সাইবার অপরাধ ও আইনের ব্যবহার

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা দ্রুত বেড়ে চলেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধপ্রবণতাও। অবশ্য অপরাধ দমনে সরকার সতর্ক এবং কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যেই এ-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন, তা সংশোধনের মাধ্যমে সরকার যথেষ্ট সচেতন ও তৎপর রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রত্যয়ে সর্বত্রই প্রযুক্তিগত ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় এর অপব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইদানীং প্রযুক্তির সুফল বেড়েছে অনেক। কিন্তু কুফলের মাত্রাও কম নয়। আর এ ক্ষেত্রে কুফলের ফলাফল অতিমাত্রায় ভয়ংকর। আমরা কী পরিমাণ সুফল ও কুফল ভোগ করছি, তা পরিমাপ করতে চাই না। তবে নির্দিষ্ট করা জরুরি যে কুফলের মধ্যে অন্যতম প্রযুক্তিগত অপরাধ। অপরাধপ্রবণ মানুষ সাইবার স্পেসে বিভিন্ন রকম অপরাধ সংঘটন করে থাকে। আর এ কারণে সাধারণ সচেতন মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিগত অপরাধ নিয়ে উদ্বিগ্নতাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিককালে হ্যাকারদের উৎপাতে ইন্টারনেট ব্যবহারে সবারই ভীতি বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট আইডিগুলো হ্যাকারদের দৃষ্টিতে থাকছে সর্বক্ষণ। প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ আইডিগুলো হ্যাকিং হচ্ছে। অ্যাকাউন্ট হ্যাকারদের কবলে পড়লে কখনো সেটি উদ্ধার হয় আবার কখনো তা আদৌ হয় না। দুঃখের বিষয় হলো, প্রতিনিয়ত সাইবার ক্রাইম ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আইনের ব্যবহারের উদ্যোগ থাকলেও দেশের কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আপডেট পরিসংখ্যান নেই। অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষিত-দক্ষ জনবল ও সচেতনতার অভাবেই সাইবার ক্রাইমের প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বিচার না হওয়া, আইনের সীমাবদ্ধতা, আইন ও অপরাধ সম্পর্কে অজ্ঞতাও সাইবার ক্রাইমের মূল কারণ বলে মনে হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি সূত্রে জানা যায়, আইসিটি আইন সংশোধন হওয়ার পর ২০১৩ সালে ৩৫টি, ২০১৪ সালে ৬৫টি এবং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১০০টির বেশি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আইসিটি আইনে ৬২টি এবং পর্নোগ্রাফি আইনে ৩১টি মামলা করা হয়। এ পর্যন্ত ৪২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে ‘সাইবার নিরাপদ হেলপ ডেস্ক’ চালুর পর ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত ১৩ মাসে ১০ হাজার ২৬১টি অপরাধের ঘটনায় তাদের কাছে সাহায্য চেয়েছে ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে ফেসবুক অপরাধ ৪০ শতাংশ, অনলাইন ৭ শতাংশ, পর্নোগ্রাফি ৫ শতাংশ, ক্রেডিট কার্ড ৫ শতাংশ, রাজনৈতিক ৪ শতাংশ, মোবাইল ব্যাংকিং ৫ শতাংশ এবং ই-মেইলসংক্রান্ত অপরাধ ১০ শতাংশ (১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫, দৈনিক আমাদের সময়)। এ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে অপরাধের মাত্রা কিছুটা অনুমান করা গেলেও বিভিন্ন কারণে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত হয় না। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো অনেকেই অপরাধের শিকার হয়েও মানমর্যাদার ভয়ে তা গোপন রাখছে। অভিযোগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি অনলাইন কার্যক্রমের মধ্যে যুক্ত হয়েছে কেনাকাটা কিংবা বেচাকেনা। আর এ ক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত হয়রানি ও বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে গ্রাহকরা। আর হয়রানির শিকার হওয়া এই গ্রাহকদের তালিকার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নারী। কোনো সুনির্দিষ্ট আইন কিংবা নীতিমালা না মেনেই অনলাইন বেচাকেনার দোকান খুলে বসেছে অসংখ্য ব্যবসায়ী মহল, যাদের অনেকের উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও কিছু অংশের উদ্দেশ্য ইতিবাচক নয়।

বেশির ভাগ পরিসংখ্যান থেকে তথ্য পাওয়া যায় যে প্রকৃতপক্ষে সাইবার অপরাধে বেশি শিকার হচ্ছে নারীরা। আর এ কারণেই সঠিক পরিসংখ্যানটি পাওয়া যাচ্ছে না সাইবার অপরাধের। হয়রানি, মানসম্মান হারানো ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয় এবং অজ্ঞতার কারণে থানার পুলিশ কিংবা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিতে চায় না তারা। গোয়েন্দা সংস্থা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের তথ্য মতে, সাইবার ক্রাইমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে ফেসবুক। আর এখানেও সাইবার ক্রাইমের কারণে সবচেয়ে ভুক্তভোগী নারীরা। বিটিআরসি সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে চলতি বছরের প্রথম দিক পর্যন্ত বিটিআরসিতে সাইবার ক্রাইমের ২২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই হচ্ছে ফেসবুক-সংক্রান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে এ সংখ্যার অনুপাত আরো কয়েক গুণ বেড়েছে। অভিযোগগুলোর বেশির ভাগের ধরন হলো ভুয়া আইডি খুলে স্ক্যান্ডাল ছড়ানো, আপত্তিকর, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আপত্তিকর ছবি আপলোড করা।

এ ছাড়া উগ্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতবাদ বা মৌলবাদ প্রচার। সম্প্রতি সাইবারজগতের মাধ্যমে বড় অপরাধ হিসেবে যোগ হয়েছে মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যা। আর এ কারণেও ইন্টারনেট ব্যবহার কিংবা স্বাধীন মতামত প্রদানে সবার মনেই আতঙ্ক কাজ করছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র ও ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর প্রচারণা, প্রতারণা ও পর্নোগ্রাফির অভিযোগে ৪০টি ফেসবুক পেজ ও ব্লগ বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার অপরাধ সারা দেশে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে বর্তমান আইসিটি আইনের ধারায় সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রণয়নের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কারণ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় কেবল কারো সম্মানহানি হলে, রাষ্ট্র বা সমাজবিরোধী কোনো তৎপরতা হলে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রতারণা বা অন্য অপরাধ, যেমন এক দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা চালাতে পারে, সে ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো উল্লেখযোগ্য বিধান না থাকায় এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।

ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে অভিযোগ থাকলে ০১৭৬৬-৬৭৮৮৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি জানিয়েছেন, সরকারের ‘সাইবার সিকিউরিটি ফোর্স’ নামে একটি বিভাগ রয়েছে। সেখানে যে কেউ সাইবার অপরাধসংক্রান্ত আভিযোগ করতে পারবে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। প্রকৃতপক্ষেই এ অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, এ কথাটি না বললেই নয় যে সাইবার ক্রাইম আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা না থাকায় এ অপরাধী চক্র প্রতিনিয়ত নানা ভয়ংকর অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যথেষ্ট ধারণা না থাকায় এ অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। এ-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে সাইবার অপরাধীদের যথাযথভাবে জানা থাকলে তারাও এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠার সাহস পেত না। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও অধিকতর উদ্যোগ গ্রহণ করে সাইবার নিরাপত্তা আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগে অপরাধীদের শাস্তি প্রদান ও গণমাধ্যমে তা প্রচারের ব্যবস্থা করলে এ-সংক্রান্ত অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

 

 

You Might Also Like