প্যারিস হামলায় অংশ নেয় তিনটি দল, এক হামলাকারী চিহ্নিত

প্যারিসের ভয়াবহ হামলায় সন্ত্রাসীদের তিনটি দল অংশ নিয়েছিল বলে ফ্রান্সের প্রধান কৌঁসুলি ফ্রাঁসোয়া মলিয়েঁ জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও সেন্ট-ড্যানিসের অন্তত সাতটি স্থানে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে সিরিজ হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ১৩০ জন নিহত এবং সাড়ে তিনশ’র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। হামলার জন্য তাকফিরি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী দায়েশকে (আইএসআইএল) দায়ী করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে দায়েশের ‘মিডিয়া গ্রুপ’ আল হায়াত মিডিয়া সেন্টারের একটি বার্তা এসেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে। আরবি ও ফরাসি ভাষায় দেয়া ওই বিবৃতির একটি অডিও ইউটিউবে ছাড়া হয়।

শনিবার সন্ধ্যায় প্যারিসে প্রধান কৌঁসুলি মলিয়েঁ সাংবাদিকদের বলেন, “তদন্তের এ পর্যায়ে আমরা বলতে পারি, জঘন্য এই কাজে সম্ভবত সন্ত্রাসীদের তিনটি দল ছিল, যারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে হামলা চালিয়েছে।”

বর্বরোচিত ওই হামলায় অংশ নেয়া সাতজনের সবাই নিহত হয়েছে জানিয়ে প্রধান কৌঁসুলি মলিয়েঁ বলেন, সাত জঙ্গির সবাই কালাশনিকভ রাইফেল ব্যবহার করেছেন এবং তাদের সবার একই ধরনের বিস্ফোরকভর্তি বেল্ট ছিল।

এই হামলায় জড়িত অভিযোগে শনিবার প্রতিবেশী দেশ বেলজিয়ামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মলিয়েঁ জানিয়েছেন।

নিহত হামলাকারীদের মধ্যে একজন ফরাসি নাগরিক বলে শনাক্ত হয়েছে। ৩০ বছর বয়সী ওই ফরাসির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড থাকলেও কখনো তিনি কারাগারে থাকেননি।

প্যারিসের ২৫ কিলোমিটার পশ্চিমের একটি শহরের বাসিন্দা ওই ব্যক্তি জঙ্গিদের দিকে ঝুঁকছিলেন বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে। তবে কথনো তিনি এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হননি।

তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তে দুটি গাড়ির ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছে পুলিশ। সেগুলোর মধ্যে কালো রংয়ের একটি গাড়ি দুই জায়গায় ব্যবহার করে বন্দুকধারীরা। এই গাড়িটি এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

অন্য গাড়িটি হামলার পর বাটাক্লঁ কনসার্ট হল এলাকায় পাওয়া গেছে। কালো ভক্সওয়াগন পোলো গাড়িটিতে বেলজিয়ান নিবন্ধন প্লেটস রয়েছে।

মলিয়েঁ বলেন, বেলজিয়ামে বসবাসরত এক ফরাসি গাড়িটি ভাড়া করেছিলেন। শুক্রবার সকালে অন্য দুজনকে নিয়ে বেলজিয়ান সীমান্ত পেরোনোর সময় পুলিশের একটি চৌকিতে তার পরিচয় পাওয়া যায়।

এদিকে, ফ্রান্সের সংসদ সদস্য ও শাত্রেঁ নগরীর মেয়র জঁ-পিয়েরে জর্জ জানিয়েছেন, প্যারিসে তাণ্ডব চালানো প্রথম হামলাকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসমাঈল ওমর মোস্তেফাই নামে ২৯ বছর বয়সী ওই হামলাকারী ২০১২ সাল থেকে শাত্রেঁ শহরে বসবাস করছেন। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্যারিসের ৯৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে শাত্রেঁ শহর।

মোস্তেফাইয়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে তিনি বহুবার সিরিয়া ভ্রমণ করছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

শুক্রবার রাতে ফ্রান্সের স্টেড দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়াম, ক্যামবোজ রেস্তোরাঁ, বলিভার্ড ভল্টেয়ার, বাটাক্লান থিয়েটার (রক কনসার্ট), রুয়ে ডি ফন্টেইন অ রই, রুয়ে ডি ছারনি (পাতাল রেলস্টেশন) ও রুয়ে ডি টার্মিসে একযোগে হামলা চালায় দায়েশ। হামলার পর ফ্রান্সে আড়াই হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শহরে সব ধরণের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিস বন্ধ রয়েছে।

অনিদিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আইফেল টাওয়ার। ঘোষণা করা হয়েছে তিন দিনের জাতীয় শোক। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সীমান্ত। প্যারিসের মানুষকে রাস্তায় বের হতে বারণ করা হয়েছে। প্যারিসে বাতিল করা হয়েছে পুলিশের ছুটি, হাসপাতালগুলোতে কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন কাজে রাখা হয়েছে। মেট্রোরেলের পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মার্কেট, জাদুঘর, পর্যটন স্পটও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আইফেল টাওয়ার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শহরে শুধু চালু রয়েছে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন।

You Might Also Like