ভারতের নির্বাচন ও সাম্প্রদায়িকতা

ভারতের চলতি নির্বাচনে উন্নয়ন, দুর্নীতি ইত্যাদি কিছু বিষয় সামনে এলেও সবচেয়ে বড় আকারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রদায়িক ইস্যু। যেভাবে এই ইস্যু এখন সামনে এসেছে ইতিপূর্বে কোনো নির্বাচনে সেটা দেখা যায়নি। ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী সাম্প্রদায়িক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ খোলাখুলিভাবেই হিন্দুত্বকে সামনে এনে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে উন্নয়নের কথা, তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির গুজরাট মডেলের কথা তারা বেশি করে বললেও এখন সাম্প্রদায়িক ইস্যুকেই সামনে এনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারই তারা এ পর্যায়ে বেশি করে করছে। মনে হয়, চরম সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে মুসলমান ভোটারদের ওপর নির্ভর না করে যথাসম্ভব হিন্দু ভোট টানার চিন্তা থেকেই তারা এ কাজ করছে। এ বিষয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে হিন্দুত্ববাদী গেরুয়া দলগুলোর মাতৃ সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। এ সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, তবে সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে থাকলেও এ চক্রটি আসলে পুরোপুরি রাজনৈতিক। ১৯৪৮ সালে গান্ধীকে তারাই হত্যা করেছিল। এরা নিজেরা কোনো রাজনৈতিক দল না হলেও কীভাবে ভারতের সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে রাখে, এমনকি তাদের নীতি ও কর্মসূচি পর্যন্ত নির্ধারণ করে এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। শুধু তাই নয়, আরএসএস নামে এ সংগঠনটি বিজেপিসহ অন্য হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দলগুলোর নেতাদের কোনো ভিন্নমত সহ্য করে না। যশোবন্ত সিং তো বটেই, এমনকি এবারকার নির্বাচনে তারা তাদের বিশেষ অনুগত লালকৃষ্ণ আদভানির হাতও যেভাবে মোচড় দিয়েছে, এটা লক্ষ্য করার মতো। যশোবন্ত সিং আরএসএসের হুকুম মানতে অস্বীকার করায় বিজেপি তাকে বহিষ্কার করেছে এবং তিনি দলনিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে রাজস্থানের এক নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচন করছেন। কিন্তু আদভানিকে তারা বাধ্য করেছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গুজরাটের গান্ধীনগর এলাকা থেকে প্রার্থী হতে। এ ছাড়া নির্বাচনী ইস্যুর গুরুত্ব নির্ধারণও আরএসএসই করছে। তারা নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন এজেন্ডা থেকে সাম্প্রদায়িক ইস্যু সামনে এনে নির্বাচনে হিন্দু ভোট বেশি করে পাওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে। এ জন্য নরেন্দ্র মোদি ও তার দলের অন্য নেতারা এখন শুধু ভারতের মুসলমান নয়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই বিষোদ্গার করছেন। কংগ্রেসও অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ বোলচাল সত্ত্বেও বাংলাদেশকে এক কানাকড়িও কোনো সুবিধা দেয়নি। উপরন্তু অনেক সুবিধা আওয়ামী লীগ সরকারের থেকে আদায় করে নিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি যদি ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে তিনি ও তার বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার কীভাবে বাংলাদেশের ওপর চড়াও হবে, এটা দেখার বিষয়।

এ কথা ঠিক যে, নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি হিন্দুত্ববাদের সাম্প্রদায়িক নীতি সামনে এনে নির্বাচন যুদ্ধে নামার পর ভারতে ধর্মবিযুক্ত (সেক্যুলার) রাজনৈতিক দলগুলো তাদের এই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটাও ঠিক যে, ভারতে সাধারণভাবে যদি সাম্প্রদায়িকতা নতুন করে মাথাচাড়া না দিত, তাহলে বিজেপির পক্ষে শুধু হিন্দুত্ববাদের প্রচারণার মাধ্যমে এভাবে সাম্প্রদায়িক ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা সম্ভব হতো না। কেউ যদি এটা ভাবেন যে, হঠাৎ করেই বিজেপি ভারতে এভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে, তাহলে ভুল হবে। কেউ যদি ভাবেন যে, শুধু বিজেপিই সাম্প্রদায়িকতা রাজনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অনুসরণ ও কার্যকর করছে তাহলে ভুল হবে। আসলে কংগ্রেস দল ও কংগ্রেস সরকার মুখে অনেক অসাম্প্রদায়িক কথা বললেও এবং এ মর্মে অনেক ঘোষণা দিলেও তারা নিজেরা সাম্প্রদায়িকতার চর্চা ও ব্যবহার অনেকভাবেই করেছে। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা কিছুমাত্র কম ছিল না। কংগ্রেস সরকার ইচ্ছা করলেই বাবরি মসজিদের মতো শুধু মুসলমানদের একটা ধর্মীয় স্থাপনা নয়, মুসলমানদের তৈরি একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক স্থাপনাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করেনি। বাবরি মসজিদ চারদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক ঘেরাও থাকা অবস্থাতেই সেটা করসেবক নামে একদল ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট মসজিদটি ধ্বংস করেছিল। সামরিক বাহিনী তাদেরকে মসজিদের কাছে যেতে যা দিলে সেটা ভাঙা সম্ভব হতো না। কিন্তু কংগ্রেসের তৎকালীন সাম্প্রদায়িক প্রধানমন্ত্রী নরসিংহা রাও তা করেননি। উপরন্তু বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ শুরু হওয়ার ঠিক আগেই তিনি নিজের বাড়িতে পূজায় বসেছিলেন এবং বাড়ির লোকজনকে নিষেধ করেছিলেন পূজার সময় তাকে কোনোভাবে যেন বিরক্ত করা না হয়। এভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙতে থাকার পুরো সময়টা কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসিংহা রাও পূজায় বসে কাটানোর পর তার এক ঘনিষ্ঠ লোক তাকে জানায়, তার পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ শেষ হয়েছে! এর পর তিনি তার পূজার আসন ছেড়ে উঠে আসেন! এটা আগে জানা থাকলেও মাত্র কয়েকদিন আগে প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক প্রফুল্ল বিদওয়াই তার এক প্রবন্ধে এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন (ডেইলি স্টার)। কাজেই ভারতে এখন বিজেপি সব থেকে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে এগিয়ে এসে নতুন করে ক্ষমতা দখলের পর্যায়ে এলেও ভারতে সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখা এবং শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ৫০ বছরেরও বেশি কংগ্রেসী শাসনের ভূমিকা অবহেলা করার মতো নয়। আসলে কংগ্রেস যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রেখে এসেছে তার পরিণতিই এখন বিজেপির সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এদিক দিয়ে বিজেপি কংগ্রেসেরই রাজনৈতিক উত্তরসূরি।

কিন্তু এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, কংগ্রেস সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে যে ভূমিকাই রাখুক ভারতে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ আছে। এ কারণে উত্তর ভারতের কয়েকটি রাজ্যে এবং পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্যের কয়েকটি পকেটে বিজেপির প্রভাব বৃদ্ধি পেলেও এবং এই নির্বাচনে বিজেপি সব থেকে বড় একক পার্টি হিসেবে জয়লাভের ষোলআনা সম্ভাবনা থাকলেও তার পক্ষে কোয়ালিশন সহযোগী পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতা এবং ২০০২ সালে তার সরকার কর্তৃক দুই হাজারের বেশি মুসলমান হত্যার যে কালিমা তার গায়ে লাগিয়ে রেখেছে সেটা এখন তার জন্য এক অসুবিধার কারণ। কিন্তু এসব সত্ত্বেও ভারতের ১৬তম সাধারণ নির্বাচনে যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে মুসলমানসহ সব ধরনের সংখ্যালঘু এবং ভারতের প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বিপদ বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কোনো সম্ভাবনা নেই।
(সমকাল, ২২/০৪/২০১৪)

You Might Also Like