নতুন অবয়ব নেবে মিয়ানমার?

বিশ্বের যে দেশটির ঘটনাবলির প্রতি সবচেয়ে বেশি দেশ এখন গভীরভাবে অবলোকন করছে, সেটির নাম সম্ভবত মিয়ানমার। একসময়ের ‘বার্মা’ নাম পাল্টে সামরিক জান্তা দেশটির নতুন নাম দেয় মিয়ানমার। সেই ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এ দেশটির ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখে এসেছে সামরিক জান্তা। এখনো যিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট সেই উ থেইন সেইনও একজন সাবেক জেনারেল। সাবেক জেনারেল ও সামরিক বাহিনী নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে দল তৈরি করেছিল ইউএসডিপি। দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) বাইরে রেখে ২০১০ সালে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে দলটি। এরপর পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে দীর্ঘ সংলাপ শেষে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিভিন্ন ধাপ পার হওয়ার পর গত ৮ নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

এই নির্বাচনের ধীরগতিতে ঘোষণা করা ফল এখনো সম্পন্ন হয়নি। নির্বাচন কমিশন সূত্র থেকে বৃহস্পতিবার সকাল নাগাদ সংসদের উচ্চকক্ষ ও নি¤œকক্ষ এবং রাজ্য বা আঞ্চলিক সংসদের এক হাজার ১৭১টি আসনের মধ্যে ৬৪৮টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয় । এর মধ্যে ৮২.৭১ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েছে অং সান সু চির এনএলডি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নি¤œ পরিষদের ৩৩০টি আসনের মধ্যে ২১৬টির ফল ঘোষণা করা হয়, যার মধ্যে এনএলডি পেয়েছে ১৭৯টি। বেসরকারিভাবে এনএলডি যে ফলাফলের কথা প্রকাশ করেছে, তাতে দলটি ২৫০ আসনের বেশি পাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চকক্ষে তাদের আসন প্রাপ্তির অনুপাত আরো বেশি।

নির্বাচনে এনএলডির এরকম নিরঙ্কুশ জয়লাভ ১৯৯০ সালেও একবার হয়েছিল। কিন্তু সে সময় ক্ষমতা লাভ করা তো দূরের কথা, উল্টো গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল সু চিকে। সেখান থেকে আবার একটি নির্বাচন পর্যন্ত আসতে তাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে দীর্ঘ ২৫ বছর। এবারের নির্বাচনের পরও কী হবে, সে সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। তবে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার গঠিত দল ইউএসডিপি, প্রেসিডেন্ট উ থেইন সেইন এবং সর্বশেষ সেনাবাহিনী (টাটমাডো) প্রধান জেনারেল মিং অং লেইন বিরোধী নেত্রী সু চি ও তার দলের বিজয় মেনে নিয়েছেন। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের ব্যাপারে জাতীয় সমঝোতার জন্য অং সান সু চি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে দৃশ্যত সাড়া দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট, সেনাপ্রধান ও স্পিকার। তারা দু-এক দিনের মধ্যেই আলোচনায় মিলিত হবেন অং সান সু চির সাথে। সম্ভবত এই বৈঠকের পরই মিয়ানমারের আগামী দিনের সরকার কিভাবে চলবে, তা চূড়ান্ত হতে পারে।

ভূরাজনীতি ও জাতিগত জটিলতা

মিয়ানমারের অবস্থান অনুসারে এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই হিসেবে দেশটিকে সার্কের সদস্য করে নেয়ার একটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন। আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংস্থা আসিয়ানেরও সদস্য মিয়ানমার। বঙ্গোপসাগরের বিশাল উপকূল রয়েছে দেশটির সাথে। এর এক দিকে বাংলাদেশ ভারত, অন্য দিকে চীন, লাওস ও থাইল্যান্ড মিলিয়ে রয়েছে বিরাট স্থলসীমান্ত। পৌনে ছয় লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এ দেশের জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ কোটি। স্বাধীন হওয়ার অল্প কয়েক বছর পর থেকে সামরিক শাসনের অধীনে থাকার ফলে সাড়ে পাঁচ দশক ধরে দেশটি ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন একঘরে হয়ে। এ দীর্ঘ সময়ে সামরিক সরকারকে সব ধরনের সহায়তা করেছে প্রধানত বৃহৎ প্রতিবেশী চীন। চীনা বংশোদ্ভূত হান সম্প্রদায়ের বিরাট জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে এখানে। দেশটির জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ বর্মী। ১৯৮২ সালে এক নাগরিকত্ব আইন করে কাচিন, কায়াহ, কারেন, চিন, বার্মান, মন, রাখাইন, শান, কামান বা জারবাদিকে জাতীয় নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। এর বাইরে, যারা ১৮২৩ সালের আগে মিয়ানমারে এসেছে অথবা দাদা-দাদী বা নানা-নানীর একজন সেখানে বসবাসরত ছিল, তাদের সহযোগী নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ১৯৪৮ সালের আগে যারা নাগরিকত্ব লাভের জন্য আবেদন করেছে, তাদের আইনগত নাগরিক হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে নাগরিকত্ব আইনে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পুরো জাতিরই মিয়ানমারের নাগরিক অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে কোনো রোহিঙ্গা এবার ভোট দিতে পারেনি। যদিও তারা দেশটির আরাকান স্টেটে ছিল একসময় সংখ্যাগুরু। দেশ থেকে দফায় দফায় বিতাড়নের পর এখন লাখ লাখ বর্মী রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে উদ্বাস্তু হিসেবে জীবনযাপন করছে। ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতি বছর মারা যায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা। অন্য কয়েকটি ছোট নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকেও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এসবকে কেন্দ্র করে অনেক দিন ধরেই চলে আসছে অসন্তোষ। সীমান্তসন্নিহিত অঞ্চলগুলোতে রয়েছে জাতিতাত্ত্বিক বিদ্রোহ। নির্বাচনের আগে এর মধ্যে কয়েকটির সাথে সরকারের শান্তিচুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় রয়েছে নানা ধরনের সঙ্কট।

মিয়ানমারে চীন-মার্কিন স্বার্থ লড়াই

মিয়ানমারে চীন-মার্কিন স্বার্থের ঠাণ্ডা লড়াই চলে এসেছে পুরনো স্নায়ুযুদ্ধ আমল থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মিয়ানমারে পশ্চিমা প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। অন্য দিকে, সামরিক শাসকদের নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে চীন নিজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তৃত করতে সচেষ্ট হয় দেশটিতে।

মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বিস্তার প্রচেষ্টা কিভাবে কাজ করেছে এ ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা গবেষণা চালিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি সমীক্ষা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিমসন সেন্টার। তারা মিয়ানমারে চীনা প্রভাব বিস্তার নিয়ে তিনটি মডেলের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, আধিপত্য বিস্তার তত্ত্ব। এ ধারণা অনুযায়ী, চীন শুরু থেকে তার প্রতিবেশী দেশটিতে একতরফা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। সামরিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সাহায্য দেয়ার মাধ্যমে এই প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে বেইজিং। এর অংশ হিসেবে চীন দেশটির বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে।

দ্বিতীয় মডেলটি হলো, অংশীদারিত্বের সম্পর্ক তত্ত্ব। এ ধারণা অনুসারে, চীন-মিয়ানমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পারস্পরিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। মিয়ানমার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় সামরিক সরঞ্জাম, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তা বেইজিং থেকে গ্রহণ করেছে। আর চীনও তার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সাড়া দিয়েছে। এ সম্পর্কের মধ্যে জোর জবরদস্তির কোনো বিষয় নেই। তৃতীয় মডেলটি হলো, প্রত্যাখ্যান তত্ত্ব। এ ধারণা অনুসারে মিয়ানমারের সরকার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে বাধ্য হয়ে চীনা সহায়তা গ্রহণ করেছে। মিয়ানমারের জনগণ ও সরকার কেউই স্বেচ্ছায় চীনের ওপর অতি নির্ভরশীল সম্পর্ক চায়নি। বর্মী জনগণ যখনই সুযোগ পেয়েছে চীনা প্রভাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আর পশ্চিমের অবরোধ ও বৈরী নীতির কারণে দেশটির সরকারের সামনে চীনা সহায়তা গ্রহণ ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না ।

পাশ্চাত্যের মিয়ানমার সম্পর্কিত অনেক বিশেষজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান শেষোক্ত মত পোষণ করে থাকে। এ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে জেনারেল থান শোয়ের জান্তা সরকার মিয়ানমারে ক্ষমতায় থাকাকালে দেশটিতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের শর্তসাপেক্ষে পশ্চিমা অবরোধ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। থান শোয়ে নিজে সামরিক জান্তার স্বার্থ রক্ষাকারী একটি দল গঠন করে সে দলকে সু চির এনএলডির অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার ব্যবস্থা করেন। বেসামরিক মোড়কে সামরিক জান্তার ক্ষমতায় থাকার এই প্রক্রিয়া পাশ্চাত্যের সম্মতিতেই হয়। আর ৮ নভেম্বর যে নির্বাচন হয়েছে, সেটিও সংস্কার সমঝোতার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য পাশ্চাত্য চেয়েছিল এবারের নির্বাচনে সংবিধানে সংশোধনী এনে এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে এনএলডি প্রধান অং সান সু চি নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকে। সরকার ও সেনা কর্তৃপক্ষ এতে সম্মত হয়নি।

মিয়ানমারে যে রাজনৈতিক সংস্কার হয়েছে সেটি পাশ্চাত্যের উদ্যোগে হলেও চীন এটাকে নিয়েছে বাস্তবতা হিসেবে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে চীন-মার্কিন যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারে দু’দেশের উপস্থিতি ও অনুসৃত নীতির ব্যাপারে পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলা হয়। এটি ঠিক যে, ভেতরে ভেতরে চীন মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সম্পৃক্ত হওয়াকে তার প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু এরপরও বাস্তবতা হিসেবে প্রতিযোগিতার মধ্যেই নিজের স্বার্থরক্ষার বিষয় নিয়ে ভাবছে বেইজিং। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, গণতন্ত্রের পথে যাত্রা এবং মানবাধিকার উন্নয়নের ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব নীতি ও অগ্রাধিকারকে চীন তার স্বাথের্র অনুকূল হিসেবে বিবেচনা করে না; তবে তা নিয়ে কোনো সঙ্ঘাতে এ মুহূর্তে জড়াতে চায় না। সব মিলিয়ে মিয়ানমারে চীন-মার্কিন সহযোগিতার যে ঘোষণা ছিল সেটি দেশটিতে নাটকীয় পরিবর্তন না আনলেও ধীর পরিবর্তনের যে সূচনা করেছিল তা একটি পর্যায়ে এবার এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। বাস্তবতা হলো, মিয়ানমারে চীন-মার্কিন সহযোগিতার ক্ষেত্র সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। তবে সেখানে চীন-মার্কিন প্রকাশ্য সঙ্ঘাতে না জড়ানোই এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে।

ক্ষমতা নিয়ে জটিলতা

মিয়ানমারের ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার পরও বিরোধী লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির প্রধান অং সান সু চির ক্ষমতায় বসা নিয়ে অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সামরিক সরকারের তৈরি করা সংবিধান। এতে আঞ্চলিক ও ইউনিয়ন বা কেন্দ্রীয় সরকারের যে রূপরেখা, তার মধ্যে অনেক চমৎকার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু এ সংবিধানে ক্ষমতায় সামরিক বাহিনীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে এমন কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সংবিধানে অং সান সু চিকে সামনে রেখে বিধান করা হয়েছে যে, এমন কোনো ব্যক্তি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না যার স্বামী স্ত্রী বা সন্তান বিদেশের নাগরিক। স ুচির দুই ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ায় এ বিধানবলে সু চির পক্ষে এত ব্যাপক বিজয়ের পরও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া সম্ভব হবে না।

অথচ সংবিধানে সূচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রেসিডেন্টই হবেন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। তিনি নির্বাচিত হবেন কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্য এবং আঞ্চলিক আইন সভার সদস্যদের নিয়ে গঠিত ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটের ভিত্তিতে। তিনি কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক ও রাজ্য সরকারের বিষয়াবলি দেখাশোনার জন্য দুজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করবেন। একই সাথে রাষ্ট্র চালানোর জন্য একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠন করবেন যাদের অনুমোদন লাভ করতে হবে সংসদে। প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীরা জবাবদিহি করবেন সংসদের কাছে। রাজ্য বা আঞ্চলিক পর্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করবেন প্রেসিডেন্ট। তবে সেই মন্ত্রিসভাকে আঞ্চলিক আইন সভার আস্থা অর্জন করতে হবে।

দেশটির সব আইন সভাতে সামরিক বাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে যাদের মনোনয়ন দেবে সেনা কর্তৃপক্ষ। আবার সংবিধানের যে কোনো সংশোধনী আনতে হলো অবশ্যই দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন লাগবে। এ ব্যবস্থার কারণে সামরিক বাহিনীর সম্মতি ছাড়া কোনোক্রমেই সংবিধান সংশোধন সম্ভব নয়। আর সংবিধান সংশোধন না হলে সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে বাধা অপসারণের অনুচ্ছেদটি বাদ দেয়ারও কোনো সুযোগ থাকবে না।

সামরিক জান্তা প্রণীত এই সংবিধান অনুসারে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয় সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সবচেয়ে মারাত্মক যে ব্যবস্থাটি রাখা হয়েছে, তা হলো, সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন মনে করলে সরকার ভেঙে দিতে পারবে।

সংবিধানের এসব ব্যবস্থার কারণে এবারের নির্বাচনে বিরোধী দল ব্যাপকভিত্তিক জনরায় পাওয়ার পরও টেকসই সরকার গঠন করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের আগে হিসাব ছিল, সামরিক বাহিনীর এক-চতুর্থাংশ আসনসংখ্যার কারণে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য এবারের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে এনএলডিকে। নির্বাচনের এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফল অনুসারে এর চেয়ে বেশি আসন পেতে যাচ্ছে সু চির দল এনএলডি। প্রশ্ন হলো, এরপর কী হতে যাচ্ছে মিয়ানমারে।

কোন পথে মিয়ানমার?

৮ নভেম্বরের নির্বাচনের পর সৃষ্ট বাস্তবতায় মিয়ানমারে কী হতে যাচ্ছে এই প্রশ্নের জবাব বেশ জটিল। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে এনএলডির জয় নিশ্চিত হলে সু চি সরকার গঠন করবেন। বর্তমান সরকারের মেয়াদ রয়েছে আরো পাঁচ মাস। থেইন সেইন চাইলে এ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মিয়ানমারের সরকার গঠন করতে চাইলে অং সান সু চিকে অবশ্যই সামরিক বাহিনীর সাথে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সু চি বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জনগণ যেহেতু ব্যাপকভাবে তার দলের পক্ষে রায় দিয়েছেন, সেহেতু বিজয়ী দলের প্রধান হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্টকে উপেক্ষা করে যে পদেই থাকুন না কেন, তিনিই সরকার চালাবেন। তার এ বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আসেনি। তবে এরপর নির্বাচন কমিশনের ফলাফল ঘোষণায় অস্বাভাবিক ধীরগতি নেমে আসে। এর অন্তর্নিহিত বার্তা বুঝতে সু চির অসুবিধা হয়নি। তিনি বিবৃতি দিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে সমঝোতার জন্য প্রেসিডেন্ট, স্পিকার ও সেনাবাহিনী প্রধানের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।

আনুষ্ঠানিক এই আলোচনা শিগগিরই শুরু হবে। তবে এর মধ্যে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। এই আলোচনায় সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কী বার্তা দেয়া হয়, সেটি দেখার বিষয়। এ ক্ষেত্রে সু চির দলের মধ্যে সামরিক বাহিনীর পছন্দের ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয়ার বিষয় থাকতে পারে। অথবা সামরিক বাহিনীর বর্তমান বা সাবেক কোনো জেনারেলকে এ পদে মনোনয়ন দেয়ার শর্ত থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে সু চির জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করার মতো একটি সমঝোতা হতে পারে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার একটি ভাগাভাগির ব্যবস্থা থাকতে পারে। সংসদের স্পিকার শোয়ে মানের এক বক্তব্যে একসময় এ ধরনের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। বিকল্প হিসেবে, রাষ্ট্র চালানোর জন্য সেনাবাহিনীর কিছু অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে বাধা অপসারণের ব্যবস্থাও হতে পারে।

মিয়ানমারে রাজনৈতিক ও সামরিক এই দু’পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা যা-ই হোক না কেন, তার ওপর নির্ভর করবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ। আর এ ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দু’দেশেরই থাকবে বিশেষ প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, মিয়ানমারে নির্বাচনের মাধ্যমে যে ধরনের ব্যাপকভিত্তিক রায় এসেছে এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশটির জনগণের প্রভাবশালী অংশের যে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা তৈরি হয়েছে, তাতে মিয়ানমারে ১৯৯০ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি সম্ভব হবে না। তবে সেনাবাহিনী কোনোভাবেই তাদের কর্তৃত্বের পুরোটা পরিত্যাগ করবে বলে মনে হয় না। তাদের পেছনে চীন যে সক্রিয় সমর্থন জোগাবে, তাতেও সন্দেহ নেই। তবে বর্তমান বাস্তবতায় চীন এনএলডির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। অবশ্য মিয়ানমার থেকে চীনা প্রভাব মুছে দেয়ার কোনো প্রচেষ্টা পশ্চিমারা গ্রহণ করলে সেটিকে মেনে নেবে না বেইজিং। ইতোমধ্যে তেমন বার্তা অং সান সু চির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন চীনা কর্মকর্তারা।

You Might Also Like