বাল্যবিবাহ রোধে ছেলেদের নিয়েও ভাবতে হবে

ড. সা’দত হুসাইন

সরকারের সচিব থাকাকালে আমি গুলশানের বাসা থেকে তেজগাঁও-মগবাজার হয়ে সচিবালয়ে যেতাম। টঙ্গী ডাইভারশন রোডের সিগন্যাল বাতির গোল চক্করটি ট্রাফিক পুলিশের পরিভাষায় রেইনবো চক্কর হিসেবে পরিচিত। রেইনবো চক্করের পূর্ব পাশে একটি বড় বস্তি ছিল। হাতিরঝিল প্রকল্প চালু হওয়ায় বস্তিটি আজ সেখানে নেই, হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে অন্যত্র সরে গেছে। রেইনবোর আশপাশে বহু টোকাই নিজেদের মতো করে খেলাধুলা করত। খুব কাছে থেকে প্রখর দৃষ্টি মেলে দেখেছি বাচ্চাগুলো পরম আনন্দে খেলছে। তাদের হৈ-হুল্লোড়, হাসি-তামাশায় বিষণ্নতার বিন্দুমাত্র লেশ নেই; মনের সুখে তারা খেলছে। তারা প্রায় সবাই অল্প বয়স্ক বালক, সবেমাত্র শৈশব পেরিয়েছে। কয়েকটি শিশুও রয়েছে। তাদের দৌড়াদৌড়ি, হুড়াহুড়ি, লাফালাফির মধ্যে দুরন্তপনা উপচে পড়ছে। গুলশানের সরকারি বাসায় আমার ছেলেমেয়েরা যে আনন্দে হেসেখেলে বেড়ায়, টোকাই বালকরা খেলাধুলা, ছোটাছুটি করে তার থেকে কম আনন্দে আছে বলে মনে হয়নি।

এক যুগেরও বেশি হলো প্রাত্যহিকভাবে আমার এ পথে চলাচল বন্ধ হয়েছে। হাতিরঝিল প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এ এলাকার পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলে গেছে। মূল বিষয়টি আমার মন থেকে কখনো মুছে যায়নি। আমার নিজের পাড়ায় ও অন্যান্য জায়গায় ছোট বালকদের দুরন্তপনা ও হৈ-হুল্লোড় এখনো পর্যবেক্ষণ করি। পরে তাদের জীবন, বিশেষ করে তাদের বেড়ে ওঠা, কৈশোরে পদার্পণ সম্পর্কে আরো কিছু জানতে চেষ্টা করি। এ কথা পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে প্রাকৈকশোরের এসব প্রাণবন্ত উচ্ছল বালকের পরবর্তী জীবন এত আনন্দঘন থাকে না। সংসারের ঝড়-ঝাপটা ও দারিদ্র্য তাদের কাবু করে ফেলে। ছোটবেলার সেই লাফিয়ে চলা নিশ্চিন্ত বালকের জীবনে এবং তাদের সংসারে দারিদ্র্য ডেকে আনার জন্য বালক নিজে ও তার অভিভাবকরা অনেকাংশে দায়ী। এর মূল কারণ বাল্যবিবাহ।

প্রাকৈকশোরের গণ্ডি পেরিয়ে দুরন্ত বালকটি যখন কৈশোরে প্রবেশ করল তখন সে ছোটখাটো কাজকর্মের মাধ্যমে আয়-উপার্জন করতে শুরু করেছে। শুরুতে এটি তার অভিভাবকের সংসারে কিছুটা বাড়তি উপার্জনের উৎস। হাতে কিছু নগদ টাকা ও পরিবারের বাড়তি আয়ে তার আনন্দ সামান্য হলেও বাড়ার কথা। প্রথম দিকে বোধ হয় তেমনটি হয়। কিছুকাল পরই, অতি অল্প বয়সে কিশোর বালকের ইচ্ছা হয় সে বিয়ে করবে। তার অভিভাবকরা এতে সায় দিয়েই ক্ষান্ত হন না, তাঁরা কিশোরকে উসকাতে থাকেন। অল্প বয়সে বিয়েশাদি করে বালকটি সংসারের বোঝা মাথায় নেয়। তারপর বাচ্চাকাচ্চা। শুরু হয় আর্থিক টানাপড়েন। আনন্দ-উচ্ছ্বাস উবে যায় অচিরেই।

কয়েকটি কল্পচিত্রের (ঐুঢ়ড়ঃযবঃরপধষ ংপবহধত্রড়) মাধ্যমে আমি সমস্যাটি তুলে ধরছি। ছেলেটির নাম জসিম। পাড়ার লোকে তাকে জস্যা বলে ডাকে। বস্তিতে জন্ম। মা-বাবার সঙ্গে বস্তিতে বেড়ে উঠেছে। কোনো খারাপ অভ্যাস তাকে স্পর্শ করেনি। বস্তি ও এর আশপাশের বালকদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড়, খেলাধুলা করে টঙ্গী ডাইভারশন রোড ও কারওয়ান বাজারে দিন কাটিয়েছে। সে স্কুলে যায়নি। পড়াশোনার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। তবে দু-চারটি ইংরেজি শব্দ বলতে পারে, যা এর-ওর মুখে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে। টাকা-পয়সার হিসাব ভালোই জানে। কিভাবে তা শিখেছে সে নিজেও জানে না। এখন সে অন্তত হাজার টাকা পর্যন্ত গুনে নিতে পারে, বাড়তি টাকা ফেরত দিতে পারে। জসিমের বয়স যখন বছর দশেক তখন তার মনে হলো সে যদি অল্পস্বল্প কিছু আয় করতে পারে, তাহলে তার মা-বাবা একটু আরামে থাকতে পারে। কিন্তু আয় করার উপায় কী? কয়েকটি বিকল্প তার মাথায় এলো। সে মানুষের বাসায় বা দোকানে কাজ করতে পারে, গ্যারেজ বা ছোট কারখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে সামান্য পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ শিখতে পারে, কারওয়ান বাজারে মিনতি (মুটে) হিসেবে বাজার-সওদা টানতে পারে। যেহেতু মিনতির কাজে স্বাধীনতা বেশি, কোনো বাধা সময় নেই, কোনো দিন কাজ না করলেও চলে, তাই মিনতির কাজই সে বেছে নিল। হাতে কিছু পয়সা এলো। মা-বাবা খুশি হলেন, পরিবারের টানাটানি কমতে শুরু করল। দু-তিন বছর যাওয়ার পর জসিম জৈবিক চাহিদার (ইরড়ষড়মরপধষ ঁত্মব) টান অনুভব করতে শুরু করল। তার মা-বাবা মনে করলেন এখন জসিমের বিয়ের বয়স হয়েছে। দেখেশুনে তাকে একটা বিয়ে করানোর এখনই উপযুক্ত সময়। তাঁরা মেয়ে দেখলেন। ছোটখাটো যৌতুকও দাবি করলেন; মোটামুটি কিছু পেয়েও গেলেন। জসিমের পছন্দ-অপছন্দের প্রসঙ্গ খুব একটা আসেনি। মেয়েটি ল্যাংড়া, খোঁড়া, বিকলাঙ্গ নয়, এটুকু জেনেই সে নিশ্চিন্ত রইল। একদিন তাদের বস্তির ঘরে নতুন বউ এলো। জসিম এখন বিবাহিত বালক। তার বয়স ১৩ বছর। পরিবারের আয় বাড়েনি। খরচ বেড়ে গেল এবং বাড়তে থাকল। জসিম বুঝতে পারল তাদের সংসারে যেন একটু টানাটানি শুরু হয়েছে। আয় না বাড়ালে আর্থিক টানাপড়েন বাড়তেই থাকবে। এ অবস্থায় কী করা যায় এ নিয়ে তাকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। দারিদ্র্য তখন ধেয়ে আসছে।

দ্বিতীয় চিত্র। মা-বাবার দেওয়া নাম বেলায়েত হোসেন হলেও এখন সে বিল্লু নামে পরিচিত। ঢাকার বাইরে জন্ম হলেও এখন সে পুরোমাত্রায় ঢাকার বাসিন্দা। চাঁদপুরের হাইমচর থেকে আরো কয়েক শ নদীভাঙা পরিবারের সঙ্গে তার মা-বাবা যখন বনানীর এ ঝুপড়ি ঘরে উঠেছিলেন তখন বিল্লুর বয়স বড়জোর তিন বছর, বোনের বয়স পাঁচ। ঠেলাগাড়ি চালিয়ে বাবা যা আয় করতেন, তাতে সংসার কোনোভাবে চলত। মা ছুটা কাজের বুয়া হিসেবে বাসাবাড়িতে কাজ নিলেন। সেই সকালে বেরিয়ে যেতেন, সন্ধ্যার পর ফিরতেন। মায়ের রেঁধে যাওয়া ভাত-তরকারিতে দুপুরের খাওয়াটা কোনো রকমে চলে যেত। রাতের খাওয়াটা ভালোই হতো। মা বাসাবাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতেন, বাবাও দিনের আয় থেকে ছোটখাটো কিছু কিনে আনতেন। দিনে বিল্লুর কোনো কাজ নেই। আশপাশের ঝুপড়ি ঘরের সামনে কিংবা পাশের মাঠে অথবা সিগন্যাল বাতির অদূরে সমবয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে সে দিন কাটাত। বনানীর সচ্ছল পরিবারের শিশুরা যে আনন্দে হইচই করছে, বিল্লুর দৌড়াদৌড়ি ও হৈ-হুল্লোড়ে সে আনন্দ তার চেয়ে কম ছিল না। বিল্লুও কোনো স্কুলে যায়নি, পড়াশোনা করেনি। তবে হাটেঘাটের শিক্ষা দিয়ে সে প্রাত্যহিক হিসাব-নিকাশের কাজ চালিয়ে নিত।

বয়স যখন ৮-৯ বছর, বিল্লুর মা তাকে একটি বাসায় কাজে লাগিয়ে দিলেন। বিল্লুর বোনও অন্য একটি বাসায় কাজ করে। সবার রোজগারে তাদের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতার চেহারা ভেসে উঠতে শুরু করেছে। তিন-চার বছর ভালোই কাটল। এরপর বিল্লুর নামে নানা গল্প-কাহিনী শোনা যেতে লাগল, যার মূল কেন্দ্রে বাসার একাধিক কাজের মেয়ে। পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল বিল্লু ইঁচড়ে পাকা হয়ে গেছে। তার মধ্যে জৈবিক ও আবেগপ্রসূত চাহিদা চাড়া দিয়ে উঠছে। এসব ব্যাপারে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে তার বোনের বিয়ে হয়ে গেল। এ বিয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিল্লু ঠিক করে ফেলল যে তাকেও বিয়ে করতে হবে। তার মা-বাবা এত অল্প বয়সে বিল্লুকে বিয়ে করাতে রাজি ছিলেন না। বিল্লুর উত্পাতে তাঁদের রাজি হতে হলো। বিল্লুর বিয়ে হয়ে গেল বাসায় কাজ করা এক মেয়ের সঙ্গে, বয়সে যে তার চেয়ে বছর দুয়েকের বড় হবে। বিয়ের পর মেয়েটি বাসার কাজ ছেড়ে দিল। বিল্লু কাজ নিল এক চায়ের দোকানে। তার একার আয়ে কোনো রকমে সংসার চলে যাচ্ছিল। বছর ঘুরতেই তাদের ঘরে সন্তান এলো। পরের চার বছরে আরো দুটি সন্তান। বিল্লুর বয়স যখন ১৮ বছর তখন সে তিন সন্তানের বাবা। বোন চলে গেছে শ্বশুরবাড়ি। বাবার শরীরে আগের মতো শক্তি নেই। মাঝেমধ্যে অসুখ-বিসুখ দেখা দেয়। চায়ের দোকানের আয়ে এত বড় সংসার চলে না। দারিদ্র্যের কশাঘাতে বিল্লু জর্জরিত হতে থাকে।

ওপরের চিত্রকল্পের (ঐুঢ়ড়ঃযবঃরপধষ ংপবহধত্রড়) মাধ্যমে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে বাল্যবিবাহ শুধু বিশেষ এক লিঙ্গ বা নারীর সমস্যা নয়। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য এক মহাসমস্যা। যেহেতু বাংলাদেশ তথা এতদঞ্চলে নারীরা বিভিন্নভাবে নিপীড়িত ও বঞ্চিত, তাই তাদের সমস্যার প্রতি বুদ্ধিজীবী, সুধীসমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও গুণীজনরা এ পর‌্যায়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। মেয়েদের বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স নিয়ে আলাপ-আলোচনার কমতি নেই। এ কথা ঠিক যে প্রজনন স্বাস্থ্যের বিবেচনায় মেয়েদের বাল্যবিবাহের একটি অতিরিক্ত ক্ষতিকর দিক রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বিশেষ করে দারিদ্র্য দূরীকরণের বড় বাধা হিসেবে ছেলেদের বাল্যবিবাহ গুরুতর সংশ্লেষ বহন করে। প্রাকিকশোর বা কিশোর বয়সে বাল্যবিবাহের মাধ্যমে জৈবিক চাহিদা মেটানোর যে বল্গাহীন সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা একটি ছেলের স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট ক্ষতিকর হতে পারে। সুতরাং বাল্যবিবাহ কিশোর বালকের স্বাস্থ্যের জন্য কোনোভাবেই ক্ষতিকর নয়, এরূপ ধারণা থেকে আত্মতৃপ্তি অনুভব করা যৌক্তিক হবে না।

বাল্যবিবাহ, তা ছেলে কিংবা মেয়ে যারই হোক না কেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। এ সমস্যা বিত্তহীন ও নিম্নবিত্তের পারিবারিক অর্থনীতির ভিতকে কুরে কুরে খায়। একটি সক্ষম বালকের কিঞ্চিৎ বাড়তি আয়ের মাধ্যমে যখন গরিব পরিবারটির চরম দারিদ্র্য কিছুটা নিরসন হতে চলছে তখনই হয়তো দেখা গেল বাল্যবিবাহের ঘেরাটোপে বালকটি আটকে পড়েছে। পরিবার তার বাড়তি আয়ের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়ে আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। বালক নিজেও তার স্বল্প আয়ে বিবাহিতজীবনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। যদি বালকটির বিয়ে আরো কয়েক বছর, ধরা যাক অন্তত পাঁচ-ছয় বছর পেছানো যেত, তাহলে ছেলের বাড়তি আয় থেকে অল্প অল্প করে পারিবারিক সঞ্চয় বৃদ্ধি করে পরিবারটি চরম দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের একটা প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারত। ছেলের বাল্যবিবাহের কারণে সে সুযোগ হারিয়ে তারা চিরদারিদ্র্যের আবর্তে খাবি খেতে লাগল। এ দুঃখের আদৌ অবসান হবে কি না তারা জানে না।

এ লেখার মাধ্যমে আমি মূলত বালকদের বাল্যবিবাহের সমস্যাটি তুলে ধরলাম। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে এ সমস্যার সমাধান কী। আমার উত্তর হচ্ছে, এ সমস্যার তাত্ক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। এটি একটি জটিল সামাজিক, জৈবিক (ইরড়ষড়মরপধষ), নৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। প্রায় তিন যুগ বিভিন্ন পর‌্যায়ে ও বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রচেষ্টা চালানোর পর মেয়েদের বাল্যবিবাহ রোধের আন্দোলনে আমরা গতিশীলতার আভাস দেখতে পাচ্ছি, যদিও এখনো যেতে হবে অনেক দূরে। আমার বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে আমরা দিগন্তে সফলতার আভা দেখতে পাব। মনে হচ্ছে, এ আন্দোলন থেমে যাওয়ার বা শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা নেই। নিজ গতিতে (গড়সবহঃঁস) এগিয়ে যাবে।

বালকদের বাল্যবিবাহ রোধের প্রচেষ্টা আমাদের শুরু করতে হবে। ধারণাটি এখনো সচেতন নাগরিক গোষ্ঠীর মনে দাগ কাটেনি। ধারণাটি এর সুদূরপ্রসারী সংশ্লেষসহ ব্যাখ্যায়িত হয়নি। একপর‌্যায়ে বিষয়টির ওপর অনেক লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। অগ্রসরমাণ জনগোষ্ঠী ও চিন্তাশীল জনগোষ্ঠী সমস্যাটি হূদয়ঙ্গম করতে পারলে বালকদের বাল্যবিবাহ রোধের আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত গতি লাভ করবে। এ লক্ষ্যেই আমার লেখাটি নিবেদন করলাম।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান
সূত্র : কালের কণ্ঠ

You Might Also Like