‘শিক্ষায় ভ্যাট’এর চেয়ে বড় প্রতারণা কী হতে পারে!

দেশের সব ইস্যুকে ছাপিয়ে এখন ‘টক অব দ্যা কাউন্টি’ হলো শিক্ষায় ভ্যাট আরোপের বিষয়টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করেছে সরকার। এটা আবার ১ কিংবা ২% নয়, একসাথে ৭.৫%। এরফলে গেল তিনদিন থেকে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘ভ্যাট নয়, গুলি কর’ এমন প্ল্যাকার্ড বুকে ঝুলিয়ে এবং স্লোগানে রাজপথে আন্দোলন করছে।

এরই মধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানতে পারলাম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উপর দফায় দফায় হামলা করেছে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। আন্দোলন থেকে সরে যেতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে, তথ্যে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, কিন্তু এরপরও তাদের আন্দোলন দমাতে পারেনি। নতুন করে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করেছে ‘ভ্যাট প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে লাগাতার ধর্মঘট’ চলবে। তবে যেখানে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ছাত্রলীগের একাত্মতা পোষণ করার কথা সেখানে তারা রাতের আঁধারে পুলিশ পাহারায় হামলা করছে। এক্ষেত্রে সরকার ও ছাত্রলীগের এমন নোংড়া আচরণের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই।

শিক্ষার ওপর এই সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা শুধু শিক্ষার্থীরাই করছেন না, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের একই ধরনের মনোভাব। এক্ষেত্রে আমাদের অনেকের ধারনা- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এখানে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে। কিন্তু বর্তমানে এর শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসছে। কেননা, প্রতিবছর যে হারে ১০/১২ লাখ ছেলেমেয়ে এইচএসসি পাশ করছে সেহারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন নেই। ফলে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট দেয়া সম্ভব হবে না। উন্নয়নশীল কিংবা উন্নত কোন দেশেই শিক্ষায় ভ্যাটি আরোপের নজীর নেই। কিন্তু আমাদের সরকার শিক্ষাকে অধিকার বললেও কার্যত: তা পণ্যে পরিণত করছে। সরকার অন্যান্য পণ্যের ন্যায় এবার শিক্ষাকেও পণ্যের কাতারে নামিয়ে একইভাবে ভ্যাট আরোপ করেছে। এতে দরিদ্র-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ যে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এতে অন্তত: আমার কোনো সন্দেহ নেই।

আর শিক্ষার্থীরা যখন ভ্যাট নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে সরকার এনিয়ে খেলছে লুকোচুরি খেলা। সরকার প্রধান, অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থেকে তা সহেজই বুঝা যাচ্ছে। তারা বলছে ভ্যাট শিক্ষার্থীদের দিতে হবে না, তবে ভ্যাট দেবে কে সেটাও পরিষ্কার করেনি।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং রাতে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোর গলায় বলে দিয়েছেন, টিউশন ফির ওপর আরোপিত ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাল শনিবার ফের বলেছেন ‘একজন শিক্ষার্থী গড়ে এক হাজার টাকা খরচ করেন। সেখানে ৭.৫ ভাগ হারে এক হাজার টাকায় ৭৫ টাকা বড় কিছু নয়।,

আমরা সবাই জানি মি. মুহিত একজন দক্ষ অর্থনীতিবিদ, তিনি সংসদে নয়বার বাজেট উত্থাপন করেছেন। লেখক হিসেবেও সমান পারদর্শী- মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক গ্রন্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ২৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত একজন দক্ষ আমলা হিসেবেও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। শিক্ষাজীবনে মেধাবী ছাত্র হিসেবে লেখাপড়া করেছেন ঢাকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতো কিছুর পরও সাম্প্রতিককালে তার ভুমিকা ও বেশ কিছু বক্তব্য নানা বিতর্কের সৃষ্টি করে। এত বছর দায়িত্ব পালন করার পর ভ্যাট কি, এবং কাকে দিতে হয় এটা তিনি বুঝতে পারে না! নিশ্চয় তিনি জানেন ভ্যাট মানেই ভোক্তাকে দিতে হয়। কিন্তু এরপরও তিনি শিক্ষায় আরোপিত ভ্যাট নিয়ে জনগণের সাথে এক ধরনের ভাওতাবাজি করছেন। যে কারণে অর্থমন্ত্রীই এখন নাগরিকদের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের বেশির ভাগ নাগরিক এখন চান অর্থমন্ত্রী স্বেচ্ছায় সরে যাক কিংবা তাকে সরিয়ে দেয়া হোক। অনেকেই সরাসরি পদত্যাগও দাবি করেছেন।

বৃহস্পতিবার সংসদে সরকারের অনুগত বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বহুরূপী রওশন এরশাদ ভ্যাটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করলে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কথা বলেন। বক্তব্যটি মনোযোগসহকারেই শুনছিলাম। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ভ্যাটের পক্ষে জোরালোভাবে যুক্তি দিতে গিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে অনেক কথাই বলেছেন।

তিনি বলেন, “এই যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডিতে এক বিল্ডিংয়ে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়, গুলশানে এক ছাদের নিচে কয়েকটি। বড় বড় নাম, গাল ভরা বুলি। এদের কোনো একাউন্টিবিলিটি নেই।”

“ভ্যাট তো শিক্ষার্থীদের দিতে হবে না। এটা দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এটা তারা মেনেও নিয়েছেন।”

ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রশ্ন তুলেছেন ওইসব বিষয়ে আমরাও তাঁর সাথে সম্পূর্ণ একমত। তবে এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো- এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার, সেটা কি জনগণের না সরকারের? নিশ্চয় সরকারের। আর এ ক্ষেত্রে সরকার যদি তাদের জবাবদিহীতা নিশ্চিত না করতে পারে এর মাশুল কি সাধারণ জনগণ তথা শিক্ষার্থীদের দিতে হবে? বিষয়গুলো বেশ বিবেচনার দাবি রাখে।

সরকার প্রধানের এমন বক্তব্যের পরও ‘ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করবে, না শিক্ষার্থী’- তা পরিষ্কার হয়নি। এ ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে। যদিও এনবিআরের বিজ্ঞপ্তির পর শুক্রবার বিকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি’র এক জরুরি সভায় নিজেরাই ভ্যাট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও কিন্তু রয়েছে। পরিস্থিতি দেখা মনে হয়েছে তারা অনেকটাই সরকারের চাপের মুখে জরুরী সভা করে এই সিদ্ধান্ত নিতে ও ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছেন।

কেননা, সভা শেষে সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন নিজেরা ভ্যাট দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু এও বলেছেন, এনবিআরের প্রজ্ঞাপন ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ভ্যাট এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বর্তায়। এখানে আর ছাত্রদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে এনবিআর যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তা পুনরায় বিবেচনা করে দেখার অনুরোধ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্টের অধীনে চলে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। আমরা ভোক্তা নই, সেবা গ্রহণ করি না। যারা সেবা গ্রহণ করে তারাই কেবল ভ্যাটের আওতায় আসে।’

অন্যদিকে, শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেছেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অরোপিত ৭.৫% ভ্যাট শিক্ষার্থীদেরই দিতে হবে। এ বছর ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় যাতে এই ভ্যাট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় না করে, সেজন্য সরকার মনিটরিং করবে। আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীদেরই ভ্যাট দিতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা এ বছরের ভ্যাট দিতে রাজি হয়েছেন। কাজেই এখন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অযৌক্তিক নেই।’

এতে সরকারে প্রধান ও অন্যান্যদের বক্তব্যে কোনো মিল খোঁজে পা্ওয়া যাচ্ছে না।ফলে যে যাই বলুক আখেরে এই ভ্যাটের চাপটা যে শিক্ষার্থীদের উপরই বর্তাবে এতে কারো সন্দেহ নেই।

এদিকে শিক্ষায় ভ্যাট আরোপের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ মনে করছেন, সরকার শিক্ষাকেও পণ্য মনে করছে বলেই এভাবে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

সরকার এর পক্ষে যত কথা বলুক কেন, শিক্ষায় ভ্যাট আরোপের ফলে শিক্ষা সংকোচন ও শিক্ষা বাণিজ্যকীকরণ যে আরো বেশি উৎসাহিত হবে এতে কারো সন্দেহ নেই। ফলে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা হলে আগামী দিনে শিক্ষা একটি পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ফলে এটা কোনোভাবেই হতে দেয়া যায় না। যে কোনো মূল্যে এটা প্রতিহত করা উচিত। এ দিক থেকে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন যৌক্তিক। আর এতে সব শ্রেণী মানুষেরও সহানুভুতি রয়েছে। এমন কি শাসক দলের অনেক নেতা-এমপিও মনে করেন ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর যে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিৎ।’ অন্যদিকে, বিএনপিও অবিলম্বে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

যতদূর জানি, তাতে পৃথিবীর আর কোথা্ও এভাবে শিক্ষার বাণিজ্যকীকরণ করা হয়নি। এ ধরনের ভ্যাট আরোপের নজীরও নেই। তাই যেখানেই এই শিক্ষা বাণিজ্যকীরণের চেষ্টা হয়েছে সেখানেই প্রতিরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রে আমাদের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসাহ যুগাতে পারে নিকট অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হয়ে যাওয়া ছাত্র আন্দোলনগুলো। যেমনটি উল্লেখ করা যেতে পারে ২০০৮ সালে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের ছাত্র আন্দোলনের কথা- এই বছরের প্রথম দিকে ক্রমাগত বেতন বৃদ্ধি এবং শিক্ষার বাণিজ্যকীকরণ এর প্রতিবাদে কানাডায় শিক্ষার্থীরা ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস প্রশাসনিক ভবন দখল করে নেয়, একই বছর শিক্ষা ব্যয় হ্রাস করার দাবিতে অটোয়ার শিক্ষার্থীরা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, নাইজেরিয়ার ওনাবিসি ও ন্যাব্যাঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় বিক্ষোভ, ওয়েলিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নিউজিল্যান্ডের শিক্ষামন্ত্রী পিট হাজসনের শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মধ্য ওয়েলিংটন অভিমুখে পদযাত্রা, দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ ছাত্র-ছাত্রী নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে অবস্থান ধর্মঘট, ফিলিপাইনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে, জার্মানীতে বেতন ও নিবন্ধন ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে জার্মানীর বনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, বিনা বেতনে শিক্ষা এই শ্লোগানকে সামনে রেখে জার্মানীর বার্লিনে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে পথ নাটকসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করে, ইটালির রোমে নানা শ্রেণী পেশার ৫০ হাজার মানুষ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদ করে। এ সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয় ও গ্রেফতার হয়। এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ও বাণিজ্যকীকরণের প্রতিবাদে আন্দোলন হয়েছে এবং এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি আন্দোলনই সফল হয়েছে। ফলে আমরা আশা করি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে শিক্ষায় ভ্যাট প্রত্যাহার হবে।

প্রসঙ্গত, পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন দেশে শিক্ষা জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের দেশের সরকার স্লোগানে কিংবা ভাষণে শিক্ষাকে অধিকার বললেও বাস্তবে কিন্তু ভিন্ন বিষয়। কেননা, দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর পরও শিক্ষাকে আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি পায়নি, ফলে রাষ্ট্র তা দিতে বাধ্য নয়। ফলে, জনগণের সাথে রাষ্ট্রের প্রতারণা যে ক্রমেই বাড়ছে তা সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের ভাষ্য থেকেই সহজেই অনুমেয়। শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে ভোক্তা হিসেবে নাগরিকদের রাষ্ট্রকে ভ্যাট দিতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকদের সাথে এর চেয়ে বড় প্রতারণা আর কী হতে পারে!

এরই প্রেক্ষিতে আমরা কি লক্ষ্য করছি, সার্বিকভাবে শিক্ষার প্রসারে শিক্ষাখাতে যেখানে ক্রমাগত বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন সেখানে হ্রাস করা হচ্ছে। ২০১০ সালে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা কমেছে। বর্তমানে আমাদের জাতীয় আয়ের (জিডিপি) মাত্র ২.৬% শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়। দেশ স্বাধীনের পর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেটে সর্বোচ্চ ১৫.৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৪.২ শতাংশ। কিন্তু এরপর থেকে টাকার অঙ্ক বাড়লেও মোট বার্ষিক বাজেটের হারে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসে তা দাঁড়িয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ১১.৬০ ভাগ।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়, যা ২০০০ সালে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত ‘ডাকার ঘোষণা’য়ও এ কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জাতীয় আয়ের আড়াই শতাংশের সামান্য বেশি, অর্থাৎ বাজেটের ১১.৬ শতাংশ, যা আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশের চেয়েও কম। এছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষা খাত নিয়ে বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বা বরাদ্দে যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষা খাতে গড়ে বাজেটের ১৮.৭ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছে। আগামী ১০ বছরে উদীয়মান অর্থনীতিতে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশকে মাধ্যমিক, কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

আমরা জানি, শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়ে থাকে। তাই কোনো জাতিকে উন্নত হতে হলে এই শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমেই হতে হবে। ফলে এ খাতে ব্যয় তথা বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, আমাদের রাষ্ট্রের মোট বাজেটের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়লেও শিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে। আর এ কারণেই রাষ্ট্র শিক্ষাকেও বাণিজ্যকীকরণ কিংবা পণ্য বানাতে ভ্যাট-কর আরোপ করছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে কোনো মূল্যে এটা প্রতিরোধ করতে হবে শিক্ষার্থী ও জনগণকে। শুধু ভ্যাট প্রত্যাহার নয়, শিক্ষার সব ধরনের বাণিজ্যকীকরণ প্রক্রিয়া রুখতে হবে। সেইসাথে বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোসহ সর্বোপরি সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্র-সরকারকে বাধ্য করতে হবে।
লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক এবং কলাম লেখক। ই-মেইল:sarderanis@gmail.com

You Might Also Like