মোদিময় রাজনীতির ধারা পাল্টে যাবে বিহারে?

অরবিন্দ কেজরিওয়াল রাজধানী নয়াদিল্লিতে যেটি পেরেছেন, সেটি কি নিতিশ কুমার-লালু প্রসাদ-রাহুল জোট বিহারে করতে পারবেন? এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায়- পারবেন না। কারণ, বছরকাল আগে যেখানে রাজধানীর সব ক’টা লোকসভা আসন বিজেপি দখল করে নিয়েছিল, সেখানে এর পর অনুষ্ঠিত দিল্লি বিধানসভার ৭০ আসনের মধ্যে ৬৭টিই কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি দখল করে। আর এর অর্থ যে দিল্লি থেকে ঝাড়ু দিয়ে বিজেপির নিশানা সাফ করে দেয়া, তাতে সন্দেহ থাকে না। এ রকম অলৌকিক কিছু নিতিশ-লালুরা যে পারবেন না, তার প্রমাণ হলো গত জুলাইয়ে ২৪ আসনের উপনির্বাচনে ১৩টিই বিজেপি’র দখল করা। এ ফল লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’র করা ফলের তুলনায় নিশ্চয় বেশখানিকটা খারাপ। কিন্তু বিহারে বিজেপি জোট সরকার গঠনের যে স্বপ্ন এখনো দেখছে, সেটাকে কেউ দুঃস্বপ্ন পুরোপুরি বলতে পারবে না। তবে বিজেপি’র পালের হাওয়া যে বেশখানিকটা ওলটপালট হতে চলেছে, তার লক্ষণ সাম্প্রতিক কিছু বিশ্বাসযোগ্য জনমত জরিপে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এসব জরিপ করা হয়েছে বিহারের আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দফায় অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। ৮ নভেম্বর ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের ফল প্রকাশ করা হবে।

পাল্লা ভারী হচ্ছে নিতিশ জোটের

বিহারের নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল ও জনমত নিয়ে অব্যাহতভাবে নানা সমীক্ষা রিপোর্ট বের হচ্ছে ভারতের পত্রপত্রিকায়। এর মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ হিসেবে খ্যাত জরিপের প্রকাশ হওয়া ফলের সাধারণ প্রবণতা হলো, নিতিশ জোটের পাল্লা ক্রমেই ভারী হওয়া। অনেক কিছুই এখন প্রতিকূলে চলে যাচ্ছে বিজেপি’র। নির্বাচন নিয়ে সর্বশেষ এবিপি নিউজ ও নিয়েলসনের করা সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নিতিশ-লালুর জোট ১২২টি ও বিজেপি জোট ১১৮টি এবং বাকি দলগুলো তিনটি আসন পেতে পারে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে করা এ জরিপের সাথে একই প্রতিষ্ঠানের করা আগের জরিপের ব্যবধান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এপ্রিল-মে মাসে তাদের করা জরিপে এ দুই জোটের আসন দেখানো হয় যথাক্রমে ১১৪ ও ১২৪। কিন্তু পরের জুন-জুলাইয়ের জরিপে এ দুই জোটের আসন দেখানো হয় ১২৮ ও ১১৫। এবিপি-নিয়েলসন নিতিশ-লালুর জনতা পরিবার জোটকে অগ্রগামী দেখালেও ইন্ডিয়া টু ডে-সিসেরোর সেপ্টেম্বরে করা জরিপে বিজেপি জোটকে অগ্রগামী দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, নিতিশ-লালুর জোট আসন পাবে ১০৬টি, বিজেপি জোট পাবে ১২৫টি আর অন্যরা পাবে ১২টি। ইন্ডিয়া টিভি-সি ভোটারের সেপ্টেম্বরে করা জরিপে বলা হয়েছে, নিতিশ-লালুর জোট ১১৬ থেকে ১৩২টি আসনে জয় পেতে পারে। অন্য দিকে বিজেপি জোট আসন জিততে পারে ৯৪ থেকে ১১০টি। অন্যরা ১৩ থেকে ২১টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে। এবিসি নিউজের জরিপে একটি মজার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হলো বিহারের নির্বাচনে বিজেপি জোট ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পাবে ১১২টি আর নিতিশ-লালু জোট ৩২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১২৯টি আসন পাবে। এর কারণ হতে পারে এ দুই জোট এক হওয়ার কারণে নিম্নবর্গের হিন্দুদের এলাকায় তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে। বিজেপি জোট পুরো বিহারে অধিক ভোট পেলেও আসন জয়ে তারা সুবিধা করতে পারবে না।

উন্নয়ন বনাম জাতপাত

নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন স্লোগান ভালো ফল এনে দিয়েছিল লোকসভা নির্বাচনে। সেই বটিকা বিহারে প্রয়োগ করে খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না এ দফায়। জনতা পরিবার জোট যেখানে নিতিশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বিজেপি বিহারে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা ঘোষণা করেনি। গোটা রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার মতো কোনো ক্যারিসমেটিক নেতা বিজেপিতে নেই। বিজেপি জোটের অন্যতম নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাম বিলাস পাসোয়ান হতে পারতেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে তার দুই জামাই বিদ্রোহ করে বসেছে শ্বশুর মশাইয়ের সাথে। যতই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক হোক, রাজনীতিতে এর একটি প্রভাব তো থাকতেই পারে। এসব বিবেচনায় বিহারে বিজেপি চাইছে নরেন্দ্র মোদিকে নেতা বানিয়েই রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন সারতে। এ লক্ষ্যে তিনি বিহারের গুরুত্বপূর্ণ জনসভাগুলোতে হাজির হচ্ছেন। এতে বিহারের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে নরেন্দ্র বনাম নিতিশে। আর এ লড়াইয়ে কে সাফল্য পাবেন তা খানিকটা জাতপাত আর উন্নয়নের প্রচারে কোনটি জনমানসে বেশি প্রভাব ফেলবে, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।

আগের লোকসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদির উন্নয়নের জোয়ারেই ধুয়ে-মুছে সাফ হয়েছিল বিহারের শাসক জোট। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনে সেই পথে ভরসা রাখতে পারছেন না বিজেপি। উন্নয়নে ভরসা করতে পারছেন না দশ বছর ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমারও। নরেন্দ্র মোদি উন্নয়ন করে দেখিয়েছিলেন আগে থেকে অগ্রসরমান গুজরাটে। আর নিতিশ উন্নয়ন করেছেন সবচেয়ে পাশ্চাৎপদ রাজ্যের একটি বিহারে। কিন্তু সেই উন্নয়ন ইস্যু ছাড়িয়ে ফের স্বমহিমায় জাতপাত ও সংরক্ষণের রাজনীতি। এরই মধ্যে আরএসএস-প্রধান মোহন ভগবতের সংরক্ষণবিরোধী মন্তব্যে অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপি। নিতিশ-লালুর জোট এখন বিজেপিকে সংরক্ষণবিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে প্রচারে নেমেছে। এর মধ্যে গুজরাটে প্যাটেল সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ দাবিতে আন্দোলন বিজেপির সংরক্ষণবিরোধী চেহারা বেশখানিকটা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। আর রাজস্থানের বসুন্ধরা সরকারের উদাহরণ টেনে মোদির দল বোঝাতে চাইছে, তারা মোটেই সংরক্ষণবিরোধী নয়। বিজেপি-শাসিত রাজস্থানের সরকার চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ৬৮ শতাংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে, সংরক্ষণ ৫০ ভাগ ছাড়াতে পারবে না।

বিহারের ভোটকে এবার গোড়া থেকেই অগ্রসর ও অনগ্রসরের লড়াইয়ে পর্যবসিত করার কৌশল নিচ্ছিল লালু-নিতিশ-কংগ্রেসের জোট। পাটনায় জোটের সভা থেকে লালু প্রসাদ ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভোটে এবার মণ্ডল পার্ট টু হবে!’ আর এরই মধ্যে সঙ্ঘপরিবার-প্রধান মোহন ভগবত সংরক্ষণব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের দাবি তুলতেই পাল্টা সরব হন লালু। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, ‘সংরক্ষণব্যবস্থা খতম করবে কার এত হিম্মত?’ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে মোহন ভগবতের পুরো বক্তব্য পড়ে শোনান নিতিশ কুমারও। উদ্দেশ্য, সংরক্ষণের রাজনীতিকে নতুন করে বিহারে চাঙ্গা করা। বিজেপিকে নিয়ে নিতিশ বলেন, ‘আরএসএস হলো বিজেপির সুপ্রিম কোর্ট। তারা যখন বলছে, তখন মোদি সরকার নিশ্চয়ই সংরক্ষণব্যবস্থা শেষ করতে চাইছে।’

বিহারের জাতপাতের কথা মাথায় রেখেই যে প্রার্থী বাছাই হয়েছে, তালিকার দিকে তাকালে সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। প্রথম দফায় ২৪২টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে নিতিশ কুমারের জোট। তাদের বক্তব্য, ক্ষমতায় এলে বিহারে সংরক্ষণব্যবস্থা খতম করবে মোদি-অমিত শাহের দল। প্রশ্ন হলো, এতে উচ্চবর্ণের মানুষ নিতিশ জোটের ওপর চটবে না? কিন্তু তারা ধরেই নিয়েছেন, উচ্চবর্ণের বেশির ভাগ ভোট এবার বিজেপি’র দিকেই যেতে পারে। সে কারণেই ভোটকে অগ্রসর ও অনগ্রসরের দ্বৈরথে পরিণত করতে পারলেই তাদের জন্য ভালো।

লালু-নিতিশ জোটের যে ২৪২ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে অনগ্রসর শ্রেণীর প্রার্থী রয়েছেন ৫৫ শতাংশ। তফসিলি জাতি ও উপজাতি থেকে প্রার্থী করা হয়েছে ১৫ শতাংশকে। সংখ্যালঘু প্রার্থী রয়েছেন ১৪ শতাংশ। আর উচ্চবর্ণের প্রার্থী করা হয়েছে ১৬ শতাংশকে। এর মধ্যে ৩৯টি আসনে প্রার্থী করা হয়েছে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ভূমিহার ও রাজপুতদের। তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য ছাড়া হয়েছে ৪০টি আসন। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রার্থীরা ৩৩টি আসনে লড়বেন। আর পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর (ওবিসি) প্রার্থীরা লড়বেন ১৩০টি আসনে।

কেন নিতিশ-লালু জোট এভাবে মনোনয়ন দিলেন, তা স্পষ্ট হবে সেখানকার জনবিন্যাস সামনে রাখলে। বিহারে পশ্চাৎপদ বা ওবিসি জনগোষ্ঠী রয়েছে ৫১ শতাংশ। মহাদলিত ও দলিত শ্রেণী রয়েছে ১৬ শতাংশ। উচ্চতর শ্রেণী রয়েছে ১৫ শতাংশ। মুসলিম রয়েছে ১৬.৯ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে আদিবাসী ১.৩ এবং খ্রিষ্টান শিখ জৈনি রয়েছে ১ শতাংশ। বিহারের এই জনবিন্যাস রাজ্যটির রাজনীতির জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ণ হিন্দুর বেশির ভাগ ভোট সেখানে যাবে বিজেপি জোটের পক্ষে। জোটের অংশীদার রামবিলাস পাসোয়ান এবং জিতেন মাঝির কল্যাণে বেশ কিছু নি¤œবর্ণের ভোট আসতে পারে বিজেপির পক্ষে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র দামোদর মোদি বিহারে এসে নিজেকে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর চা-ওয়ালা হিসেবে তুলে ধরে বেশ ভালো সাড়া পেয়েছিলেন। এবার সেটি কতটা কাজ করে বলা মুশকিল। বিজেপির প্রতিপক্ষ নিতিশ কুমার এবং লালু প্রসাদ দু’জনই নিম্নবর্ণের হিন্দু। তারা জাতপাতের বিষয়টি চাঙ্গা রাখার সাথে সাথে সরকারি সুবিধা বাড়ানোর ব্যাপারেও রয়েছেন সচেতন। ইতোমধ্যে নিতিশ সরকার প্রাদেশিক কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ্যভাতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি কন্ট্রাক্ট নিম্নবর্ণের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। অন্য দিকে নরেন্দ্র মোদি পাটনাকে বিশেষ অঞ্চলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ছাড় দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

বহুমুখী লড়াই : ঐক্যের পর বিভক্তি

বিহারে বিজেপিকে ঠেকানোর জন্য বিজেপি-বিরোধী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়ম সিং যাদব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে চক্র থেকে তিনি নিজেই ছিটকে পড়েছেন। সমাজবাদী পার্টির সাধারণ সম্পাদক রাম গোপাল ভার্মা জানান, বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে একাই লড়বে সমাজবাদী পার্টি। কেন জোট ত্যাগ করলেন- সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, আসন ভাগ করার সময় তাদের কোনো মতামতই চাওয়া হয়নি। লালু ও নিতিশের এই আচরণে তারা অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার মহাজোটের অংশীদারদের মধ্যে আসন বণ্টনের কথা ঘোষণা করেন। লালু-নিতিশ নিজেদের দলের জন্য ১০০টি করে, কংগ্রেসের জন্য ৪০, এনসিপির জন্য তিনটি আসনে লড়ার কথা জানান। এই বণ্টনে সমাজবাদীর জন্য প্রস্তাব পাঁচটি আসন। তাতেই ক্ষেপেছে মুলায়মের দল।

২০১০ সালের নির্বাচনে এই জোটের দুই প্রধান শরিকই এবারের চেয়ে বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। সেবার জেডি (ইউ) ছিল বিজেপি জোটে। তারা ১৪১টি আসনে লড়ে ১১৫টিতে জিতেছিল। ১০২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৯১টিতে জয়ী হয়েছিল বিজেপি। আরজেডি ১৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছিল মাত্র ২২টি আসন। কংগ্রেস একা ২৪৩টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছিল মাত্র চারটি! ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে আরজেডি, কংগ্রেস, এনসিপি একসাথে লড়ে রাজ্যের ৪০টি আসনের মধ্যে পেয়েছিল সাতটি। বামদের সাথে হাত মিলিয়ে ভোটে লড়ে জেডি (ইউ) পেয়েছিল দু’টি আসন। লোকসভা নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবির পরই ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর মধ্যে পরস্পরের কাছাকাছি আসার তাগিদ দেখা দেয়।

কিন্তু ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যের ভাঙন চিন্তার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে নিতিশ-লালুর জন্য। নির্বাচনে তাদের জোটের বিক্ষুব্ধদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে মুলায়ম-শারদ পাওয়ার-পাপ্পু যাদবের তৃতীয় মোর্চা। টিকিট না পাওয়া তাবৎ নেতা থেকে শুরু করে সবাই রাজনীতির ভাগ্যপরীক্ষায় বেছে নিচ্ছেন এই তৃতীয় মোর্চাকেই। মাসখানেক আগেও যে জোটের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, আচমকা সেই জোটেই নাম লেখাতে ব্যস্ত বিহার রাজনীতির বড় নেতারা। মুলায়ম সিং যাদব থেকে শারদ পাওয়ারের লক্ষ্য হলো বিজেপি-বিরোধী ভোটের জন্য পরিচিত পূর্ব বিহার ও সীমাঞ্চল এলাকা। জোটের নেতারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জোটের যত টিকিট বিতরণ করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশির ভাগই লালু-নিতিশের দল থেকে আসা বিক্ষুব্ধ নেতা-বিধায়ক। মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমারের একসময়ের ঘনিষ্ঠ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী রামধনী সিংহ টিকিট না পেয়ে সমাজবাদী পার্টির সাইকেলে সওয়ারি হয়েছেন। আরজেডিতে গুরুত্ব না পেয়ে দল ছেড়েছেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও আরজেডি সহসভাপতি রঘুনাথ ঝা। তিনিও তার অনুগামীদের সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেয়ানোর জন্য চেষ্টা করছেন। এভাবে জেডিইউ-আরজেডি’র অনেক নেতাই চলে গেছেন তৃতীয় মোর্চায়। বিজেপি-বিরোধী ভোট কাটাকাটির এই খেলায় স্বভাবতই কপালে ভাঁজ লালু-নিতিশের। আর আশাবাদের ঝলকানি বিজেপি’র সামনে।

আসন ভাগাভাগি প্রশ্নে মহাজোটে বিরোধের ফলে বিজেপি-বিরোধী ভোট কম-বেশি তিন ভাগে ভাগ হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে মূল ধারায় রয়েছেন নিতিশ কুমারের জেডিইউ, লালু প্রাসাদ যাদবের আরজেডি এবং রাহুল গান্ধীর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। এই তিন দলের প্রথম দু’টি ১০১টি করে এবং শেষোক্ত দল ৪১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সেকুলার মোর্চা নামে জোট করে মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি ৮৫টি, জনাধিকার পার্টি ৬৪টি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি ৪০টি, এসএসপি ২৮টি, সমাজবাদী জনতা পার্টি ২৩টি এবং এনপিপি তিনটি আসনে নির্বাচন করছে। এর বাইরে বাম দলগুলোও আলাদাভাবে নির্বাচন করছে। এই জোটের মধ্যে সিপিআই ৯১টি, সিপিআই (এমএল) ৭৮টি, সিপিআইএম ৩৮টি, এসইউসিআই ছয়টি, ফরোয়ার্ড ব্লক পাঁচটি ও আরএসপি তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এনডিএ’র মধ্যে বিজেপি ১৬০টি, এলজেপি ৪০টি, আরএলএসপি ২৩টি এবং জিতেন মাঝির এইচএএম ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ ছাড়া মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি ২৪৩টি আসনের সব ক’টিতে এবং শিবসেনা ১৫০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন মুসলিমপ্রভাবিত সীমাঞ্চল এলাকার ২৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বিহারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও বিজেপি-বিরোধী দলগুলোর পক্ষে প্রচারণা চালানোর কথা বলেছে।

বিজেপি’র জন্য বৈরী হাওয়া?

বিহারের নির্বাচনের বিশেষ তাৎপর্য হলো, নয়াদিল্লির পর এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, যেটির নির্বাচনের প্রভাব আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য অনেকগুলো রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে পড়তে পারে। এর মধ্যে আগামী মার্চ-এপ্রিলে নির্বাচন হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা ও তামিলনাড়– বিধানসভার। ২০১৭ সালের শুরুতে পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশসহ বেশ ক’টি বিধানসভার নির্বাচন হবে। বিহারসহ এই সাত রাজ্যের কোথাও বিজেপি ক্ষামতায় নেই। অথচ বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিহার, আসাম ও উত্তর প্রদেশে বিজেপি অনেকটা একচেটিয়া ফল করেছিল। কিন্তু পরবর্তী বিধানসভা

নির্বাচনের আগেই বিজেপি’র হাওয়া পাল্টাতে শুরু করে।

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, বিজেপি’র সম্ভাবনা যেন ততই কমে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’র আসন সংখ্যা কম হলেও ভোট বেড়েছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সেই তেজি হাওয়া প্রবল হওয়ার আগেই দুর্বল হতে শুরু করেছে। আসামে লোকসভায় একচেটিয়া ফলাফল করার পর একাধিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও হানাহানির কারণে হিসাব-নিকাশ অনেকখানি পাল্টে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে। বিজেপি-বিরোধী শক্ত জোট হলে সেখানে নরেন্দ্র মোদির দল হেরে যেতে পারে। পাঞ্জাবে বিজেপি’র হাওয়া কোনো সময় জোরালো হয়নি, বরং সেখানে বিগত লোকসভা নির্বাচনে বেশি আসন পেয়েছে আম আদমি পার্টি। সেখানে আম আদমি আগামী বিধানসভায় জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও বিস্মিত হওয়ার কারণ থাকবে না। কেরালায় বিজেপি বরাবরই একটি দুর্বল রাজনৈতিক পক্ষ। সেখানে কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় না এলে বামরা আবারো ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে। তবে বিজেপির কোনো সম্ভাবনা ভারতের প্রায় শতভাগ সাক্ষর এই রাজ্যটিতে নেই। একই অবস্থা তামিলনাড়ুতে। সেখানে জয়ললিতার প্রভাব এখনো একচ্ছত্র। দুর্নীতির মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আবার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দাপটের সাথেই সরকার চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামীতেও সেখানে ব্যতিক্রম কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। উত্তর প্রদেশ হতে পারে সত্যিকারের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। সেখানে বিজেপির বিপরীতে বিহারের মতো মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টির মধ্যে সমঝোতা হলে বিজেপি’র উত্তর প্রদেশ দখল প্রচেষ্টা ফিকে হয়ে যেতে পারে। আর এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় রাজ্যসভায় বিজেপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের উদ্যোগ যেমন মাঠে মারা যেতে পারে, তেমনিভাবে আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিজয় অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়তে পারে।

mrkmmb@gmail.com

You Might Also Like