বিজেপিতে মোদির নেতৃত্ব কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে

Modi

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

নরেন্দ্র মোদি পঁচাত্তর বছর বয়স বলে যাঁদের বানপ্রস্থে পাঠানো হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাঁরাই আজ দাঁড় করিয়েছেন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, যশোবন্ত সিনহা ও শান্তাকুমারদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দলের আরও কিছু নেতা, যাঁরা উপেক্ষিত হয়ে বা না হয়ে বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ। প্রবীণদের এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় বিজেপির সাবেক সভাপতি নিতীন গড়কড়ির সুপারিশ, অবিলম্বে বিক্ষুব্ধদের কড়া শাস্তি দেওয়া হোক। বিহারে লেজে-গোবরে হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির কাছে এটা এক নতুন সংকট।

বিহার-বিপর্যয়ের পরপরই আদভানি, যোশি, যশোবন্ত ও শান্তাকুমার গত মঙ্গলবার সম্মিলিত দাবি জানান, এই গোহারা হারের জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁরা দায় স্বীকার করুন। সবাইকে উপেক্ষা করে দল যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটাই এই বিপর্যয়ের কারণ। প্রবীণ নেতারা লিখেছেন, বোঝাই যাচ্ছে যে দিল্লির ভোটের বিপর্যয় থেকে দলের বর্তমান পরিচালকেরা কোনো শিক্ষাই নেননি। দলের সর্বসম্মত চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে। দল এখন কয়েকজনের জো হুজুর পার্টিতে পরিণত। অবিলম্বে বৈঠক ডেকে এই পরাজয়ের সার্বিক পর্যালোচনা করা উচিত। দায় চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

গত মঙ্গলবার প্রবীণদের এই আক্রমণে প্রথম সামাল দেন দলের তিন সাবেক সভাপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু, রাজনাথ সিং ও নিতীন গড়কড়ি। পাল্টা এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অটল বিহারি বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদভানিদের নেতৃত্বে দল এগিয়েছে। এটা দলের সৌভাগ্য। তাঁরাই দলে যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁরাই শিখিয়েছেন, জেতা বা হারের কৃতিত্ব বা দায় কারও একার নয়, সবার। বিপর্যয়ের কারণ যে শুধু মোদি-শাহ জুটি নয়; তিন সাবেক সভাপতি তা বোঝানোর চেষ্টা করলেও প্রবীণেরা বলেন, দোষ সবার বলার মধ্য দিয়ে এটাই বোঝানো হচ্ছে যে দোষী কেউ নয়। এই মনোভাব গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রবীণ নেতারা সরাসরি মোদি-শাহ জুটিকে ‘টার্গেট’ করেছেন বুঝেই নিতীন গতকাল বুধবার কড়া দাওয়াইয়ের পরামর্শ দেন। নাগপুরে তিনি বলেন, যাঁরা এ ধরনের অবাঞ্ছিত ও অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করছেন, দলের সভাপতির উচিত তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি বলেন, আদভানির নেতৃত্বেও দল ভোটে হেরেছে। বিহারে হারের কারণ তিন দলের একজোট হওয়া। তাঁর কথায়, বিজেপি কোনো পারিবারিক দল নয়। এটা কর্মীদের দল। জয় বা হার এই দলের সবার। শুধু মোদি ও শাহকে দায়ী করাটা অন্যায়।

নিতীন কড়া কথা বললেও কিংবা তিন সাবেক সভাপতি মোদি-শাহ জুটির পাশে সমর্থন নিয়ে দাঁড়ালেও রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভ ক্রমশই বাড়ছে। সারা ভারতে ‘বিহারিবাবু’ বলে যাঁর পরিচয়, যিনি এই নামে এক সিনেমার নায়কও হয়েছিলেন, সেই শত্রুঘ্ন সিনহা বলেছেন, বাহারিদের জন্যই বিহারে হার হয়েছে। ফলে দলে বিক্ষোভের রিলে রেস শুরু হয়ে গেছে। মুখ খুলেছেন লোকসভায় দলের সাবেক ডেপুটি স্পিকার কারিয়া মুন্ডাও। ঝাড়খন্ডের এই প্রবীণ নেতার কটাক্ষ, জনসভায় ভিড় হলেই ভোট আসে না এটা এবার শেখা দরকার। রাজ্যের নেতাদের উপেক্ষা করে বাইরের লোক দিয়ে কোনো দিন ভোটে জেতা যায় না। উত্তর প্রদেশের বিজেপির সাংসদ ভারত সিংও হারের জন্য রাজ্যের বাইরের নেতাদের দোষী ঠাউরে বলেছেন, এটা হারাকিরি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজের লোকজনের ওপর বিশ্বাস না রাখলে এমনই হয়। সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব আর কে সিং, বিহারের সাংসদ ভোলা সিংসহ মোট ১৩ জন সাংসদ এখনই প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিব টিকিট বণ্টনের সময় থেকেই বলে আসছেন, যেভাবে অপরাধীদের টিকিট দেওয়া হয়েছে, তাতে ভোটে জেতা যায় না।

চার প্রবীণ বিক্ষুব্ধকে মোদি-শাহ জুটির অনুগামীরা ইতিমধ্যে ‘দুষ্ট চতুষ্টয়’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। তাঁদের সমর্থন বেড়ে চলেছে। সাবেক মন্ত্রী অরুণ শৌরি, তাত্ত্বিক নেতা গোবিন্দাচার্যও মোদি-শাহ জুটির সমালোচনা শুরু করেছেন। মোদি-শাহ জুটির ‘স্টাইলে’ যাঁরা অসহায়, তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন, প্রবীণদের এই ক্ষোভের রেশ শেষ পর্যন্ত কত দূর গিয়ে পৌঁছায়।

রাজধানীতে এই মুহূর্তের সেরা জল্পনা নিতীশ কুমারের শপথ গ্রহণের দিন আদভানি পাটনায় যান কি না। নিতীশ কুমার ইতিমধ্যে আদভানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আদভানি যাবেন কি না, সেই প্রশ্ন বিজেপিতেও। শত্রুঘ্ন সিনহা যেভাবে নিতীশের সঙ্গে দহরম-মহরম করছেন, তাতেও বিজেপি নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট।

দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অবশ্য মনে করছেন, প্রবীণদের দিকে বিশেষ কেউ যাবেন না। এই বিক্ষোভও অচিরেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন, তা হলো রাজ্যসভায় অর্থনৈতিক সংস্কারের বিলগুলোর ভাগ্য অতঃপর কী হবে। গত অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মৌনতা বিরোধীরা ভাঙাতে পারেননি। বিহারের ভোটের ফলে উজ্জীবিত বিরোধীকুল শীতকালীন অধিবেশনকেও ভেস্তে দেয় কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের মনোভাবের ওপর।

You Might Also Like