সেদিন মিনায় কী ঘটেছিল?

জিয়া হাবীব আহ্সান

হজ থেকে ফিরে এসে সবার মুখে কয়েকটি প্রশ্ন শুনেছি সেদিন মিনায় কী ঘটেছিল? এত বিশাল হজব্যবস্থাপনায় কোথায় ত্রুটি ছিল? কী করা হলে এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত? মহান রাব্বুল আলামিনের মেহমান হিসেবে পবিত্র হজব্রতে অংশ নিতে পেরে তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি। এতে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এই বছরের হজ দু’টি ট্র্যাজেডির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একটি মক্কার ক্রেন দুর্ঘটনা, অপরটি মিনা দুর্ঘটনা। হারাম শরিফ কমপ্লেক্স বাড়ানোর বিশাল প্রকল্পে ব্যবহৃত অতিকায় দানবাকৃতির ক্রেনগুলোর একটি হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়, বাতাস ও বৃষ্টির তোড়ে ছিঁড়ে পড়ে ইবাদত-বন্দিগিরত ১০৮ জন হাজী শাহাদত বরণ করেন এবং আহত হন ২৩৮ জনের মতো। আহত ও নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশেরও রয়েছেন কয়েকজন। সৌদি সরকার নিহতদের পরিবারে দুই কোটি মূল্যমানের ক্ষতিপূরণ প্রদানের এবং প্রত্যেক পরিবার থেকে দুইজন করে রাজকীয় মেহমান হিসেবে হজ করার সুযোগ দেয়ার অঙ্গীকার করাসহ আহতদেরও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে। মক্কায় সাধারণত এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থাৎ একসাথে ঝড় ও প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটে না। জুমার দিন, হজের মাত্র ১০ দিন আগে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আমি ও অ্যাডভোকেট সৈয়দ মুহাম্মদ হারুন তখন মদিনায় মসজিদে নববী থেকে মাগরিবের নামাজ সেরে বেরোচ্ছিলাম। আমার মেয়ে ফাতিমা যাহরা আহসান রাইসা সর্বপ্রথম বাংলাদেশ থেকে ফোনে এই দুর্ঘটনার সংবাদ দেয়। সাথে সাথে রাজধানী রিয়াদ প্রবাসী নুরুল আলম ভাই এবং আমার বড়দা ডা: মুহাম্মদ আলী (সৌদি প্রবাসী) ফোনে আমাদের কুশল জানতে চাইলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনা প্রচার হয়ে যায়। এই ঘটনার রেশ কাটতে-না-কাটতে ১০ জিলহজে বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের দিন, সকাল ১০টায় ঘটে গেল আরেকটি অবিস্মরণীয় মর্মান্তিক ঘটনা।

আমরা জানি, হজের ফরজ হলো ইহরাম বাঁধা, তাওয়াফ করা, আরাফাতে অবস্থান এবং ওয়াজিব হচ্ছে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাঈ করা, মুজদালিফায় অবস্থান, মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ, কোরবানির পর চুল কামানো বা ছোট করা এবং বিদায় তাওয়াফ। মূল হজ পাঁচ দিন। ৭ জিলহজ দিবাগত রাতেই বাসে করে আমাদের কাফেলার (হজে বায়তুল্লাহ) সবাইকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হয়। কাফেলার হাজীদের পাহাড়ের ওপরের তাঁবুগুলোতে রাখা হয়। পর্যাপ্ত পানি ও খাবারের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এবার তাপমাত্রা ছিল খুব বেশি, প্রায় ৫০-৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কাফেলার পরিচালক ইতোমধ্যে আরাফাত, মুজদালিফা ও জামারায় যাওয়া-আসার ব্যাপারে আমাদের বারবার ব্রিফিং দেন। বেশি করে পানি ও খাবার নিতে হজের আগেও সবাইকে সরেজমিন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই লক্ষ্যে হজে আসার আগে দেশেও তিন-চারবার কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছিল। বাদ ফজর কাফেলার চেয়ারম্যান প্রফেসর গিয়াসুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ হজে বায়তুল্লাহর ২০২ জন হাজী চারটি বাসে করে মিনা থেকে আরাফাতে পৌঁছাই। প্রথমে মোয়াল্লেম দু’টি বাস দিলেও পরে আরো দু’টি বাস কাফেলা ম্যানেজ করেছিল। ৯ জিলহজে সন্ধ্যায় আমরা মুজদালিফায় রাতযাপনের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। এরই মধ্যে কাফেলার অ্যাডভাইজার ড. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৫৫ জনের একটি গ্রুপ অন্যান্য গ্রুপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম এবং সর্বশেষ আমরা আরো দু’টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ি। আমরা কাফেলা চিফের দিকনির্দেশনায় মুজদালিফার একটি পাহাড়ের পাদদেশে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাতযাপন করার পর একটি বাস চলাচলের পথ মিলে যায়। সেখান থেকে জনপ্রতি ২০ রিয়াল করে জামারায় যাওয়ার একটি বাস খুঁজে পাই। ওই বাসে চড়ে বাদ ফজর অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যে নির্বিঘেœ আমরা দ্বিতীয়তলা দিয়ে জামারায় বড় শয়তানকে পাথর মেরে সোজা মক্কায় চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, আমাদের কোরবানি হয়ে গেছে এবং আমরা মাথা মুণ্ডন করে ফরজ তাওয়াফ সেরে নিই। ইতোমধ্যে জেদ্দা থেকে বন্ধুবর ফরিদ আমাদের জানালেন জামারা ট্র্র্যাজেডির কথা। সাথে সাথে দেশ থেকে ফোন আসা শুরু হলো। পদপিষ্ট হয়ে এবং ভিড়ের চাপে অসংখ্য হাজী হতাহত হওয়ার সংবাদ দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। সাথে সাথে বিভিন্ন গুজবও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। দেশ থেকে সবাই ফোনে আমরা বেঁচে আছি কি না জানতে চান। আমি, আমার স্ত্রী অধ্যক্ষ আশফা খানম, ছোট বোন রুমানা, আনোয়ার ভাই ও তার স্ত্রীসহ একটি মাইক্রো করে মক্কায় পৌঁছি। হারুন ভাইকে ফোনে বলি তার আম্মার হুইলচেয়ার ফেলে একই সাথে মাইক্রো করে রওনা হতে।

কাফেলার চেয়ারম্যানকে ফোন করে জানালাম, আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সবাই তাঁবুতে ফিরেছেন এবং সুস্থ আছেন। এ দিকে প্রত্যক্ষদর্শী থেকে জানলাম, ঘটনাক্রমে বিপুলসংখ্যক হাজী ভুলবশত একই সময়ে দুই দিক থেকে একই পথে চলে আসায় বিরাট সঙ্কট সৃষ্টি হয়। শরিয়তে মানবসৃষ্ট এই দুর্যোগ উপেক্ষা করার কিছু নির্দেশনা বা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মানুষের জ্ঞানের অভাবে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। মিনা মুজদালিফার পথ চলাচলের রাস্তাগুলোতে বহু হাজী পাটি বা চাদর বিছিয়ে অবস্থান নেয়াও এই পরিস্থিতি সৃষ্টির অন্যতম কারণ। সৌদি সরকার আল্লাহর মেহমানদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। হজ পরিচালনা কমিটির পক্ষে কয়েক মিলিয়ন মানুষের এই বিশাল সমাবেশকে গাণিতিক বা জ্যামিতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তার ওপর হাজার হাজার হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি, এমনকি কোলে-পিঠে শিশুদের নিয়ে পাথর মারতে গিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলেন। অথচ শরিয়তে অসুস্থ বা বয়োবৃদ্ধদের জন্য বদলা হজ ও পাথর মারার বিধান রয়েছে। প্রত্যেক হাজীর প্রশিক্ষণ থাকলে হয়তো এমনটা হতো না। শরিয়তে ফজর নামাজ পড়ে ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করে সূর্যোদয়ের আগেই মুজদালিফা ত্যাগ ও হজের দায়িত্বশীলদের মিনায় যাওয়া এবং দ্বিপ্রহর পর্যন্ত পাথর মারার এবং তা না পারলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো দিন প্রস্তর নিক্ষেপের অনুমতি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে মুজদালিফা থেকে রাতেই মিনার তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার জন্য সৌদি ফতোয়া বোর্ড সর্বসাধারণের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন, মোবাইলে মেসেজ দিয়েছেন। অথচ সবাই এই ফতোয়া মানেননি বা তা কর্ণপাত করেননি। ফতোয়া মানলে এবং নবী করিম সা:-এর সুন্নাহ অনুসরণ করলে এই অনাকাক্সিত পরিস্থিতি এড়ানো যেত। এবারের ট্র্যাজেডিকে মানবসৃষ্ট সঙ্কট মনে করা যায়। এ ব্যাপারে হাজীদের নিরাপত্তার জন্য কোনো স্পেশাল এলিট ফোর্স থাকলে ভালো হবে। মুসলিম বিশ্বের বাছাই করা প্রশিক্ষিত সৈনিকদের নিয়ে হাজীদের সেবা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় এ ধরনের ফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এ ছাড়া নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় নিয়োজিত সৌদি বাহিনীকে মিনা তাঁবুর অবস্থান সম্পর্কে ট্রেনিং দেয়া এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী লোকজনের সাথে যোগাযোগের জন্য ন্যূনতম ইংরেজি বলতে পারদর্শী করা প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানে তথ্যপ্রযুক্তির পর্যাপ্ত সুবিধা হাজী সাহেবরা পান না। হজের দিন নেটওয়ার্ক জ্যাম হয়ে যায় বলে মোবাইল সংযোগ পাওয়া দুষ্কর। ওয়াইফাই সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। এই প্রযুক্তিগত অসুবিধার দরুন হজের মূল্যবান খুতবাও প্রত্যেক হাজী এক সাথে আরাফাতের তাঁবুতে বসে শুনতে পারেননি। অথচ তাঁবুতে ডিজিটাল সাউন্ডবক্স সিস্টেম ও মনিটর থাকলে খুতবা সমবেতভাবে শোনা যেত। এটা কাফেলার চিফ নিজে শুনে আমাদের অনুবাদ করে শোনালেন।

যাত্রাপথের বিপরীত স্রোতে অনেক মানুষ যাওয়া-আসার সময়ে, কর্তৃপক্ষ সৃষ্ট জটলা নিরোধের জন্য তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে থাকে। এই পন্থার পরিপ্রেক্ষিতে লাখো লাখো হাজী সুষ্ঠুভাবে পাথর মারতে জামারায় যান, তাঁবুতে ফিরে আসেন। কিন্তু সেদিন আলাদা ব্যবস্থা সত্ত্বেও নিয়মকানুন ভঙ্গ করে জনস্রোত বিপরীত দিকে যেতে থাকে আর তখনই হঠাৎ অতি অল্প সময়ের মধ্যে চোখের নিমেষে এই অঘটন ঘটে যায়। সৌদি রাজপরিবারকে প্রটোকল দিতে গিয়ে ট্র্যাজেডি ঘটে যাওয়ার গুজবটির সত্যতা পাওয়া যায়নি। সতর্ক অবজারবেশনে দেখা যায়, সৌদি সরকারের ভিভিআইপিরা মিনার পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত রাজপ্রাসাদ থেকে গাড়িতে বিশেষ পথে যাতায়াতের মাধ্যমে জামারার চতুর্থতলায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পাথর মারার সরকারি ব্যবস্থা আছে। সেখানে নিচে তাদের জন্য রাস্তা বন্ধ করে দেয়া কিংবা প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ফোর বন্ধ করে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি কোনো মহলের অপপ্রচার বলে ধরে নিতে হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য আমাদের সরকারের সাথে সৌদি সরকারের সুসম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। এ ছাড়া গুজব রটানো হয়েছে, রেললাইন থেকে পড়ে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে, আবার কেউ কেউ বললেন, আইএস বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আরো কত কী অদ্ভুত গুজব। সময়ের সাথে সাথে গুজবগুলো আরো ডালপালা মেলেছে। এসব গুজবে হাজীদের বা মুসলিম বিশ্বের বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ইন্ডিপেন্ডেন্টের সাংবাদিক মামুন আবদুল্লাহ আমাদের কাফেলা হজে বায়তুল্লাহর প্রধান, সিডিএ মসজিদের খতিব প্রফেসর গিয়াসুদ্দিন তালুকদারের সাক্ষাৎকার সরাসরি প্রচার করে এসব বিভ্রান্তি দূর করেছেন। সৌদি আরবে হজের সময় জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় হাজীদের বহনকারী বাসের ড্রাইভাররা বহিরাগত এবং শুধু হজের সময় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের গাইড করার জন্য একজন মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শক দেয়া হয়। কিন্তু পথপ্রদর্শক ও ড্রাইভারের ভুলের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সময় নষ্ট হয়। তা ছাড়া বিমানবন্দর ও চেক পোস্টে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা হাজীদের বিরক্তির অন্যতম কারণ। জেদ্দায় তিনটি টার্মিনাল রয়েছে। হাজীদের টার্মিনালে ইমিগ্রেশন শেষে বাসের জন্য অপেক্ষার স্থানটি ননএসি হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাজীদের গরমে সিদ্ধ হতে হয়। এসব সমস্যা সমাধানে সৌদি সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আমাদের কাফেলা বাংলাদেশ হজ বায়তুল্লাহর হাজীরা রাসূলুল্লাহ সা: স্মৃতিবিজড়িত তায়েফ নগরীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন শেষে দেশে ফিরে আসি। আল্লাহ তায়ালার সম্মানিত মেহমানদের নিরাপত্তার জন্য আরো বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি হাজীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা এড়ানো যেতে পারে। আল্লাহ নিহত হাজীদের শাহাদত কবুল করুন। আমিন।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার

ও সুশাসনকর্মী

bhrfctg@gmail.com

You Might Also Like