
কেঁদে কেঁদে অনুরাগে।।
ছ. সুদূর মক্কা মদিনার পথে আমি রাহী মুসাফির
বিরাজে রওজা মুবারক যথা মোর প্রিয় নবীজীর।।
মহানবী সা:-এর পবিত্র মাজার জিয়ারতের অদম্য তৃষ্ণা তাকে উদ্বেল করেছে। তিনি কখনো ‘দরিয়ার মাঝি’কে : ‘মরু পারের হাওয়া’কে বলেছেন তাকে মদিনায় নিয়ে যেতে। কখনো দূর আরবের স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশের কুটিরে বসে আবার কখনো নিজেকে সুদূর মক্কা মদিনার রাহী মুসাফির হিসেবে দেখেছেন। কোটি কোটি বাংলা ভাষার হৃদয়ে মদিনায় যাওয়ার যে আকাক্সক্ষা তাই প্রকাশিত হয়েছে, কাজী নজরুর ইসলামের কলম থেকে।
তাঁর গুণ, কর্ম, আচরণ নজরুলকে প্রবলভাবে নাড়া দেয় এর ফলে তিনি রচনা করেন অসাধারণ সুন্দর, পরিশীলিত, শিল্পোতীর্ণ নাত-ই-রাসূল।
ক. ত্রাণ কর মওলা মদিনার, উম্মত তোমার গুনাহগার কাঁদে।
তব প্রিয় মুসলিম দুনিয়ায় পড়েছে আবার গুনাহের ফাঁদে।।
খ. যেয়ো না যেয়ো না মদিনা দুলাল হয়নি যাবার বেলা
সংসার পাথারে আজো দোলে পাপের ভেলা।
গ. পাঠাও বেহেশত হতে হজরত পুনঃ সাম্যের বাণী,
(আর. দেখিতে পারি না মানুষে মানুষে এই হীন হানাহানি।।
ঘ. আমিনা দুলাল এসো মদিনায় ফিরিয়া আবার, ডাকে ভুবনবাসী
হে মদিনার চাঁদ : জ্যোতিতে তোমার, আঁধার ধরার মুখে ফোটাও হাসি
সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলাভাষী মুসলমানের মনে যে অভাব ও তৃষ্ণা ছিল কাজী নজরুল ইসলাম তার সোনার কলমের ছোঁয়ায় স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন একজন সত্যিকারের মুসলমানের কর্তব্য কী, আদর্শ কী? সদিচ্ছা কী? সফলতা কিসে। কাজী নজরুল ইসলামের রচিত এসব নাত-ই-রাসূল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইসলামের বার্তাবাহকের ছবি, কর্ম, জীবনাদর্শ পৌঁছে দেবে। ভবিষ্যতের মানুষ তাদের চরম বিপর্যয়ের দিনে পাবে আশ্রয়ের স্থল। স্থির করতে পারবে তাদের কর্তব্য। মুখে মুখে, ঠোঁটে ঠোঁটে ফিরবে ‘মোহাম্মদের নাম’। সুবহান আল্লাহ, এ প্রত্যাশাকে মনে ধরে তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য নাত-ই-রাসূল। এর থেকে একটি অংশের প্রথম দুলাইন উপরে উল্লেখ করেছি। আরো বিরাট অংশের প্রথম লাইন নিচের তালিকায় তুলে দেয়া হলো।
১. আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয় – জুলফিকার-১
২. দেখে যারে দুলা সাজে এসেছেন মোদের নবী -ঐ
৩. যাবি কে মদিনায় আয় ত্বরা করি -ঐ
৪. বক্ষে আমার কাবার ছবি চক্ষে মোহাম্মদ -ঐ
৫. আহমদের ঐ মিমের পর্দা উঠিয়ে দেখ মন -ঐ
৬. সৈয়দে মক্কী মদনী আমার নবী মোহাম্মদ -ঐ
৭. রাখিসনে ধরিয়া মোরে ডেকেছে মদিনা -ঐ
৮. ওকে সোনার চাঁদ কাঁদেরে হেরা গিরির পরে – জুলফিকার-২
৯. আল্লা রসূল জপের গুণে কী হলো দেখ চেয়ে -ঐ
১০. ফেরি করে ফিরি আমি আল্লাহ নবীর নাম -ঐ
১১. তৌহিদেরই বান ডেকেছে সাহারা-মরুর দেশে -ঐ
১২. আমিনার কোলে নাচে হেলে দুলে শিশু নবী -ঐ
১৩. তোরা যারে এখনই হালিমার কাছে লয়ে ক্ষীর ননী -ঐ
১৪. তোমায় যেমন করে ডেকেছিল আরব মরুভূমি -ঐ
১৫. মদিনায় যাবি কে আয় আয় উড়িল নিশান -ঐ
১৬. হে মদিনার নাইয়া ভব নদীর তুফান ভারী -ঐ
১৭. ওগো মুর্শিদ পীর বলো বলো রসূল কোথায় থাকে -অগ্রন্থিত
১৮. আল্লাহ নামের নায়ে চড়ে যাব মদিনায় -ঐ
১৯. আমি বাণিজ্যেতে যাব এবার মদিনা শহর -ঐ
২০. ঐ হেরে রসূলে খোদা এল ঐ গেলেন মদিনায় যবে -ঐ
২১. আমি যেতে নারি মদিনায় আমি নারী হে প্রিয় নবী -ঐ
২২. পূবাল হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া -ঐ
২৩. মেষ চারণে যায় নবী কিশোর রাখাল বেশে -ঐ
২৪. কলমা শাহাদাতে আছে খোদার জ্যোতি -ঐ
২৫. ভেসে যায় হৃদয় আমার মদিনা পানে -ঐ
২৬. দুখের সাহারা পার হয়ে আমি চলেছি কাবার পানে -ঐ
২৭. হে মদিনাবাসী প্রেমিক ধরো হাত মম -ঐ
২৮. আমার প্রিয় হজরত নবী কমলীওয়ালা -ঐ
২৯. আমি গরবিনী মুসলিম বালা সংসার সাহারাতে -ঐ
৩০. ইয়া রাসূলাল্লাহ মোরে রাহা দেখাও সেই কাবার -ঐ
৩১. ওরে কে বলে আরবে নদী নাই যেথা রহমতের ঢল -ঐ
৩২. আল্লাহকে যে পাইতে চায় হজরতকে ভালবেশে -ঐ
৩৩. ইয়া মোহাম্মদ বেহেশত হতে খোদায় পাওয়ার -ঐ
৩৪. ওরে ও মদিনা বলতে পারিস কোন সে পথে তোর -ঐ
৩৫. জরিন হরফে লেখা রূপালি হরফে লেখা আসমানের -ঐ
৩৬. হেরেমের বন্দিনী কাঁদিয়া ডাকে তুমি শুনিতে -ঐ
৩৭. প্রিয় মুহরে নবুয়তধারী হে হজরত তরিতে উম্মতে -ঐ
৩৮. কেন তুমি কাঁদাও মোরে হে মদিনাওয়ালা -ঐ
৩৯. ওগো আমার নবী প্রিয় আল আরাবি -ঐ
৪০. ভালবাসা পায় না যে জন রসূল তারে ভালবাসে -ঐ
৪১. আল্লাহ নামের দরখতে ফুটেছে এক ফুল -ঐ
৪২. আল্লাহ রসূল বলরে মন আল্লাহ রসূল বল -ঐ
৪৩. মুরশিদ পীর বলো বলো ওগো রসূল কোথায় থাকে -ঐ
৪৪. ফিরি পথে পথে মজনু দিওয়ানা হয়ে -গুলবাগিচা
৪৫. খোদার হাবিব হলেন নাজিল খোদার ঘর ঐ কাবার -ঐ
৪৬. মারহাবা সৈয়দে মক্কী মদনি আল আরবী বাদশারও -ঐ
৪৭. বক্ষে আমার কাবার ছবি চক্ষে মোহাম্মদ -চন্দ্রবিন্দু
৪৮. দ্বীনের নবীজী শোনায় একাকী কোরানের মধু বাণী -ঐ
৪৯. কুল মখলুক পাহে হজরত বালাগাল উলা বেকামালিহি -ঐ
৫০. কে যাবি পারে আয় ত্বরা করি -বুলবুল (৪র্থ খণ্ড)
রাসূল সা:কে নিয়ে নজরুল এত গান রচনা করেছেন ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। মানুষের কল্পনা এমনো হতে পারে! এতভাবে কল্পনা করা যায়! এভাবে সুরে ছন্দে বাঁধা যায় একজন মানুষকে! এ অসাধ্য সাধন করেছেন নজরুল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েই তিনি রচনা করেছেন এসব নাত-এ-রাসূল সা:।

সূত্র : নয়া দিগন্ত

You Might Also Like