ইউক্রেন নিয়ে ভাবনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্প্রতি বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেন নিয়ে একটা যুদ্ধ করার কথা ভাবছে না। কারণ রাশিয়া জানে তার সেনাবাহিনীর তুলনায় মার্কিন সেনাবাহিনী অনেক উন্নত। অন্য দিকে মার্কিন কূটনীতিবিদ ও সিনেটর জেমস জ্যাটরাস বলেছেন, বর্তমান ইউক্রেন সরকার রাশিয়া ও পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করছে। কারণ তাহলে ইউক্রেন রাশিয়াকে সহজেই পরাভূত করতে পারবে, নচেৎ নয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøক্ষাদিমির পুতিন বলছেন, ইউক্রেন ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। সংলাপই হলো সমস্যা সমাধানের প্রকৃষ্ট উপায়। কিন্তু বর্তমান সমস্যার উদ্ভব হতে পেরেছে রাশিয়া ক্রিমিয়া জয়ের কারণে। রাশিয়া ক্রিমিয়াতে প্রথম সৈন্য পাঠিয়েছে যুদ্ধ করে ক্রিমিয়া জয় করার জন্য। রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে প্রথমে সংলাপে বসতে পারত। কিন্তু সে উদ্যোগ সে গ্রহণ করেনি। সে গ্রহণ করেছে বল প্রয়োগেরই পথ। এখন বলছে সংলাপের কথা। সংলাপ হতে হলে রাশিয়াকে ক্রিমিয়া ছাড়তে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে আন্তর্জাতিক সংলাপের।

১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর রাশিয়ানরা ছড়িয়ে পড়ে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের নানা অঞ্চলে। দখল করে বড় বড় চাকরি এবং বসতি করে ভালো ভালো জায়গায়। রুশরা হয়ে ওঠে সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নে সুবিধাভোগী জাতিতে। যেটার কথা আমরা জানতাম না। আমারা শুনতাম সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে সব জাতি সমান অধিকার। যেটা ঘটনা ছিল না। রাশিয়ানরা অন্য অনেক জাতিকে বলেছে সাম্রাজ্যবাদী। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে সে নিজেই পরিণত হয়েছিল সাম্রাজ্যাবাদী জাতিতে। শোনা যাচ্ছে নিকট ভবিষ্যতে পুতিনকে তাজিকিস্তানে সৈন্য পাঠাতে হতে পারে সেখানে বসতিকারী রুশদের স্বার্থ রা করার জন্য। এর ফলে এককালের সোভিয়েত ইউনিয়নে শুরু হতে পারে বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে ভয়াবহ সঙ্ঘাত। সেটা ১৯৯০ সালের কথা, হঠাৎ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপককে বলে বসেছিলাম, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়তে পারে। ওই সব অধ্যাপক ছিলেন হয়তো মস্কো ঘেঁষা। আমার সেটা ঠিক জানা ছিল না। তারা আমার প্রতি হয়ে ওঠেন খুবই ুব্ধ। কিন্তু এক বছর না যেতেই যখন সত্যি সত্যি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল, তখন আমার সাথে তাদের দেখা হলে তারা চোখ নামিয়ে চলতেন। আমি সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জেনেছিলাম। তা থেকে আমার ধারণা হয়েছিল সোভিয়েত ইউয়িন ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। যাদের আমি এ কথাটা বলেছিলাম, আমি তাদের থেকে মোটেও বেশি বুদ্ধিমান ছিলাম না। কিন্তু যেহেতু আমি ছিলাম কিছু বেশি তথ্যের অধিকারী তাই আমার পে অনুমান করা সম্ভব হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সম্ভাব্যতার কথা।

আমাদের দেশে অনেকে শুরু করেছিলেন যাকে বলে ‘মস্কো পূজা’। তারা মনে করতেন রাশিয়াতে মানুষ এখন আর আগের মতো স্বার্থপর হয়ে নেই। জাতিসত্তার পার্থক্য হতে চলেছে বিলুপ্ত। কিন্তু তা যে হয়নি সেটা এখন বিতর্কের ব্যাপার নয়। এখন ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সঙ্ঘাত সেটাকে খুব স্পষ্ট করেই দিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যদি যুদ্ধ শুরু হয় তাতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মুসলিম জাতিসত্তাগুলো যেমন- তাজিদ, তুর্কমেন, কাজাত, কিরঘিজিয়া, আজারবাইজানিÑ এরা সবাই এগিয়ে আসবে ইউক্রেনেরই প।ে রাশিয়ানরা হয়ে পড়বে একঘরে। মনে হয় পুতিন সেটা কিছুটা উপলব্ধি করতে পারছেন। রাশিয়ায় এখন উদ্ভব হতে যাচ্ছে এক উগ্র রুশ জাতীয়তাবাদ। যেটা হয়ে উঠতে পারে সবার জন্য তিকর। কিন্তু রাশিয়ানরা এককভাবে লড়াই করে যুদ্ধে জিততে পারবে, এটা ভাবা যায় না, বহুলোকের ঘটবে মৃত্যু। ইউক্রেন নয়, রাশিয়ার ভুলে হতে পারে রাশিয়ার ধ্বংস।
আমরা জানি না কেন আমাদের বর্তমান সরকার মস্কো অভিমুখী হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে কিনতে চাচ্ছে সামরিক সাজসরঞ্জাম। কারণ রাশিয়ায় যুদ্ধ বাধলে, রাশিয়ার কাছ থেকে আমরা যেসব অস্ত্রপাতি কিনব তার যন্ত্রাংশ আনতে সম হবো না। আমাদের প্রতিরা ব্যবস্থায় সৃষ্টি হবে জটিলতা। তাই অন্য আর কোনো কারণে না হলেও আমাদের ভাবা উচিত রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা আমাদের সেভাবে আর জড়িত করতে পারি না রাশিয়ার সাথে। ইউক্রেনকে এক সময় বলা হতো রাশিয়ার খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু ইউক্রেনের সাথেই যদি রাশিয়ার সঙ্ঘাত বাধে তবে বিশেষভাবে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে রাশিয়াতে। খাদ্য ছাড়া রুশদের পে সম্ভব হবে না দীর্ঘ যুুদ্ধ করা। রাশিয়াকে তাই ভাবা যায় না যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারবে বলে। সংলাপকে ইউক্রেন সমস্যার সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে হলে ক্রিমিয়া থেকে সরিয়ে নিতে হবে রুশ সৈন্য। আগের মতোই মেনে নিতে হবে ঐতিহাসিকভাবে ক্রিমিয়া হলো ইউক্রেনের অংশ। রাশিয়ার অংশ নয়। খোদ ইউক্রেনের রাজধানী ক্রিয়েভে এখন রুশরা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু এই অজুহাতে রাশিয়া যদি ক্রিয়েভ দখল করতে চায়, ইউক্রেনীয়রা সেটা কখনোই মেনে নিতে পারে না। আর নেবেও না। রাশিয়ানরা যেসব জায়গায় গিয়ে উপনিবিষ্ট হয়েছে, সেসব জায়গায় তাদের হতে হবে, ওই সব জায়গার লোকের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন এবং মিশে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে ওই সব জায়গার জনসমষ্টির সাথে। ছাড়তে হবে তাদের রুশ পরিচয়। না হলে ওই সব অঞ্চল ছেড়ে তাদের চলে আসতে হবে এখনকার রুশ ফেডারেশনে।

বাংলাদেশের সরকার এখন হলো আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু এই আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছে এককালের মস্কোপন্থীদের দ্বারা। এরা ভাবছেন, যদিও এখন আর সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রশ্নটা নেই তথাপি রাশিয়ার সাথে থাকলে তারা হতে পারবেন লাভবান। থাকতে পারবেন এ দেশের রাষ্ট্রিক মতা দখল করে। কিন্তু তাদেরই এই নীতি আওয়ামী লীগকে টেনে নিয়ে যেতে পারে এক জটিল অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে। এক সময় আওয়ামী লীগ মস্কোপন্থী ও ওয়াশিংটনপন্থীদের মধ্যে জেগে উঠেছিল চরম বিরোধ। মস্কোপন্থীদের কথা শুনে শেখ মুজিব গঠন করেছিলেন বাকশাল। আর এর ফলে ঘটেছিল সামরিক অভ্যুত্থান। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সময় সেনাবাহিনী মতায় এসেছিল না। সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় আওয়ামী লীগেরই একটি উপদল মতায় আসতে সম হয়েছিল। জানি না, নিকট ভবিষ্যতে এ রকম কিছু আবার ঘটতে পারে কি না। যদিও আগের স্নায়ুযুদ্ধের পরিস্থিতি আর ঠিক বজায় নেই। বাংলাদেশকে নিয়ে দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে টানাপড়েন। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া নিতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগের মতাসীন অংশের প। পরিস্থিতি তাই যথেষ্ট জটিল হয়ে ওঠাই সম্ভব। বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে ঘটতে পারে বিদেশী হস্তপে। যেটা আমাদের জাতীয় স্বার্থে কাম্য হতে পারে না। ইউক্রেন আমাদের দেশ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। কিন্তু আমাদেরও তাই ভাবতে হচ্ছে ইউক্রেনের পরিস্থিতি নিয়ে।

ভারতের নির্বাচনে কী হবে আমরা তা জানি না। তবে দিল্লিতে যারাই মতায় আসুক, ইন্দিরা গান্ধীর মতো তারা যে মস্কো অভিমুখী হবে না সেটা সহজেই অনুমান করা চলে। তাই বাংলাদেশ সরকার যদি মস্কোমুখী হতে চায় তবে সম্ভাব্য আগামী ভারত সরকার সেটা পছন্দনীয় মনে করবে না। অনেক কিছুই নির্ভর করবে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলেরও ওপর। ১৯৭১ সালে এক দিকে ছিল ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর অন্য দিকে ছিল পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই জোটের মধ্যে যুদ্ধ হলেও সে সময় একটা বড় যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ শ্রীমতি গান্ধী চাননি কোনো বড় রকমের যুদ্ধে জড়াতে। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আদর্শিক। সে হয়ে উঠেছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতীক। কিন্তু এখন সমাজতন্ত্রের ধারণা আর আগের মতো আদৃত নয়। রাশিয়া এখন বিবেচিত নয় একটি আদর্শ দেশ হিসেবে। যেমন বিবেচিত হতে পারত ১৯৭১ সালে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কী ভাবছেন আমরা তা জানি না। তবে তাকে ছাড়তে হবে রাশিয়ার সহায়তায় মতা আঁকড়ে থাকার ধারণা। চেষ্টা করতে হবে দেশের জনমতকে সাথে নিয়েই চলার। পত্রিকার খবরে প্রকাশ, কৃষ্ণ সাগরে যেয়ে পৌঁছেছে একাধিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। এসব জাহাজ ক্রিমিয়ার দিকে যাত্রা করতেও পারে।
(নয়া দিগন্ত, ২১।০৪/২০১৪)

You Might Also Like