আদিম

আলমগীর রেজা চৌধুরী

সকাল থেকে ঝড়ো হাওয়া। ঝুরঝুর বৃষ্টি পড়ছে। বিরামহীন। বাইরে বের হবার জো নেই, যেন অন্তহীন বিষণœ মুখ আকাশের। কোথাও কোথাও মাঝারি শব্দে বাজ পড়েছে। দু’একটা কাক টেলিগ্রাফের তারে বসে ঝিমুচ্ছে। শালের পাতায় বৃষ্টি ফোঁটা মিষ্টি একটা গুঞ্জন নায়েব আলীর সারা অস্তিত্ব জুড়ে। এ রকম ঝড়ো হাওয়া ও সহ্য করতে পারে না। দোকানদারীর ক্ষতি হয়। আজ দশ বছর যাবত ফুলতলার এই অখ্যাত বাসস্টেশনে মনোহারী দোকান করছে ও। এই আগামী শীতে চল্লিশের কাছাকাছি পৌঁছবে নায়েব আলীর বয়স। মাথার বাঁ পাশে একগুচ্ছ চুল উঠে যাওয়ায় চকচক করছে ওর প্রশস্ত কপাল। শরীরে একটু একটু মেদ জমতে শুরু করেছে।
বাড়ি থেকে ফজরের নামাজ পড়ে সাইকেল চালিয়ে দোকানে আসে। দুপুরে ভাত নিয় আসে ভুলু। রাতে বাড়ি ফিরে কণ্ঠির সাথে একত্রে বসে খায়। বিয়ে হবার পর একদিন ব্যতিক্রম হয়নি। নায়েব আলীর জীবনে এটাই যেন নিয়ম।
বিবাহিত জীবন দশ বছর পার হয়ে গেলেও কণ্ঠির কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। এর জন্য অন্যান্য মানুষের কাছে দুঃখ করলেও কণ্ঠির সঙ্গে করেনি। কণ্ঠির মন খারাপ হবে। দু’চোখ ভরা জল দেখা যায়। কিছু বলার সঙ্গে সঙ্গে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলবে।
কণ্ঠি বলে, ‘ওগো আরেকটা বিয়ে কর।’
সারাদিন দোকানদারী করে ক্লান্ত নায়েব আলী তখন কণ্ঠির গলা জড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ফুরফুরে জোছনা দেখে।
কণ্ঠি আবার বলে, ‘হে গো তুমি কী ঘুমিয়ে গেলে নাকি?’
‘না বাইরে জোছনা দেখছি।’
‘আমার কথা শুনতে পাওনি, কিছু বল?’
তুমি বলে যাও আমি শুনছি।
এভাবে পাঁচ বছর কেটে গেছে। নায়েব আলী বিয়ে করতে পারেনি। বিয়ের কথা মনে হলেই একটি ফুটফুটে শিশুর পাশে কণ্ঠির উজ্জ্বল মুখ কল্পনায় এসেছে। কণ্ঠির জন্য মমতা হয়েছে। আর ক’টা দিন দেখলে এমন কী ক্ষতি? অনেকের তো দশ বছর পরও সন্তানাদি হয়েছে। এইতো কণ্ঠির এক ফুপুর বিয়ে হয়েছিল পুলিশ কনস্টেবলের সাথে। বিয়ের বারো বছর পর ছেলে জন্ম দিয়ে সুখি হয়েছে। মনে মনে অনেক উদাহরণ দিয়ে নিজকে সান্ত¦না দিয়েছে নায়েব আলী।
মানুষের কথা শুনে না শোনার ভান করে। মানুষের কত কথা! বাজা মেয়ে মানুষ নিয়ে সংসার করলে নাকি উন্নতি হয় না। দীর্ঘ দশ বছর বিবাহিত জীবনে একটু একটু উন্নতির দিকে এগিয়ে গেছে নায়েব আলী। ধানীজমি কিনেছে দেড় বিঘা, তরতাজা হালের গরু আছে এক জোড়া। কণ্ঠি আসলেই লক্ষ্মী। ভুলুকে দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে নায়েব আলীর সংসার। কণ্ঠি বাজা মেয়ে মানুষ এরকম কথা শুনতে শুনতে অভ্যেস হয়ে গেছে নায়েব আলীর। আজকাল মানুষ খুব একটা বলে না। বললেও নায়েব আলী অন্য কথা বলে। দোকানদারীর মন্দাভাব নিয়ে হা-পিত্যেশ করে। পাশ ফিরে চলে আসে।
দিনকে দিন কণ্ঠির সব সাধ-আহলাদ মরে যাচ্ছে। আগের মতো বাড়ি ফিরলে চঞ্চল হয়ে ওঠে না। নায়েব আলী ধরে নেয় বয়স বাড়ছে। দশ বছর সান্ত¦না দিতে দিতে সব পুরোনো হয়ে গেছে। দোষ তো কণ্ঠির একার না? নায়েব আলী ভাবে।
ঝর ঝর আরো কতোক্ষণ বৃষ্টি ঝরে। এখন হালকা বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে ঝাঁপটা হাওয়া। হেলিয়ে রাখা ঝাপ আরেকটু উপরে তুলে পাশের দোকানের ছফরউদ্দিনকে ডাক দেয়।
‘ও ভাতিজা কয়টা বাজে?’
ছফর উদ্দিন গলা বাড়িয়ে বলে, ‘এগারো।’
নায়েব আলী আর কোনো উচ্চবাচ্য করে না। ঝিম মেরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ফুলতলার এই স্টেশনে নায়েব আলী প্রথম দোকানদার। তারপর ছফর উদ্দিন, নিতাইর চার দোকান এক এক করে বসে যায়। এদের সব ক্রেতাই আদিবাসী। সকাল হলে পুরুষ-রমণীর ভিড় হয়। বাসের জন্য কেউ কেউ অপেক্ষা করে। আজ তার নাম গন্ধ নেই।
ভোরে বাড়ি থেকে রওনা হবার পরপরই রাস্তায় ছিটেফোঁটা বৃষ্টি ধরে। দোকানে পৌঁছতে পৌঁছতে পাঞ্জাবিটা এক রকম ভিজেই গেছে। বৃষ্টি থাকলে ভুলুও ভাত নিয়ে আসতে পারবে না। বছরে পাঁচশ’ টাকা মাইনে। আজ তিন বছর যাবত নায়েব আলীর সংসারের হাল ধরেছে ভুলু। ছোকরার গোঁফের রেখা দিতে শুরু করেছে। এইসব নায়েব আলীর ব্যক্তিগত জীবনযাপন। ফুলতলার এই স্টেশনে অনেকেই জেনেছে নায়েব আলী সন্তানের পিতা হতে পারবে না।
ছফর উদ্দিন একদিন বলে, ‘দূর চাচা, এখনো বসে আছো, আরেকটা বিয়ে কর।’
ছফর উদ্দিন ফুলতলা স্টেশনের সবচেয়ে শিক্ষিত। দু’বার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেনি বলে রাগ করে দোকানদারী করতে এসেছে। অনেকেই খাতির করে। নায়েব আলী, ছফর উদ্দিন ফুলতলা স্টেশনের প্রাণ।
আদিবাসী মেয়ে-পুরুষ সবাই চাচাজী বলে ডাকে নায়েব আলীকে। ও তাতেই খুশি।
হঠাৎ তন্ময় ভাঙে নায়েব আলীর। বিকট শব্দ করে ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইলগামী ‘ক্লান্ত বিহঙ্গ’ এক্সপ্রেস এসে থামে। জলকাঁদা ছিটকে পড়ে আশপাশটায়। বাস থেকে নামে দক্ষিণ পাড়ার আলিম শেখ। ময়মনসিংহে মামলা ছিল। মাঝবয়সী মানুষ। নায়েব আলীর সখ্য অনেককালের। বাস থেকে নেমে নায়েব আলীর দোকানের দিকে এগিয়ে আসে। গুটিশুটি মেরে বসেছিল নায়েব আলী। আলিম শেখকে দেখে নড়ে চড়ে বসে।
‘হারামজাদা বৃষ্টির সময় নাই।’
আলিম শেখ বলতে বলতে দোকানের ঝাপের নিচে এসে দাঁড়ায়।
নায়েব আলী দোকান থেকে টুল নামিয়ে দেয়। মুচকি হেসে বৃষ্টির গুষ্ঠি উদ্ধার করে মামলা-মোকদ্দমার কথা জিজ্ঞেস করে।
আলিম শেখ ঠাট্টার সুরে বলে, ‘তোমার আর এই বৃষ্টির মধ্যে বসে থেকে কাজ কী? বাড়ি যাওগা। এতো পয়সা খাবো কেডা?’
আলিম শেখের কথা শুনে নায়েব আলীর মন খারাপ হয়। এখনো বৃষ্টির কুঁচি ঝরছে শালের পাতায়। কুণ্ঠির জন্য উতলা হয় মনটা। বাইরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আলিম শেখ বলে, ‘চলিরে নায়েব।’
বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় বনভূমির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায় আদিম শেখ। নায়েব আলীর মনে পড়ে কণ্ঠি পোয়াটেক তালমিস্ত্রি, একটু গরম মসলা, এক প্যাকেট আগরবাতি নিতে বলেছে। আজই তো ভাদ্র মাসের বারো তারিখ। কণ্ঠি বলেছিল।
কণ্ঠি গোপনে গোপনে নানান চিকিৎসা করিয়েছে। বেলগাছির পীর সাহেবের মাজারে সিন্নি পাঠিয়েছে। বিয়ের পাঁচ বছর পর থেকে কণ্ঠির মধ্যে নিরন্তর চলছে এই আশা-নিরাশার যুদ্ধ। কান্দিপাড়ায় কবিরাজ বাবা বলেছে, কণ্ঠির কোনো দোষ নেই। ও পারে সন্তান জন্ম দিতে। ঠিক তখনি আবার আলো দেখেছে। পরক্ষণেই হতাশায় নুয়ে পড়েছে। নায়েব আলীকে বলেনি, এতোদিনের সংসার। একটুতেই মানুষটা কষ্ট পাবে, কণ্ঠি জানে।
ও রকম বহুত মানৎ পাঠিয়েছে পীর-ফকিরের দরগায়। নায়েব আলী আজকাল আর কোনো গুরুত্ব দেয় না। কণ্ঠি ওইটুকু করে তৃপ্তি পায়।
কণ্ঠি মনে মনে ভাবে, নাইবা দিতে পারল সন্তান, দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তো দিতে পারছে। ছোটবেলা মা-বাপ হারিয়ে চাচার সংসারে মানুষ হয়েছে। নিদারুণ কষ্টের জীবন ছিলো সেটা। মাইনর স্কুল পেরিয়ে হাইস্কুলে উঠতেই এখানে বিয়ে হয়। তারপর কত বছর চলে গেল। কণ্ঠি ভাবে।
হঠাৎ করে কবিরাজের কথা মনে পড়ে। নায়েব আলী কোনদিন সন্তান দিতে পারবে না। হতাশায় নুয়ে পড়ে কণ্ঠি, বুকের ভেতর ট্যাঁ ট্যাঁ করে কে যেন কেঁদে ওঠে। কণ্ঠি ভাবতে থাকে ওর এখন কী করা উচিত!
বাইরে এখন ঝির ঝির করে বর্ষণের বিরতিহীন উৎসব চলছে। ভুলুকে ডাকে কণ্ঠি। ভুলু দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে কতোক্ষণ। কণ্ঠি চৌকিতে বসে টুক টুক করে সুপরি কাটে। কণ্ঠি বুকে তখন মিহি কান্না উছলে উঠতে চায়। বাইরে বাতাসের ঝাঁপটা জোর হয়।
‘আমি কোনদিন সন্তান পাবো নারে ভুলু?’ কণ্ঠি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে। ঘরের গুমোট আবহাওয়া ভুলু বুঝতে পারে না ওর এখন কী করা দরকার। কণ্ঠি চৌকি থেকে নেমে ভুলুর সদ্য টকবগিয়ে ওঠা শরীর স্পর্শ করে। ভুলুর চোখে তখন অন্ধকার। দু’একটা বাজ পড়ে দূরে কোথাও।
কণ্ঠির আবেশী কণ্ঠ শোনা যায়, ‘আমি তোর কাছে সন্তান চাই।’
কণ্ঠির আদিম সুর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
বাড়ি ফিরে নায়েব আলী দেখে, কণ্ঠি সদ্য গোসল করে বিছানা পরিপাটি করছে। কণ্ঠিকে বড্ড সজীব দেখায়। বৃষ্টি এখন ঝির ঝির করে পড়ছে।
ভেজা কাপড় ছাড়ার সময় নায়েব আলী বলল, ‘ইস কী বিশ্রী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গ্রাহক নেই চলে এলাম।’
‘কী গো, আমার জিনিসগুলো এনেছ?’
‘এনেছি।’ বলে কুঁয়োতলার দিকে লুঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যায় নায়েব আলী।
সারাদিন হালকা বাতাসের সাথে বৃষ্টি ঝরে। বিকেলের দিকে আকাশ পরিষ্কার হলেও বাতাস চলতে থাকে মৃদু বেগে।
রাতের দিকে সিন্নি তৈরি করে ভুলুকে দিয়ে কবিরাজ বাড়ি পাঠিয়ে দেয় কণ্ঠি। হালকা জোছনা ছড়ায় আকাশ। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে কণ্ঠি। নায়েব আলীকে সিন্নি খাওয়ায়। জানালা দিয়ে বৃষ্টিধোয়া গাছগাছালির দিকে তাকিয়ে কণ্ঠিকে বলে, ‘কি সুন্দর জোছনা?’
কণ্ঠি নায়েব আলীর গলা জড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়।
কতোক্ষণ পর কণ্ঠি বলল, ‘ঠা-া লাগবে তোমার, জানালা বন্ধ করে দাও।’
নায়েব আলী জানালা বন্ধ করে দেয়। বাইরে বাতাসের মৃদু দাপাদাপি। ঘরের ভেতর পিদিমের মৃদু আলো। নায়েব আলী লক্ষ্য করে কণ্ঠি বাক্স থেকে বের করে নতুন কাপড় পরেছে। লাল টুকটুক করে পান খেয়েছে।
কণ্ঠি বলল, ‘দেখো এবার আমার কিছু হবে। কান্দিপাড়ার কবিরাজ বাবার ওষুধ অব্যর্থ।’
কণ্ঠির চোখে মুখে আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি খেলে যায়। নায়েব আলী কোনো কথা বলে না। ওর মনে হয় কণ্ঠির সঙ্গে যেন আজ বিয়ে হল। কণ্ঠি সদ্য যৌবনে পা দেয়া কুমারী নারী। ততোক্ষণে কণ্ঠি নায়েব আলীর বুকের কাছে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়েছে।

You Might Also Like