এখন সময় : নাইন এলেভেন

sddefaultতখন কেয়ার্ক’এ মেকআপ করে হার্ড কপি প্রেসে নিয়ে যেতে হত। সজিব মেকআপের কাজ শেষ করে বাসায় চলে যাবে। আমার জন্য প্রিন্টের কাজটা বাকী রেখে গেল। যাওয়ার সময় অমাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয় আমি প্রিন্ট দিতে পারবো কিনা। ১৭/১১ সাইজের অনেকগুলো পাতা, ৬০ পাতা। প্রিন্ট দেয়া, জাম্প মেলানো, হেডিংগুলোতে চোখ বুলানো ইত্যাদি কম কাজ নয়! আমি ওকে নিশ্চয়তা দিয়ে বিদায় করলাম। মেকআপের কাজটা সেদিন আ্গেই সেরেছিল। সজিব একটু খেয়ালী হলেও শেষ মূহূর্তে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিত। সেদিনও তাই প্রমাণ করেছে। দরোজা থেকে ফিরে ফিরে এসেও অবার জানতে চাইছে। আমি একটু কড়া করে যখন বললাম তখন ও গেল। এত বড় দায়িত্বে থাকলেও ছিল নেহাৎ ছেলে মানুষ। তখনো স্কুল শেষ করেনি। ছেলেমি তো করতোই, কখনো আব্দার আহ্লাদও। সে দিন কি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিল, এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে এই নিউয়ির্কে?

ঘণ্টা দেড় পর সজিবের ফোন। -কী হয়েছে সবুজ?

-আপনি কী প্রেসে চলে গেছেন? জানালাম না। ত্রস্ত কণ্ঠে বললো অন লাইনে নিউজ দেখেন…. প্রিন্ট শেষ না হলে তা বন্ধ রাখুন আমি আসতেছি- এই বলে সে ফোন ছেড়ে দিল।

অনলাইনে নিউজ দেখে তো হতবাক! আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। এ কেমন করে হয়, হতেই পারে না! অফিসে একা আমি, টেলীফোনে  কেবল রিং বাজছে রিং বাজছে। এই ভিডিউ ছবিগুলো কি সত্য? এজন্যই কি সজিবের মধ্যে আগে থেকেই অস্থিরতা কাজ করেছিল?

জিকোকে (জাকারিয়া মাসুদ) কল দিলাম মনজুর আহমদকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে নিহার সিদ্দিকীকে নিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে যাওয়ার জন্য। আমাদের অফিসে টেলিভিশন নেই সেটা চিন্তা করে জিকো মঞ্জু ভাইকে অফিসে না এনে বাসায় বসিয়ে নিহারকে নিয়ে রওয়ানা দেয় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে। কিন্তু কুইন্স ব্রীজ বন্ধ করে দেয়ায় তারা আর অগ্রসর হতে পারেনি। নিহার হেটেই ব্রীজ পাড় হয়। দূর থেকেই ছবি তোলে নিয়ে এলো।

এদিকে সজিব পৌছার আগেই কিছু ছবি ডাউনলোড করে নিয়েছিলাম। সজিব এসেই কম্পিউটারে বসে গেল। ব্যানার হেডিং হবে। প্রথম পাতার পুরো ম্যাকআপ ভাঙতেও নিষেধ করলাম। সজিব ওর বাসা থেকেই টেলীভিশনে নিউজ দেখে এসেছে- ‘এমন মর্মান্তিক ঘটনা বিশ্বে আর ঘটবে না’ আমার দিকে না তাকিয়েই নিজে নিজে নানা কথা বলতে থাকছে সে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম- আরে আরো বড় ঘটনা ঘটবে! কেয়ামতের আগেই ঘটবে। সবুজ বিরক্ত হয়।অন্য সময় হলে আমার এমন উক্তিতে ওর চেহারায় ফুটে উঠতো একটা চমৎকার চাপা হাসি। আজ ওর মুখে সেই হাসি নেই। দুনিয়াটা যেন ধপাস করে ওর মাথায়ই পড়েছে। এরই মধ্যে মঞ্জু ভাইও চলে এলেন। সব তথ্যও হাতে পেয়ে গেলাম। ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধূলিষ্যাৎ’ এই ব্যানার হেডলাইনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এখন সময় প্রকাশিত হল।

মঙ্গলবার ছিল এখন সময় প্রকাশের নির্ধারিত দিন। কিন্তু পত্রিকা ছাপা ও সরবরাহে হল দেড়ী। পাঠকের তড় যেন সয় না। সে সময় বাঙালীদের সংবাদ জানার একমাত্র মাধ্যমঈ বাংলায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো। এখন সময় মঙ্গল দিনের, বুধবারে ঠিকানা । দুর্ঘটনাটি মঙ্গলবার সকালের। ঘটনাচক্রে আমরাই প্রথম বাংলা ভাষাভাষি পাঠককে খবরটি অবগত করাতে পেরেছি।

আমরা তথ্যটি সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করেও পাঠকের কৌতূহল নিবারণ করতে পারতাম। কিন্তু পাঠককে ঘটে যাওয়া বিষয়ে সর্বাধিক ও সর্বশেষ তথ্য দিয়ে অবগত রাখার দায়িত্বের তাড়না, সঠিক ও সম্পূর্ণ চিত্র বাঙালী পাঠককে দিতে না পারলে তারা গুজবে বিভ্রান্ত হবেন- এসব বিবেচনায় আমরা নেদিন অতিরিক্ত চাপ নিয়েছিলাম। এছাড়াও পরেরদিন অন্য একটি পত্রিকা থাকায় পেশাদারী প্রতিযোগিতার চিন্তাও মাথায় কাজ করে থাকতে পারে। নিজেদের কৃতিত্ব নিতে চাইলে ২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বরের দিনটি এখন সময়’র জন্য একটি উল্লেখযোগ্য দিন। শুধু এখন সময় ও আমাদের সে সময়ের পুরো টিমই নয়, প্রবাসি বাঙালী সমাজের জন্যও।

-কাজী শামসুল হক

You Might Also Like