দায় নেবেন না প্রধানমন্ত্রী?

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরও নিয়ন্ত্রণে নেই!এ দেশে মন্ত্রীদের অনেক ক্ষেত্রে নির্লজ্জ, ব্যক্তিত্বহীন বা নিষ্ঠুর ধরনের বোধশক্তিহীন থাকতে হয়। নতুন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এখনো তা পুরোপুরি হতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। নারায়ণগঞ্জে লোমহর্ষক, শোচনীয় ও হূদয়বিদারক অপহরণ ঘটনার পর অপহূত কাউন্সিলর নজরুলের পরিবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিল। তিনি কিছু করতে পারেননি বলে তাঁর কিছুটা অনুশোচনা হয়েছে। তিনি দেরিতে হলেও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কথা পুলিশের কেউ শোনেননি। তিনি অবশেষে ওপরের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। ওপরের নির্দেশ এসেছে তিন দিন পর অপহূত আটজনের মধ্যে ছয়জনের পেটচেরা লাশ শীতলক্ষ্যায় ভেসে ওঠার পর। নির্দেশ এসেছে খুনিদের গ্রেপ্তারের।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ পেয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। সেখান থেকে তিনি বের হওয়ার পর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন এখনো ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জে অপহরণ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। দু-এক দিনের মধ্যে বড় কিছু দেখতে পাবেন।’

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই কথা থেকে আমরা তাহলে খুব যুক্তিসংগত কিছু উপসংহার টানতে পারি। এক. প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গুম ও অপহরণের ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয় না। দুই. এ ধরনের নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীর তিন দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে এবং এর মধ্যে অপহূত ব্যক্তি পেটচেরা লাশে পরিণত হতে পারেন। তিন. প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত অপহরণ ও গুমের ঘটনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন, কিছু ক্ষেত্রে দেন না। যেমন চৌধুরী আলম বা ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় তিনি কি কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন? তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর যে প্রায় অর্ধশত অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে এ বি সিদ্দিক বা এ রকম দু-একটি ঘটনা বাদে অন্য কোনো ক্ষেত্রে আমরা এমন নির্দেশের কথা শুনিনি। তিনি যদি অপ্রকাশ্যে এই নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে বলতে হবে, তাঁর নির্দেশ সত্ত্বেও বহু অপহরণ ও গুমের ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এর মানে হচ্ছে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরও নিয়ন্ত্রণে নেই।

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে কাজ হয়, এমন কথা অবশ্য আমরা এর আগে বহুবার মন্ত্রীদের মুখ থেকে শুনেছি। তাঁর নির্দেশে ক্রিকেট দল পুনর্গঠিত হয়, রেশমা উদ্ধার হন, লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তো তাঁর সরাসরি কর্তৃত্বাধীন। তিনি তাই সময়মতো নির্দেশ দিলে কাউন্সিলর নজরুলসহ অপহূত বহু মানুষ উধাও হওয়ার পরপরই জীবিত উদ্ধার হওয়ার কথা। এ বি সিদ্দিক তাঁর নির্দেশনাতেই জীবিত অবস্থায় ফেরত আসতে পেরেছেন বলে আমরা শুনেছি। তিনি তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর (এমনকি তারও আগে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে) পুলিশকে গুম বা অপহরণের অভিযোগ পাওয়ামাত্র তাঁদের উদ্ধারের স্ট্যান্ডিং অর্ডার দিয়ে রাখলে পারতেন। পুলিশ এমন অভিযানে নামে না, অনেক ক্ষেত্রে মামলাই গ্রহণ করে না। এর মানে কি এই নয় যে অপরাধী গ্রেপ্তার ও অপহূতকে উদ্ধারের জন্য তাদের ওপর কারও স্থায়ী নির্দেশ নেই? অপহরণ ও গুমের মামলা গ্রহণ ও সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার পুলিশের এক নম্বর আইনি কর্তব্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা সেই দায়িত্ব পালন করে কেবল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেলে। এই নির্দেশ তিনি যদি নির্বাচিত ক্ষেত্রে দিয়ে থাকেন, তাহলে অপহরণ ও গুম যে থামছে না, এর আইনগত দায়দায়িত্ব কি প্রধানমন্ত্রীরই নয়?

দুই

নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনাটি ঘটেছে চাঞ্চল্যকর এ বি সিদ্দিক অপহরণের ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মাথায়। এ ঘটনায় দেশের রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের একটি বিরাট অংশ সংগঠিতভাবে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এ বি সিদ্দিক অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু কারা তাঁকে অপহরণ করেছিল, তার কোনো কূল-কিনারা হয়নি। হবে যে তার কোনো আলামতও নেই। এ বি সিদ্দিক ফিরে আসার পর আমাদের কেউ কেউ ভেবেছিলেন, অপহরণের ঘটনা কিছুটা হলেও কমবে এবার। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করলে, তাদের বিচার না হলে এ ধরনের ঘটনা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয় না? কেন তাদের গ্রেপ্তার করা যায় না?

অপরাধীরা আসলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হয় না তাদের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার জন্য। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার দিকে আমরা দৃষ্টি ফেরাই। এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগের একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা নূর হোসেনকে দায়ী করে মামলা করা হয়েছে। নজরুলের পরিবার বলেছে, এর আগেও নূর হোসেন নজরুলকে হত্যার চেষ্টা করেছেন। নূর হোসেন একসময় বিএনপির রাজনীতি করতেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগের নেতা তিনি। অপরাধী হিসেবে তাঁর দাপট শুরু হয় এর পরই। তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে নারায়ণগঞ্জের দুটি থানায়। তাঁকে কেউ গ্রেপ্তার করেনি। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে তিনি নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কোনো শাস্তি হয়নি। নদী দখলের ঘটনায় ২০১০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধাদান, সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি প্রদান এবং নদীতীরের জমি দখলের অভিযোগ করেছেন স্বয়ং নদীবন্দরের কর্মকর্তা। সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২২টি চিঠি দেওয়া হয়েছে, কাজ হয়নি।

নূর হোসেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকা মানুষ। হত্যা, অপহরণ, নদী দখল, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য, সরকারি কাজে বাধাদান করার পরও তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ, প্রশাসন, আদালত কিছুই করতে পারেননি। সাতজনকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগের পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলাই নিতে চায়নি পুলিশ। অপহরণ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কিছুই করা যায়নি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ না আসা পর্যন্ত। বিরোধী দলের কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এর চেয়ে অনেক হালকা অভিযোগের পরও আমরা প্রশাসন, পুলিশ ও আদালতকে ব্যবস্থা নিতে দেখি। কিন্তু নূর হোসেনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। এর প্রধান কারণ কি এটিই নয় যে সামান্য ওয়ার্ড পর্যায়ের হলেও তিনি আওয়ামী লীগের নেতা?

নূর হোসেন স্থানীয় সাংসদ শামীম ওসমানের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা নেতা। স্বয়ং শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে এ রকম হাজারো অভিযোগ থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। নিষ্পাপ কিশোর ত্বকী হত্যাকাণ্ডে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের পর বরং ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দিয়ে সাংসদ করা হয়েছে। এই সুযোগ শামীম ওসমান ও নূর হোসেনের মতো লোকদের এবং দলীয়করণের মাধ্যমে সাজানো পুলিশ ও প্রশাসনকে কী বার্তা দিয়েছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আওয়ামী লীগেরও প্রধান নেতা। নারায়ণগঞ্জের অভিযুক্ত খুনিদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করার দায়দায়িত্ব তাহলে কার?

তিন

অপহরণ ও গুমের অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা জড়িত। এসব ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয় না বা তদন্ত করে না এবং অপহূত ব্যক্তি সাধারণত আর ফিরে আসেন না। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, অপরাধী চক্র অপহরণ ও গুমের জন্য অর্থের বিনিময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিগ্রস্ত অংশকে ব্যবহার করছে, এই ধারণা অমূলক নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বহু ঘটনায় তা-ই ঘটছে। নারায়ণগঞ্জে দিনের বেলায় ব্যস্ত রাজপথে সাতজন লোককে গাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার সাহস র‌্যাব-পুলিশের নিজের বা (র‌্যাব-পুলিশের যোগসাজশে) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোকজন ছাড়া অন্য কারও থাকার কথা নয়। অপহরণের অনেক ঘটনায় র‌্যাব বা পুলিশের গাড়ি ও পোশাক ব্যবহার করা হয়েছে, এমন অভিযোগ পত্রপত্রিকায় এসেছে। এসব ঘটনার বিচার হয় না এবং হবে না, এই নিশ্চিত বিশ্বাস থাকলেই কেবল পুলিশ আর র‌্যাবের নিজে থেকে তা করা সম্ভব। এগুলো করার জন্য ভাড়া খাটা সম্ভব, তাদের ভাড়া খাটানো যায়, এটি ভাবা প্রভাবশালী মহলের পক্ষে সম্ভব। এসব ঘটনার দায় পুলিশ আর র‌্যাব প্রতিষ্ঠান হিসেবে কত দিন মেনে নেবে, কত দিন সরকারপ্রধান হিসেবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসব সহ্য করবেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পর বলেছিলেন, এ দেশে দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটল, অপরাধ করে কেউ আর পার পাবে না। আপনার সেই কথা কি আপনারই মনে আছে? আপনার কি কখনো মনে হয় যে নৃশংস ঘটনায় পরিবারের সবাইকে হারিয়ে আপনি যে দুঃসহ বেদনা অনুভব করেন নিরন্তর, ঠিক তেমন বেদনায় বুক বিদীর্ণ হচ্ছে গুম আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার বহু পরিবারের। সাধারণ অপরাধীদের হাতে এমন ঘটনা ঘটলে তবু নাহয় নিজেকে প্রবোধ দেওয়া যায়। কিন্তু যদি এসব ঘটনায় জড়িত থাকেন সাধারণ মানুষের করের অর্থে লালিত সরকারি বাহিনী কিংবা সরকারি দলের নেতারা, তাহলে এই দুঃখ মানুষ রাখবে কোথায়? যে হাহাকার চিরতরে মানসিকভাবে নিঃস্ব করেছে আপনাকে, আপনার প্রভাবাধীন দল ও প্রশাসনের কেউ তেমনিভাবে অন্যদের নিঃস্ব করলে আপনি কেন রুখে দাঁড়ান না তাদের বিরুদ্ধে?

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

(প্রথম আলো)

You Might Also Like