শ্রেষ্ঠ বসন্তের অন্বেষায়

Alamgir mohiuddinআলমগীর মহিউদ্দিন

স্কুলের বাংলা শিক্ষক ষড়ঋতু পড়াতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, এ দেশে ঋতু আসলে তিনটিÑ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত। আর তিনটি কবি কল্পনাÑ রোমানটিসিজম। তবে শীতের দেশে যেমন ইউরোপে ঋতু চারটি স্প্রিং (বসন্ত), সামার (গ্রীষ্ম) ফল বা অটাম (শরৎ) এবং উইন্টার (শীত)। এরা সবাই স্পষ্ট। বেশ লম্বা আলোচনা তিনি করেছিলেন। শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত নিয়ে তিনি বলেছিলেন, এগুলো অন্য স্পষ্ট ঋতুগুলোর কিনারা সামলায়, কখন মিশে যায়, বোঝাই যায় না। যেমন বসন্ত, অর্ধেক বেশ শীত আর অপর অর্ধাংশ বেশ গরম (১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল)।

তাহলে বসন্ত নিয়ে এত কথা-কবিতা-কল্পনা-রাজনীতি কেন? আর এ ঋতু নিয়ে বই-বক্তব্য-অনুষ্ঠানের ঘাটতি হয় না কেন? শুধু তা-ই নয়, এই একটি শব্দের অন্তত ১৯টি প্রতিশব্দ রয়েছে বাংলা ভাষায়। ইংরেজি বা ইউরোপীয় ভাষায় এর অনেক প্রতিশব্দ থাকা স্বাভাবিক। কারণ, ঋতুটি শীতের দেশে বেশ স্পষ্ট এবং প্রিয়।

আসলে ইউরোপীয় গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন ইংরেজির ‘স্প্রিং’ শব্দটির প্রকাশ হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে ‘স্প্রিং ইং-টাইম’ হিসেবে। কারণ, এ সময় উদ্ভিদগুলো মাটি থেকে বেরোতে শুরু করে আর গাছ ফুলে-ফলে আবৃত হতে শুরু করে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে শব্দটি একটু ছোট হয়ে হলো ‘স্প্রিং-টাইম’। পরের শতাব্দীতে এটা হলো শুধু ‘স্প্রিং’। এমন গবেষণা এ দেশের ঋতু নিয়ে হয়েছে কি না জানা নেই।

শীতের দেশে ‘স্প্রিং’ (বসন্ত) নিয়ে আবেগের একটি ভিত্তি আছে। তীব্র শীতের ভয়াবহতা থেকে বেরিয়ে সদা চঞ্চল (কারণ এ সময় আবহাওয়া অত্যন্ত পরিবর্তনশীল থাকে, সব সময় ছাতা নিয়ে বেরুতে হয়) অথচ আনন্দময় সময়ে পা দেয় তারা। তাই বসন্ত নিয়ে এত তাদের রোমান্টিকতা, অনুষ্ঠান। বাংলাদেশে বসন্তের চিহ্ন প্রায় অগোচরেই থাকে। তাই অনেক বোদ্ধাজনেরা বসন্ত নিয়ে আলোচনাকে পশ্চিমা অনুকরণ এবং আদিখ্যেতাও বলেন।

তবে বসন্তের বর্ণনা যেভাবেই করা হোক না, সবার মনে বসন্ত মানে এটা বছরের একটি আনন্দময় সময়, উপভোগের সময় বলে আসন গেড়ে বসে আছে। তাই আরবের একটি দেশে অধিকার আদায়ের তীব্র রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের নাম পশ্চিমা বিশ্ব দিলো ‘আরব বসন্ত’।

তবে আজকের বসন্ত নিয়ে আলোচনার মূলে সম্প্রতি পাওয়া একটি বই ‘আমার দেখা শ্রেষ্ঠ বসন্ত, ১৯৭১’। লেখক অনুসন্ধানী অর্থনীতিবিষয়ক প্রখ্যাত সাংবাদিক ফজলুল বারী। ২০১২-১৩ সালের সাপ্তাহিক কলামগুলো একত্র করে বারী বইটি প্রকাশনা করেছেন। তার মন্তব্য-বক্তব্য-অবস্থার বর্ণনা এক বছর পরেও যেন মনে হবে অতি সাম্প্রতিক। আর তার বইয়ের ভূমিকা লেখক কবি মজিদ মামুন বলেছেন বইয়ের নামটি ‘একটি প্রতীকী প্রকাশ’। কথাটা অত্যন্ত সত্য। ৩৩টি নিবন্ধের কোথাও আনন্দ-উপভোগের বর্ণনা নেই। লেখকের ভাষায় ‘মনে হয় বিজয়ের গৌরব ও অহঙ্কার সব ঢাকা পড়ে যাবে কালো মেঘের আঁধারে।’ আর মজিদের কথায় ‘যে সেরাটার জন্য বাঙালি জাতি একদিন লড়াই করেছিল, তা এখনো অর্জিত হয়নি।’ কেন অর্জিত হয়নি? এর জবাব লেখক তার প্রধান নিবন্ধে দিয়েছেন। ‘স্বপ্নভঙ্গ হলো স্বাধীনতার পর, রণাঙ্গনের বন্ধু যখন লোভাতুর হয়ে উঠল। বন্ধু যা দেখে তাই তার পছন্দ হয়ে যায়। অতিথিপরায়ণ বাঙালি, বন্ধুকে প্রথম দিকে যা চেয়েছে তার প্রায় সবই দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে যখন চৈতন্য ফিরে পায় তখন প্রথমে প্রতিবাদ, পরে প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে শুরু করে রণাঙ্গনের বন্ধুরা … বন্ধুরা কৌশলী ভূমিকা নেয়। জাতিকে বিভক্ত করার কূট চাল দিতে শুরু করে। তাতে তারা অনেকটাই সফল হয়। এখন আমরা শত্রু-মিত্র চিনতে পারি না …. কাজেই যুদ্ধটা এখন ছায়ার সাথেই হচ্ছে। এ যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন।’ বারীর সাথে একমত না হয়ে উপায় নেই। এমন যুদ্ধ জয় করা কঠিন।

রাজনীতিতে এখন আস্থার তীব্র সঙ্কট। প্রধান খেলোয়াড়দের ক্ষমতাবান অংশ কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। অথচ জাতির জন্য রাজনীতির মূল প্রশ্নে আলোচনা এবং ছাড় অপরিহার্য। বারীর এ বিষয়ে একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

‘বিয়াল্লিশ বছর আগে সাধারণ মানুষও মর্যাদাসহকারে বসবাস করতেন। জ্ঞানী, গুণী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বিশেষ মর্যাদা ভোগ করতেন। আজ দেশে কারো মর্যাদা নেই, নেই নিরাপত্তা জান ও মালের।’

হয়তো সে জন্যই বারী যুদ্ধ-বিুব্ধ সংগ্রামী সময়ের নাম দিয়েছেন ‘শ্রেষ্ঠ বসন্ত’। কারণ তখন মানুষ যন্ত্রণা-আর্তনাদের মাঝেও আশার-আনন্দের আলো দেখেছিল, দেখেছিল বসন্তের। বসন্তের উনিশ প্রতিশব্দের মাঝে আছে উল্লম্ফন, নির্ঝর, সূচনা, উৎস। এসবই সেই চঞ্চল-অশান্ত সময়ে দেখেছিল।

এখানে মনে পড়ল বসন্ত নিয়ে এক বিখ্যাত মহান মানুষের অপ্রকাশিত মন্তব্য। সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি সম্পাদকীয় সভায় বললেন, ‘গতানুগতিক না, একটু নতুনভাবে করা যায় না?’ তার সাথে একমত হয়ে নির্বাহী সম্পাদক শহীদুল হক জানতে চাইলেন ‘আইডিয়া’টা। মনি বললেন, ‘ওকে (অর্থাৎ আমাকে) সারা দিন বঙ্গবন্ধুর সাথে থাকতে হবে এবং তার ওপর এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিবেদন দেবে। সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের বিশেষ আয়োজন।

সেই পরিকল্পনা অনুসারে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের সকালেই গণভবনে হাজির হলাম এবং সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রাতরাশ শেষে লক্ষ রাখতে শুরু করলাম নানা ঘটনার। ১০টার দিকে ডাক পড়ল। বঙ্গবন্ধু গণভবনের চত্বরে আলু উঠাবেন। পরে জেনেছিলাম বঙ্গবন্ধুর কোনো স্থান পতিত না রাখার আহ্বানের সম্মানে গণভবন চত্বরে আলুর চাষ করা হয়েছিল। স্মর্তব্য, সেবার খাবারের অভাব পরিলক্ষিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু এই আহ্বান দেশবাসীর প্রতি করেছিলেন। ওপর থেকে নামতে নামতে ভাবছিলাম বঙ্গবন্ধুকে কী প্রশ্ন করা যায়। বঙ্গবন্ধু কোদাল দিয়ে দু’টি কোপ দেয়ার পর বড় বড় আলু বেরোল।

সবাই অভিভূত। দু’টি কারণে। এক. এমন একজন মানুষ যাকে বিশ্বের সবাই চিনে এবং যার বাক্যই আইন ও সংবিধান, তিনি এমন সাধারণ কাজ করছেন; দুই. তিনি রাষ্ট্রের ুদ্রাতিুদ্র বিষয়টি উপেক্ষা করছেন না।

আমার নিজের অজ্ঞাতেই এক বেফাস মন্তব্য করে ফেললাম। বললাম, ‘এটা তো বসন্তের ফসল, তাই এত ভালো ফলন হয়েছে। আর আপনার জন্মও বসন্তকালে।’ বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবসুলভ অট্টহাসি দিতেই, আমার ভুল বুঝলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এখন বোধকরি গ্রীষ্মকাল। তুই বসন্ত কোথায় পেলি?’

আগের রাতে ‘ইংরেজি সাহিত্যে বসন্ত আলোচনা করেছিলাম, এক সমাবেশে। তাই হয়তো মাথায় ঘুরছিল। বঙ্গবন্ধুকে এসে বললাম, ‘আসলে ইংরেজি হিসেবে এখন বসন্তকাল। আপনি যদি ইউরোপে জন্মগ্রহণ করতেন তাহলে আপনার জন্ম বসন্তকালই বলা হতো। আরো একটি প্রশ্ন করেছিলাম তাকে। তিনি একটু দিগন্তের দিকে তাকিয়ে খানিকটা মনোলগের মতোই বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই। যদি দেশটা, দেশের মানুষ বসন্তের আমেজেই থাকতে পারত।’ পরে এই সারা দিনের প্রতিবেদন বাংলাদেশ টাইমসে ‘ওহ ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন’ নামে ছাপা হয়।

এ কথা সত্যি রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক, এমনকি সংস্কৃতি ও জীবনব্যবস্থা। রাজনৈতিক ব্যবহারের মাঝে সমাজের আচারেরও পরিবর্তন ঘটে। বারী তার বিভাজনে শঙ্কা ঐক্যে শক্তি নিবন্ধে একটা শক্ত অথচ সত্য মন্তব্য করেছেন। “দেশের ৪২তম বিজয় মাসেও রাজনীতিকদের আচরণ ছিল শিষ্টাচারবহির্ভূত। রাজনৈতিক বচন ছিল মিথ্যাশ্রয়ী, হিংসাত্মক ও নৈরাজ্যমুখী। আগামীতে সহিংসতা আরো বেড়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।’ চার দিকে তাকালে যেন মনে হবে এরচেয়ে ভালো বর্ণনা সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে এক মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর মন্তব্যও মনে পড়ল। নানা আলোচনার মধ্যে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এক্সেলেন্সি, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর এ দুর্দশা কেন? অনেক কথার মাঝে তিনি বললেন, ‘দেখুন না, আপনাদের দেশের কথাই। এক সময়ে আমাদের ছেলেরা আপনাদের ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত, চাকরির আশায় এখানে আসত। এখন আপনারাই যাচ্ছেন।’ কারণ? জানতে চাইলাম। তিনি বললেন (কিছু বিশ্লেষণের পরে) ‘আপনারা সৎ নেতৃত্ব পাননি। যাও বা পেয়েছিলেন, তিনি টেকেননি। অথচ আমরা পরপর তিনজন সৎ নেতৃত্ব পেয়েছিলাম, এরা মালয়েশিয়াকে মালয়েশিয়া বানিয়ে দিয়ে গেছেন।’ অনেক জায়গায়, এ মন্ত্রীকে আমি স্মরণ করি। চমৎকার কথা। জাতির ভাগ্যে বসন্তের উদয় হতে পারে শুধু সৎ নেতৃত্বের কারণে। সে ভাগ্য কি এ জাতির হবে?

সৎ ও সততার জন্ম শুধু পরিবারে হয় না। পরিবেশ এখন প্রধান ভূমিকা পালন করে। আজকের পরিবেশের উদ্ভব এক দিনে হয়নি সত্য। এখন এর পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব। অনেক কারণের মাঝে একটি হলো ধর্ম ও ধার্মিকতাকে ক্রমান্বয়ে নিন্দা করা হয়েছে এবং সমাজে অপাঙ্ক্তেয় করার প্রচণ্ড ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলছে। অথচ ধর্মই শুধু নৈতিকতার কথা বলে এবং স্থাপন করতে পারে। একজন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক দুই-তিন লাখ টাকা ব্যয় করে চাকরি পায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এত টাকা কোথায় পেলেন? তিনি বললেন, ‘ধার করেছি। আমার টার্গেট প্রথম দুই-তিন বছরে এ টাকা তুলে ফেলতে হবে। বললাম, ‘তাহলে ভালো মানুষ পয়দা করবেন কেমন করে?’ তিনি রেগে বললেন, ‘কী আমার ঠেকা? আপনার সরকারকে বলুন না, ঘুষ-চাঁদাবাজির রাজত্ব শেষ করতে।’ এ ঘটনা প্রমাণ করে, ভালো মানুষ গড়ার কারখানাতেই তার আসল এজেন্ডা উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। তাহলে কি জনগণ আর সত্যিকারের বসন্তের দেখা পাবে না?

You Might Also Like