রিভিউ আবেদন করলেন মুজাহিদ-সালাউদ্দিন, মৃত্যু পরোয়ানা স্থগিত

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছেন।

আজ (বুধবার) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আইনজীবীর মাধ্যমে এ রিভিউয়ের (পুনর্বিবেচনার) আবেদন জানান তিনি। মুজাহিদের পক্ষে তার আইনজীবী শিশির মনির আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় ৩৮ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদন জমা দেন।

এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বের হয়ে শিশির মনির সাংবাদিকদের রিভিউ করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাক্ষাতে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে আমাদের আধা ঘণ্টা কথা হয়েছে। এ সময় তিনি দুটি কথা বলেছেন। একটা হলো, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আপিলের চূড়ান্ত রায় নিয়ে তিনি আদালতের কাছে রিভিউ পিটিশন করবেন। আমরা আগামীকাল (বুধবার) এই রিভিউ পিটিশন করব। আশা করি, আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেবেন।’

দুটি মূল পয়েন্টে তারা রিভিউ চাইবেন বলে জানিয়ে শিশির মনির বলেন, প্রথমটি হচ্ছে, তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, আল বদর, আল শামস ও শান্তি কমিটির কোনো তালিকায় তার (মুজাহিদ) নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে তিনি আল বদর কমান্ডার হলেন কী করে? দ্বিতীয়টি হচ্ছে, একাত্তরের ২৩ বছরের একজন ছাত্র ও বেসামরিক ব্যক্তি কীভাবে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর প্রধান হন?

এদিকে, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছেন। তার পক্ষে আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম বুধবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ আবেদন করেন। তিনি জানান, ১০৮ পৃষ্ঠার গ্রাউন্ডে মোট ৩৫৭ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদন করেন।

রিভিউ আবেদন দায়ের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মৃত্যু পরোয়ানার কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যাবে বলে আগেই জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এই রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফাঁসি কার্যকর করা যাবে না। রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে যে সাজা বহাল থাকবে সেই সাজা কার্যকর হবে। আর আসামিপক্ষের দায়ের করা রিভিউ আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি করা হবে বলে আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তির পরও যদি আসামিদের ফাঁসি বহাল থাকে তাহলে তারা প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদনের সুযোগ পাবেন। যদিও এর আগে ফাঁসি কার্যকর হওয়া দুজন যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনের সুযোগ গ্রহণ করেননি।

এর আগে মুজাহিদ ও সালাউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেয়া রায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। ওই দিনই রায়ের কপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেয় সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন। ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে পেয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক মুজাহিদকে এবং কাশিমপুর কারাগারে আটক সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে তা পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ।

আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আসামিপক্ষ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার অথবা আসামিকে মৃত্যু পরোয়ানা জারির বিষয়টি পড়ে শোনানো যেটি আগে হয়, সেই হিসাব ধরে রিভিউ আবেদন দায়েরের জন্য ১৫ দিন সময় পাবেন। সেই হিসাবে তাদেরকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে রিভিউ দায়ের করতে হবে। সে পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই রিভিউ আবেদন দায়ের করলেন জামায়াত নেতা মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

২০১৩ সালের ১৭ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পরে একই বছরের ১১ আগস্ট খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন মুজাহিদ। চলতি বছরের ১৬ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়েও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।

ট্রাইব্যুনালের পুরো রায়ের বিরুদ্ধে ১১৫টি যুক্তি নিয়ে আপিল করেন মুজাহিদ। ট্রাইব্যুনাল যেসব কারণে সাজা দিয়েছেন তার আইনগত ও ঘটনাগত ভিত্তি নেই বলেও দাবি করেন তিনি। মূল আপিল ৯৫ পৃষ্ঠার, এর সঙ্গে ৩ হাজার ৮০০ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট দাখিল করা হয়।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি প্রমাণিত হয়েছে এবং ২টি প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেননি বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১, ৩, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেননি। প্রমাণিত ১ নম্বর অভিযোগকে ৬ এর সঙ্গে সংযুক্ত করে এ দু’টি অভিযোগে সমন্বিতভাবে ও ৭ নম্বর অভিযোগে মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড, ৫ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং ৩ নম্বর অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। প্রমাণিত না হওয়া ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে খালাস পান মুজাহিদ।

অন্যদিকে, ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ পৃথক চারটি (৩, ৫, ৬ ও ৮নং) অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে রায় দেন। এছাড়া তিনটি (২, ৪ ও ৭নং) অভিযোগে তাকে দেয়া হয় ২০ বছর করে কারাদণ্ড। দুটি (১৭ ও ১৮নং) অভিযোগে দেয়া হয় ৫ বছর করে কারাদণ্ড। একই বছরের ২৯ অক্টোবর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন সাকা চৌধুরী। আপিল বিভাগ এই আপিল নিষ্পত্তি করে গত ২৯ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। ৩০ সেপ্টেম্বর ওই দুটি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়।

You Might Also Like