বিজেপির কৌশল ও সংখ্যালঘু মুসলিম ভোট

বিলাতে একসময় এশিয়ান ভোটব্যাংকটি লেবার পার্টির করায়ত্ত ছিল। অর্থাৎ এশিয়ানদের (সঙ্গে আফ্রিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশেরও) ভোট টোরিরা পাবে না, লেবার পার্টি পাবে- এটা এক প্রকার নিশ্চিত ছিল। লেবার পার্টি বর্ণ-বৈষম্যের বিরোধী, ইমিগ্রেশন আইন শিথিল করার পক্ষপাতী, ওয়েলফেয়ার স্টেটের কল্যাণমূলক ধারাগুলো তারা অব্যাহত রাখতে চায় ইত্যাদি কারণে লেবার পার্টির একটা নিশ্চিত দখল ছিল আফ্রো-এশিয়ান ভোটের ওপর।
বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনে বাঙালি ও সোমালিয়ান ভোটের ওপর নির্ভও করে প্রয়াত পিটার শোর (পরে লেবার দলীয় লর্ড হয়েছেন) ৩০ বছর একটানা পূর্ব লন্ডনের একটি নির্বাচন কেন্দ্র থেকে লেবার পার্টির এমপি ছিলেন এবং লেবার গভর্নমেন্টের মন্ত্রীও ছিলেন। এশিয়ান ভোটব্যাংক নিয়ে ব্রিটিশ লেবার পার্টির সেই রমরমা যুগ আর নেই। যদিও আফ্রো-এশিয়ান ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখনো লেবার পার্টির সঙ্গে রয়েছে; কিন্তু এই ভোটে এখন ভাগ বসিয়েছে টোরি ও লিবারেল দলও।
লেবার পার্টির সেই সমাজতান্ত্রিক ও আদর্শনিষ্ঠ চরিত্রটি এখন নেই। টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে লেবার পার্টিতে যে ব্লেয়ারপন্থীদের অভ্যুদয় ঘটে, তাঁরা দলটিকে নীতি ও চরিত্রের ক্ষেত্রে অনেকটাই টোরি দলের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। যদিও এখন নতুন নেতা ব্লেয়ারপন্থীদের কবজা থেকে দলকে অনেকটা মুক্ত করেছেন, কিন্তু দলে বাম সোশ্যালিস্ট অংশ এখনো কোণঠাসা। ওয়েলফেয়ার কাট থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন আইন ক্রমাগত কঠোর করার ব্যাপারে টোরিদের সঙ্গে বর্তমান লেবার পার্টির পার্থক্য খুব কম।
এখন লেবার পার্টির ভোটব্যাংকে ভাগ বসানোর জন্য টোরি দলও ব্রিটেনের বাঙালি অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনে কাউন্সিলর ও এমপি পদে বাঙালি প্রার্থী দাঁড় করায়। বাঙালি ভোটও এভাবে ভাগ হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও আমরা প্রায় একই অবস্থার অনুবৃত্তি দেখি। আগে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও পাহাড়িয়া সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী ভোটব্যাংক ছিল। সেটি এখন আগের মতো নেই। সে জন্য আমরা সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এলাকায়ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত হতে দেখেছি।
এর প্রধান কারণ দেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় আওয়ামী লীগ তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি। সাম্প্রতিক সংখ্যালঘু নির্যাতনের সময়ও দেখা গেছে এলাকার এক শ্রেণির আওয়ামী লীগ এমপি নির্বিকার। তারা নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াননি। বরং তাদের অনেকের বিরুদ্ধে নির্যাতনকারীদের সঙ্গে নানা ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনা একা কত দিক সামলাবেন? তার প্রশাসন ও এক শ্রেণির মন্ত্রী ও এমপির ঢিলেঢালা অবস্থার জন্য সংখ্যালঘুরা এখনো দেশে তেমন শান্তি ও স্বস্তিতে বাস করতে পারছে না।
ফলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর একটা বড় অংশ মনে করে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসেও যখন তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, বরং আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিএনপি ও জামায়াতের হাতে নির্যাতিত হতে হয় (সেই নির্যাতন আওয়ামী লীগ ঠেকাতে পারে না) তখন বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীকেই নির্বাচনে ভোট দিয়ে তারা অন্তত নিজেদের নিরাপত্তার একটা বলয় তৈরি করতে পারে।
দেখা গেছে, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, মন্দির, বিগ্রহ ভাঙচুর করার পর আওয়ামী লীগ সরকার তা দ্রুত মেরামত করার ও আরো উন্নত বাড়িঘর, মন্দির তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু সংখ্যালঘুরা তো নতুন ও সুন্দর বাড়িঘর চায় না। তারা চায় নিরাপত্তা, নির্যাতন থেকে মুক্তি। তাদের পুরনো বাড়িঘর, মন্দিরের সুরক্ষার ব্যবস্থা। মার খাওয়ার পর আহত শরীরে মলম লাগিয়ে তো তাদের খুশি করা যায় না।
বাংলাদেশের মতো ভারতেও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ, অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় অতীতের ও বর্তমানের কংগ্রেস সরকারগুলোর ব্যর্থতা খুবই প্রকট। অধিকৃত কাশ্মীরে ‘সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ দমনের নামে বছরের পর বছর ধরে মুসলিম নির্যাতন ভারতের মুসলমানদের মনে একটি ক্ষোভের কারণ। বাবরি মসজিদটি ভাঙা হয়েছিল দিল্লিতে কংগ্রেসের নরসিমা রাওয়ের কংগ্রেস সরকারের আমলে। এই মসজিদ রক্ষা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে কংগ্রেস সরকার কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। বলেছে, এটা কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নয়। এটা রাজ্য সরকারের বিষয়। রাজ্য সরকার এই মসজিদ ভাঙা ও দাঙ্গার সময় নির্বিকার ছিল।
গুজরাট দাঙ্গার সময় যেমন কংগ্রেস দল দাঙ্গা প্রতিরোধে এগিয়ে যায়নি, তেমনি দিল্লিতে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর তারা এই দাঙ্গা বাধানোর জন্য অভিযুক্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্রুত বিচারের কোনো ব্যবস্থা করেনি। বরং নরেন্দ্র মোদি পুচার অব গুজরাট আখ্যা পাওয়ায় যখন মার্কিন সরকার তাঁকে আমেরিকায় যেতে ভিসা দেয়নি; তখন মনমোহন সরকার তার প্রতিবাদ করেছে ও আমেরিকা মোদিকে ভিসা না দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এটা অনেকটা সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কর্তৃক একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে বাংলাদেশে ডেকে এনে বিচার না করে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠাদানের মতো।
তা ছাড়া ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর হাজার হাজার সংখ্যালঘু শিখ নিধনের কলঙ্ক জড়িয়ে আছে পরবর্তী কংগ্রসে সরকারের শরীরে। ভারতে দলিত নির্যাতন আমেরিকায় এককালের অশ্বেতাঙ্গ নির্যাতনের মতোই ভয়াবহ। কংগ্রেস সরকার এই দলিত সম্প্রদায়গুলোর অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারেও তেমন সাফল্যের পরিচয় দিতে পারেনি। ১০ বছর আগে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে কংগ্রেসের সোনিয়া-মনমোহন সরকার দেশটির কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় বসেছিল সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগান মুখে নিয়ে। কিন্তু এই ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকেও ভারতের রাজনীতিতে তেমন প্রতিষ্ঠা দিতে পারেনি কংগ্রেস সরকার।
তথাপি বছরের পর বছর সংখ্যালঘুদের একটা বিশাল ভোটব্যাংক ছিল, যা বহুকাল কংগ্রেসের নির্বাচন-বিজয় নিশ্চিত করেছে। দিল্লির জামে মসজিদের খতিব প্রতিবছরই খুতবা পাঠের সময় ভারতের মুসলমানদের আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার জন্য। ভারতে বিজেপির মাধ্যমে উগ্র হিন্দুত্ববাদের অভ্যুদয় ও ক্ষমতা দখলের ভয়ে মুসলমানরা কংগ্রেসকে তাদের নিরাপত্তার আশ্রয় ভেবে দলে দলে ভোট দিয়েছে।
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনেও মুসলিম ভোটদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হয়তো কংগ্রেসকেই ভোট দিতে চাইবে। কারণ এবারের নির্বাচনে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উলঙ্গ প্রতীক স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন-প্রার্থী। ফলে দিল্লির জামে মসজিদের খতিব আগে কংগ্রেসকে সরাসরি সমর্থনদানে কিছুদিনের জন্য বিরত থাকলেও এবার বিজেপি সম্পর্কে ভারতের মুসলমানদের সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন।
তা সত্ত্বেও ভারতের সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ভোটব্যাংক এখন আর কংগ্রেসের জন্য সুরক্ষিত নয়। সংখ্যালঘুরা নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার জন্য তাদের দেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে গড়ে ওঠা বিজেপির সঙ্গে একটা সমঝোতার ভাব রক্ষা করে চলতে চায়। এর প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন কংগ্রেসের প্রয়াত নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদের নাতনি বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক দল জেনেও তাতে যোগ দেন। তারপর আরো কিছু মুসলিম নেতা তাতে যোগ দেন।
বিজেপিও ক্রমশ বুঝতে পারে, ভারতে ক্ষমতায় যেতে হলে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ভোট তাদের দরকার। ফলে বিজেপির প্রবীণ নেতৃত্ব- যেমন অটল বিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানি, যশোবন্ত সিং তাঁদের উগ্র হিন্দুত্ববাদের নখর লুকিয়ে ফেলে উদারপন্থী সাজেন। ক্ষমতায় থাকার শেষদিকে বাজপেয়ি পাকিস্তান সফরে গিয়ে জিন্নাহ যে ধরনের শেরওয়ানি ব্যবহার করতেন, সে ধরনের ছয়টি শেরওয়ানির অর্ডার দিয়ে তৈরি করে দিল্লিতে এসে ব্যবহার করা শুরু করেন। সাংবাদিক সভায় বলেন, কৈশোরে শেরওয়ানি পরা জিন্নাহকে দেখে তিনি শেরওয়ানি ব্যবহারে আগ্রহী হন।
অন্যদিকে লালকৃষ্ণ আদভানি করাচি সফরে গিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সমাধিতে যান শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে এবং জিন্নাহ সেক্যুলার নেতা ছিলেন বলে ঘোষণা দেন। বিজেপির আরেক নেতা যশোবন্ত সিং জিন্নাহর ওপর বই লিখে তাঁকে মহান অসাম্প্রদায়িক নেতা বলে প্রশংসা করেন। বিজেপির কট্টরপন্থী শিবসেনা ও আরএসএস অবশ্য এই উদ্ধারপন্থা পছন্দ করেনি। ফলে আদভানির আর বাজপেয়ির পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনি। যশোবন্ত সিং দল থেকে বহিষ্কৃত হন। তিনি বর্তমান নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী।
এই পরিস্থিতিতেই মূলত শিবসেনা ও আরএসএসের পছন্দের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে গুজরাট দাঙ্গার নায়ক নরেন্দ্র মোদির অভ্যুদয়। তা জেনেও ভারতীয় মুসলমানদের এলিট শ্রেণি বা সুধীসমাজের কিছু শীর্ষ ব্যক্তি বিজেপিতে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিখ্যাত সাংবাদিক এম জে আকবর। বাংলাদেশের একটি সুধীসমাজের মতোই ভারতের মুসলিম সুধীসমাজের এই অংশটি সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী। নরেন্দ্র মোদি যত কট্টর হিন্দুত্ববাদী হোন, তিনি এবার ক্ষমতায় যেতে পারেন, এটা ভেবে এই সুবিধাবাদীরা নিজেদের সামাজিক কায়েমি স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। প্রমাণ হয়েছে ভারতেও মুসলিম গয়েশ্বর রায়দের অভাব নেই।
নরেন্দ্র মোদি ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোট কুড়ানোর আশায় বারবার ঘোষণা করেছেন, তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী। অন্যদিকে মুসলিম ভোট পাওয়ার আশায় দলের সভাপতিকে দিয়ে বলিয়েছেন, মুসলমানদের ওপর অন্যায়-অবিচার করা হয়ে থাকলে তাঁরা নত মস্তকে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত। যদিও আরএসএসের ধমকে বিজেপিকে এই বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করতে হয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি তাঁর উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম বিদ্বেষ ঢেকেছেন এক নতুন কৌশলে। তিনি আগামী ১৬ মের পর (নির্বাচন শেষে ক্ষমতায় বসতে পারলে) ভারত থেকে বাংলাদেশি বিতাড়ন শুরু করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে মুসলিম বিতাড়ন কথাটি উহ্য রাখা হয়েছে। বাংলাদেশেও বিএনপি ‘হিন্দুবিদ্বেষ’ প্রচার করে না। বরং ভারতবিদ্বেষ প্রচারের আড়ালে এই বিদ্বেষ প্রচারকে ঢাকা দিয়েছে। ভারতের সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে মুসলমান ভোটদাতারা যদি নরেন্দ্র মোদির এই কৌশল বুঝতে না পেরে কংগ্রেসের প্রতি তাদের হতাশা প্রকাশের জন্য বিজেপিকে ভোট দেয়, তাহলে তা পরিণামে তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।
এখন দেখার রইল, বিজেপি এই নির্বাচনে তাদের সংখ্যালঘু-তাসটি কেমন খেলে এবং তাতে কতটা সফল হয়!

You Might Also Like